তানভীর শাহনাওয়াজ: কানাডাতে বাংলাদেশি কমিউনিটি পেল ২য় এমপি

তানভীর শাহনাওয়াজ: কানাডাতে বাংলাদেশি কমিউনিটি পেল ২য় এমপি

ফন্ট সাইজ:

কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ তানভীর শাহনাওয়াজ। টরন্টোর গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক- এর উপনির্বাচনে লিবারেল পার্টির প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছেন তিনি। সোমবার অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পেছনে ফেলে তানভীর শাহনাওয়াজ নির্বাচিত হন কানাডার পার্লামেন্টের নতুন সদস্য হিসেবে।

ফলাফলে বড় ব্যবধানে জয়: ইলেকশন কানাডার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, তানভীর শাহনাওয়াজ পেয়েছেন ১৮,৩৬১ ভোট বা ৫৫.৭ শতাংশ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনডিপির শ্যানন ডিভাইন পেয়েছেন ৮,৫১২ ভোট বা ২৫.৮ শতাংশ। কনজারভেটিভ প্রার্থী জিম সারবস পেয়েছেন ৫,১১৬ ভোট বা ১৫.৫ শতাংশ। গ্রিন পার্টির ব্রুস লাইভস পেয়েছেন ১.৭ শতাংশ ভোট। মোট ২০০টি পোলের সবকটির ফলাফল রিপোর্ট হওয়ার পর এই ফল প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টরন্টোর বাংলাদেশি-কানাডিয়ান কমিউনিটির জন্যও এ নির্বাচন একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক অর্জন।
কে এই তানভীর শাহনাওয়াজ?: তানভীর শাহনাওয়াজের গল্পটা অন্যরকম। তিনি এই নির্বাচনী এলাকাতেই বড় হয়েছেন। তাঁর জন্ম ও শৈশব কেটেছে টরন্টোর অতি পরিচিত ক্রিসেন্ট টাউন এলাকায়। তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসেন তাঁর জন্মের সময়ের কাছাকাছি। এ বিষয়ে গর্বের সাথে তিনি বলেন, জন্মের পর থেকে এই নির্বাচনী এলাকা ছেড়ে যাইনি। বিচেস- ইস্ট ইয়র্ক আমার বেড়ে ওঠার জায়গা। আমার পরিবার, কর্মজীবন এবং দীর্ঘদিনের কমিউনিটি সেবার কেন্দ্র।
তানভীর কানাডার ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর প্রায় এক দশক তিনি সাবেক লিবারেল এমপি ন‍্যাথানিয়েল এরিস্কন স্মিথের সাথে কাজ করেন। একসময় তিনি তাঁর কন্সটিটিউএনসি অফিস ম‍্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি স্বল্প মেয়াদি হাউজিং মন্ত্রী এরিস্কন স্মিথ-এর দায়িত্বকালে স্পেশাল এডভাইজার হিসেবেও কাজ করেন। দীর্ঘদিন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কাজ করেছেন তানভীর।
তিনি টেইলর- মেসি এন্ড ওকরিজ কমিউনিটি রেসপন্স টীমের কো-চেয়ার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্রিসেন্ট টাউনের বিভিন্ন কমিউনিটি কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি কমিউনিটি সেন্টার ৫৫ এবং গ্র্যান্ড এ.এম.ই চার্চের সঙ্গে খাদ্য বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন।

মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইটাও ছিল কঠিন: উপনির্বাচনের আগে লিবারেল পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার জন্যও তানভীরকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হয়।
১৮ জুলাইয়ের মনোনয়ন নির্বাচনে মোট ৮৭৩টি ব্যালট গণনা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিলেন বিচেস–ইস্ট ইয়র্কের সাবেক প্রাদেশিক সংসদ সদস্য (এমপিপি) আর্থার পটস, পরিবেশবিষয়ক আইনজীবী ও সাবেক চিফ অব স্টাফ ক্লেয়ার সিবোর্ন এবং সামার নুডেল। র‌্যাঙ্কড-ব্যালট পদ্ধতির ভোটে শেষ পর্যন্ত তানভীর শাহনাওয়াজ দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। মনোনয়ন পাওয়ার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁকে যেতে হয় সরাসরি ফেডারেল নির্বাচনী লড়াইয়ে।
কেন এই আসনটি গুরুত্বপূর্ণ?: বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক ঐতিহাসিকভাবে লিবারেলদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে তৎকালীন লিবারেল এমপি ন‍্যাট এরিস্কন স্মিথ এই আসনে ৬৭.৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। এনডিপি পেয়েছিল ৬.৯ শতাংশ এবং কনজারভেটিভরা ২৩.৫ শতাংশ। এরিস্কন-স্মিথ পরবর্তীতে পদত্যাগ করলে আসনটি শূন্য হয় এবং উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়। ইলেকশন কানাডা ৩১ আগস্টকে ভোটের দিন নির্ধারণ করে।
তানভীরের জয় তাই একদিকে লিবারেলদের আসন ধরে রাখার বিজয়, অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত দীর্ঘদিনের কমিউনিটি-ভিত্তিক রাজনীতিরও স্বীকৃতি।
নির্বাচনী প্রচারে কী ছিল তানভীরের অগ্রাধিকার?: প্রচারে তানভীর শাহনাওয়াজ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি-কে।
তাঁর বক্তব্য ছিল, বিচেস- ইস্ট ইয়র্কের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে অটোয়াতে তুলে ধরাই তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে নতুন আবাসন নির্মাণ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং স্থানীয় পরিবার ও ব্যবসার জন্য সুযোগ তৈরি করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বিজয়ের রাতে তানভীরের বার্তা: ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তানভীর বলেন, বিচেস- ইস্ট ইয়র্ককে নিজের “একমাত্র ঘর” হিসেবে দেখি। এই এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা আমার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান।
তাঁর বিজয় উদযাপনে পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসা অভিবাসী। ফলে তাঁর বিজয়ের সঙ্গে অভিবাসী পরিবারের কানাডিয়ান স্বপ্নের গল্পটিও নতুন মাত্রা পেয়েছে।

বাংলাদেশি-কানাডিয়ানদের জন্য বার্তা
তানভীর শাহনাওয়াজের বিজয় কানাডার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশি-কানাডিয়ানদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণেরও একটি প্রতীক।
একসময় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে যে মানুষটি স্থানীয় কমিউনিটিতে কাজ করতেন, সেই মানুষটিই এখন অটোয়াতে গিয়ে বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবেন।
তাঁর বাবা-মায়ের বাংলাদেশ থেকে কানাডায় আসা, ক্রিসেন্ট টাউনে তাঁর বেড়ে ওঠা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কাজ এবং শেষ পর্যন্ত ফেডারেল পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়া—সব মিলিয়ে তানভীর শাহনাওয়াজের গল্পটি অভিবাসী প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
সামনে বড় দায়িত্ব: তবে বিজয়ই শেষ কথা নয়। এখন শুরু হবে আসল দায়িত্ব। বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের মানুষের আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় অর্থনীতির মতো ইস্যুগুলো নিয়ে তাঁকে কাজ করতে হবে অটোয়াতে।