দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামা এবং জয়- বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কেবল জয়ই নয়, ক্রিকেট বিশ্বকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে লাল-সবুজের ক্ষুরধার পেস আক্রমণ। একসময় যেখানে লক্ষ্য থাকতো শুধু সম্মান বাঁচিয়ে লড়াই করা, সেখানে আজ টাইগাররা চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। প্যাট কামিন্সদের দম্ভ ভেঙে দিয়ে তাদেরই মাঠে কীভাবে রচিত হলো এই সাফল্য? দলের মানসিকতায় কী ধরনের বিপ্লব এসেছে এবং পেস ইউনিটের এই নবজাগরণের নেপথ্য কারিগরদের ভূমিকা কী? এসব নিয়েই কথা বলেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান পেস বোলিং কোচ তালহা জুবায়ের। নিজের ফেলে আসা খেলোয়াড়ি জীবনের আক্ষেপ, পেসারদের চোট ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। দৈনিক মানবজমিনের সঙ্গে কথোপকথনের চুম্বক অংশ নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই সিরিজে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সের মূল পার্থক্যটা কোথায় ছিল?
তালহা জুবায়ের: দেখুন, আমি তুলনামূলক বিশ্লেষণে যাবো না। মূল বিষয় হলো আমরা ভালো ক্রিকেট খেলেছি। নিজেদের সামর্থ্যরে ওপর গভীর বিশ্বাস ছিল। প্রস্তুতি ম্যাচ ভালো না হলেও তা আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলেনি; কারণ কন্ডিশনে মানিয়ে নেয়াটাই মূল লক্ষ্য ছিল। সেরাটা খেলতে পারলে জয় সম্ভবÑ এই বিশ্বাস দলের সবার মধ্যে ছিল এবং আল্লাহর রহমতে আমরা সফল হয়েছি।
প্রশ্ন: টেস্ট ক্রিকেটে এত বছর পর বাংলাদেশ দলের ভেতরে আসল পরিবর্তনটা কোথায় এসেছে?
তালহা জুবায়ের: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন মানসিকতা ও আত্মবিশ্বাসের জায়গায়। দল এখন পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অতীতে শুধু সম্মানজনকভাবে খেলার প্রবণতা ছিল, এখন সেই দিন বদলে গেছে। ব্যাটার ও বোলার উভয়েই অভিজ্ঞ। বিশেষ করে প্রতিপক্ষকে চোখে চোখ রেখে বড় চ্যালেঞ্জ জানানোর অস্ত্র এখন আমাদের হাতে রয়েছে।
প্রশ্ন: পেস বোলিং ডিপার্টমেন্টে কৌশলগত জায়গাগুলোয় কতোটা অগ্রগতি হয়েছে?
তালহা জুবায়ের: পেস আক্রমণের ধার বাড়লে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা সহজ হয়। পেসাররা নিয়মিত আক্রমণ করায় প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা কমফোর্ট জোনে খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। এই জায়গায় আমাদের বড় উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো উইকেটে কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে পার্থক্য গড়ে দেয়ার মতো মিরাজ ও তাইজুলের মতো বিশ্বমানের স্পিনার আমাদের রয়েছে।
প্রশ্ন: প্রথম টেস্ট জয়ের পর অস্ট্রেলিয়া দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে কী ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন?
তালহা জুবায়ের: টেস্টের আগে প্যাট কামিন্স বলেছিলেন তিন দিনে খেলা শেষ করে মাছ ধরতে যাবেন কিংবা নাহিদ রানাকে চেনেন না। এগুলো তাদের অতি-আত্মবিশ্বাস ও অহংকার থেকেই বলা। প্রথম টেস্টে হারার পর তাদের সেই দম্ভ মাটিতে নেমে আসে। তবে মাঠের বাইরে মনস্তাত্ত্বিক কথা বললেও মাঠের ভেতর অস্ট্রেলীয়রা মার্জিত ও শ্রদ্ধাশীল ছিল, কোনো স্লেজিং করেনি। প্রথম ম্যাচ জয়ের পর দ্বিতীয় টেস্টের মানসিকতা নিয়েও আমাদের দারুণ শিক্ষা হয়েছে।
প্রশ্ন: জাতীয় দলের পেস বোলিং কোচের দায়িত্ব পালন আপনার জন্য কতোটা গর্বের?
তালহা জুবায়ের: দেশের হয়ে খেলার পর কোচ হিসেবে কাজ করতে পারা অবশ্যই অনেক বড় গর্বের। তাসকিনদের ছোটবেলা থেকেই দেখছি, একসঙ্গে খেলেওছি। খেলোয়াড়রা পরিচিত হলেও আন্তর্জাতিক প্রতিপক্ষ নিয়ে পরিকল্পনা সাজানোর পরিবেশটা সম্পূর্ণ নতুন।
প্রশ্ন: খেলোয়াড়ি জীবনের ফেলে আসা আক্ষেপ কি এখন কোচিংয়ে প্রেরণা জোগায়?
তালহা জুবায়ের: চোটের কারণে ক্যারিয়ারে যা করতে পারিনি, সেই আক্ষেপ চিরকাল থাকবে। তবে বিশ্বাস করি, আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। কোচিংয়ে আসার পর থেকেই লক্ষ্য ছিল তরুণ পেসারদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়া। সেই সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ এবং দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পেস বিভাগকে সেবা দিয়ে যেতে চাই।
প্রশ্ন: দলের পেসারদের ওয়ার্কলোড ও ইনজুরি ম্যানেজমেন্ট আসলে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে?
তালহা জুবায়ের: কোচ হিসেবে কাউকে আলাদা রেট করব না; সবাই দুর্দান্ত ফর্মে আছে। পেসারদের জন্য ইনজুরি নিত্যসঙ্গী, নাহিদ রানার চোটটাও একেবারেই আকস্মিক। তবে বিসিবি অত্যন্ত পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পেসারদের ওয়ার্কলোড নিয়ন্ত্রণ করছে। বাইরে ভুল ধারণা থাকলেও তাদের শতভাগ সঠিক যত্ন নেয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন: সামনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন সিরিজ; পেসারদের নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
তালহা জুবায়ের: পেসারদের জন্য অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি প্রতিপক্ষ এবং তাদের নির্দিষ্ট ব্যাটারদের দুর্বলতাগুলো পর্যালোচনা করে আমরা স্পেসিফিক প্ল্যান সাজাচ্ছি। ইনশাল্লাহ, সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই দল মাঠে নিজেদের সেরাটা উপহার দেবে।
প্রশ্ন: কোচদের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রায়ই অনিশ্চয়তা থাকে। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছেন?
তালহা জুবায়ের: ভবিষ্যৎ একমাত্র আল্লাহই জানেন। আমার দায়িত্ব সততার সঙ্গে নিজের কাজটি করে যাওয়া। দেশের ক্রিকেটের স্বার্থে যেখানেই সুযোগ পাবো, সেখানেই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাবো।
