ঘন সবুজে আবৃত বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, মাঝখানে কর্দমাক্ত মেঠোপথ, আর পথের দু’পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি তালগাছ বাংলার গ্রামীণ ও উপকূলীয় জীবনের এই চিরচেনা দৃশ্য এখন ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে। একসময় গ্রামের পথ, মাঠের আইল, বাড়ির আঙিনা কিংবা নদী-খালের পাড়ে সহজেই চোখে পড়ত তালগাছ। অথচ অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটার কারণে পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক এই বৃক্ষটি আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।
তালগাছ শুধু একটি বৃক্ষ নয়; এটি আমাদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও লোকজ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক পরম উপকারী বৃক্ষ। দীর্ঘজীবী এই গাছ প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। এর বিস্তৃত ও গভীর শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখে, ফলে ভূমিক্ষয় রোধে সহায়তা করে। নদী ও উপকূলীয় এলাকায় মাটির স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ঝড়ো হাওয়া ও জলোচ্ছ্বাসের অভিঘাত কমাতেও তালগাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উঁচু ও শক্ত কাণ্ডের কারণে বজ্রপাতপ্রবণ গ্রামীণ এলাকায় তালগাছকে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর সম্ভাব্য প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তবে তালগাছকে বজ্রপাত প্রতিরোধের একমাত্র বা নিশ্চিত উপায় হিসেবে না দেখে এর পাশাপাশি বজ্রপাত-সচেতনতা ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
তালের রয়েছে বহুমুখী অর্থনৈতিক গুরুত্ব। পাকা তালের সুগন্ধ ও স্বাদ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তালের রস ও শাঁস থেকে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা, পায়েস, তালসত্ত্ব, মিছরি ও গুড়। তালের আঁশ, পাতা ও ছোবড়া ব্যবহার করে তৈরি হয় বিভিন্ন কুটিরশিল্পজাত পণ্য। তালপাতার হাতপাখা একসময় গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল। তালগাছের পরিণত কাণ্ডের কাঠও বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একটি তালগাছ একই সঙ্গে পরিবেশগত সম্পদ, খাদ্যসম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্পদ।
তালগাছের সঙ্গে আমাদের সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির সম্পর্কও গভীর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে’--শিশুসাহিত্যের এই অমর পঙ্ক্তিতে তালগাছ হয়ে উঠেছে আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার প্রতীক। আবার রজনীকান্ত সেনের ‘বাবুই পাখিরে ডাকি’ কবিতায় নিজের হাতে গড়া বাসার প্রতি বাবুই পাখির আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরতার যে বোধ ফুটে উঠেছে, তা আমাদের জীবনদর্শনেরও অনন্য শিক্ষা। তালগাছ ও বাবুই পাখির সম্পর্ক তাই কেবল প্রকৃতির নয়; এটি আত্মনির্ভরতা, শ্রম, সৃজনশীলতা ও নিজের অস্তিত্ব রক্ষার এক প্রতীকী পাঠ। তালপাতার আড়ালে বাবুই পাখির ঝুলন্ত বাসা ছিল বাংলার প্রকৃতির অন্যতম নান্দনিক দৃশ্য। কিন্তু তালগাছ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে বাবুই পাখির নিরাপদ আবাসও। জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে তাই তালগাছ রোপণ মানে শুধু একটি গাছ লাগানো নয়; বরং পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণেরও উদ্যোগ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, তালগাছের বহুমুখী উপকারিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাবে অনেক এলাকায় পুরোনো তালগাছ কেটে ফেলা হচ্ছে। কোথাও তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথাও ঘরবাড়ি নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজে। অথচ নতুন করে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ খুবই সীমিত। ফলে একদিকে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ নান্দনিকতা, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। প্রশ্ন হলো-এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব কার? কেবল সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না। প্রয়োজন ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন এবং তরুণ সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ক্রমেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে পড়ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় জনপদে এমন বৃক্ষের প্রয়োজন, যা দীর্ঘদিন টিকে থেকে পরিবেশকে সবুজ রাখবে এবং স্থানীয় প্রতিবেশব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। তালগাছ সেই বিবেচনায় একটি সম্ভাবনাময় বৃক্ষ। তবে তালগাছ একাই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা বজ্রপাতের সমাধান নয়; বরং উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, ম্যানগ্রোভ ও অন্যান্য দেশীয় বৃক্ষের সঙ্গে সমন্বিত বৃক্ষায়নের অংশ হিসেবে তালগাছকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তালগাছের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার মধ্যে। দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিবছর পরিকল্পিতভাবে তালবীজ সংগ্রহ, বীজ সংরক্ষণ, চারা উৎপাদন এবং উপযুক্ত মৌসুমে রোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবস কিংবা অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে শুধু ফুলের তোড়া বা আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে একটি করে তালবীজ বপন বা চারা রোপণের সংস্কৃতি গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একটি অনুষ্ঠান যেমন অর্থবহ হবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হবে একটি সবুজ উত্তরাধিকার এবং স্থায়ী সামাজিক দায়বদ্ধতায়। এটি কেবল একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নয়; বরং উপকূলীয় পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বিনিয়োগ। এখন প্রয়োজন এই উদ্যোগকে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন ও তরুণ সমাজের সম্মিলিত কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া।
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী যদি একটি করে তালবীজ বপন করে এবং একটি গাছের দায়িত্ব নেয়, ভবিষ্যতে সেই গাছটির সঙ্গে তার তৈরি হবে আবেগ ও দায়িত্বের সম্পর্ক। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে একটি করে ‘তালবীজের সবুজ কেন্দ্র’। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের প্রধান উৎসাহ দেবেন, শিক্ষার্থীরা বীজ সংগ্রহ ও রোপণ করবে, আর সামাজিক সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা প্রয়োজনীয় কারিগরি ও সাংগঠনিক সহায়তা দেবে। এভাবেই একটি ছোট উদ্যোগ পরিণত হতে পারে বৃহত্তর পরিবেশ আন্দোলনে। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে উঠতে পারে তালগাছের সবুজ বলয়।
তালগাছ আমাদের প্রকৃতির বন্ধু, গ্রামীণ অর্থনীতির সম্ভাবনাময় সম্পদ এবং বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। এর ছায়ায় যেমন পাখি আশ্রয় পায়, তেমনি এর ফল ও পাতা মানুষের জীবনে বহুমুখী উপকার বয়ে আনে। তাই তালগাছ রক্ষা করা মানে শুধু একটি বৃক্ষ রক্ষা করা নয়; বরং প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও মানুষের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করার অংশীদার হওয়া। আসুন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে, জমির আইল ও অনাবাদি জমিতে তালবীজ বপন করি। তরুণদের হাতে হাতে ছড়িয়ে দিই তালবীজ। পরিকল্পিতভাবে তালগাছ লাগিয়ে গড়ে তুলি দেশের গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী। বেশি করে তালগাছ লাগাই- তালগাছে প্রকৃতি সাজাই, জীবন বাঁচাই।
লেখক: উপকূল গবেষক এবং প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, উপকূল ফাউন্ডেশন।
