ওষুধের অভাবে নয়, ওষুধের নিশ্চয়তায় গড়ে উঠুক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ওষুধের অভাবে নয়, ওষুধের নিশ্চয়তায় গড়ে উঠুক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা

ফন্ট সাইজ:

একজন রোগী চিকিৎসকের কাছে গেলেন, রোগ নির্ণয় হলো, প্রেসক্রিপশন পেলেন; কিন্তু তিনি যদি সেই প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কিনতেই না পারেন, তাহলে চিকিৎসার এত আয়োজন শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর?
শুধু হাসপাতাল নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা নতুন নতুন বিশেষায়িত সেবা চালু করলেই একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ হয় না। চিকিৎসার শেষ ধাপ পর্যন্ত রোগীর পাশে থাকা জরুরি। আর সেই শেষ ধাপের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো-প্রয়োজনীয় ওষুধের নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, কিডনি রোগ, হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের রোগ, ক্যানসারসহ অসংখ্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে মানুষকে মাসের পর মাস, অনেক ক্ষেত্রে সারা জীবন ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। এসব রোগের চিকিৎসায় ওষুধ একদিন বা এক সপ্তাহের বিষয় নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়।
অর্থের অভাবে একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগী ওষুধ বন্ধ করলে তাঁর স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ভবিষ্যতে কিডনি, চোখ, স্নায়ু, মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। হৃদ্রোগের রোগী জরুরি অ্যান্টিপ্লেটলেট বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়মিত না নিলে গুরুতর পরিণতি হতে পারে।
তাই সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ নিশ্চিত করা কেবল বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি রোগ প্রতিরোধ, জীবন রক্ষা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠার অন্যতম মৌলিক শর্ত।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে একটি সমন্বিত জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে।
জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক কী
এটি কেবল সরকারি হাসপাতালের ভেতরে একটি ওষুধের দোকান হবে না। এটি হবে সরকারের মালিকানা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি দেশব্যাপী, স্বচ্ছ, ডিজিটাল, মাননিয়ন্ত্রিত ও ফার্মাসিস্ট-নেতৃত্বাধীন ওষুধ সরবরাহব্যবস্থা।
এর মূল দর্শন হবে-
সঠিক রোগীর কাছে সঠিক ওষুধ,সঠিক মাত্রায়,সঠিক সময়ে, সঠিক মানে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়া।
জাতীয় সরকারি ফার্মেসিকে তাই দোকান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় ওষুধ নিরাপত্তা অবকাঠামো হিসেবে দেখতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য কেন এটি বিশেষভাবে প্রয়োজন
বাংলাদেশে ওষুধ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। দেশের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ ওষুধই দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। এটি আমাদের বড় শক্তি।
কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তিনটি প্রশ্ন এখনো গুরুত্বপূর্ণ-
প্রয়োজনীয় ওষুধটি সব সময় পাওয়া যায় কি? ওষুধটির মান নিশ্চিত কি? রোগী কি ওষুধটির মূল্য বহন করতে পারেন?
জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক এই তিন সমস্যার সমন্বিত সমাধান দিতে পারে।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় একটি অংশ এখনো মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। বিশেষ করে ওষুধের ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। তাই সরকারি পর্যায়ে ন্যায্যমূল্যে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে স্বাস্থ্যব্যয়ের আর্থিক বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
জাতীয় পর্যায়ে একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দরকার
প্রথমেই একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় পরিচালনা কাঠামো গঠন করতে হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষায়িত “জাতীয় সরকারি ফার্মেসি কর্তৃপক্ষ” গঠন করা যেতে পারে।
এই কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়িত্ব হবে-
জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নির্ধারণ,
কেন্দ্রীয় ক্রয়, সরবরাহ ও বিতরণ, মূল্যনীতি, ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা, ফার্মাসিস্ট ব্যবস্থাপনা, গুদাম ও কোল্ড চেইন, অডিট ও জবাবদিহি এবং সারা দেশের ফার্মেসি নেটওয়ার্কের সমন্বয়।
তবে ওষুধের নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন ভূমিকা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
যে প্রতিষ্ঠান ওষুধ কিনবে ও বিতরণ করবে, সেই একই প্রতিষ্ঠান যেন নিজের ওষুধের মান ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিচারক না হয়।
এই পৃথকীকরণই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মূল ভিত্তি।
বহুপক্ষীয় পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে
জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্ক শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রকল্প হওয়া উচিত নয়।
এর পরিচালনা পর্ষদে রাখতে হবে-
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় ঔষধাগার, ফার্মেসি কাউন্সিল, চিকিৎসক প্রতিনিধি, নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, সরবরাহব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, রোগী প্রতিনিধি এবং স্বাধীন অডিট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।

চিকিৎসাবিজ্ঞান, ফার্মেসি, অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জনস্বাস্থ্য—সবগুলোকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
পাঁচ স্তরের জাতীয় নেটওয়ার্ক
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় একটি পাঁচ স্তরের কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে।
প্রথম স্তর: জাতীয় কেন্দ্রীয় ওষুধ ভান্ডার
এখানে থাকবে কেন্দ্রীয় ক্রয়, চাহিদা নিরূপণ, জাতীয় মজুত, জরুরি নিরাপত্তা মজুত এবং বিতরণ পরিকল্পনা।
দ্বিতীয় স্তর: বিভাগীয় বা আঞ্চলিক বিতরণকেন্দ্র
প্রতিটি বিভাগ বা কৌশলগত অঞ্চলে আধুনিক গুদাম, কোল্ড চেইন এবং দ্রুত পরিবহনব্যবস্থা থাকবে।
তৃতীয় স্তর: জেলা সরকারি ফার্মেসি
প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ সরকারি ফার্মেসি চালু করা হবে।
চতুর্থ স্তর: উপজেলা সরকারি ফার্মেসি
প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের শাখা থাকবে।
পঞ্চম স্তর: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়
পরবর্তী পর্যায়ে নির্বাচিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনুমোদিত ওষুধ বিতরণকেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে “কেন্দ্র থেকে গ্রাম” পর্যন্ত একটি নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরি হবে।
বিদ্যমান বেসরকারি ফার্মেসিকেও অংশীদার করা যেতে পারে
বাংলাদেশে ইতিমধ্যে একটি বিশাল বেসরকারি খুচরা ওষুধের বাজার রয়েছে। তাই প্রতিটি স্থানে নতুন সরকারি ভবন নির্মাণ করাই একমাত্র সমাধান হওয়া উচিত নয়।
একটি দুই স্তরের মডেল কার্যকর হতে পারে।
প্রথমত, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে থাকবে সরাসরি সরকারি মালিকানাধীন ফার্মেসি। দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি ফার্মেসি স্থাপন সম্ভব নয়, সেখানে কঠোর মানদণ্ড পূরণকারী নির্দিষ্ট মডেল ফার্মেসিকে “জাতীয় ফার্মেসি অনুমোদিত কেন্দ্র” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
তবে এসব অংশীদার ফার্মেসির মূল্য, মজুত, প্রেসক্রিপশন যাচাই এবং ভর্তুকিপ্রাপ্ত ওষুধের বিক্রয় কেন্দ্রীয়ভাবে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে হবে।
এর ফলে দ্রুত সারাদেশে সেবা সম্প্রসারণ সম্ভব।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকাই হবে মূল ভিত্তি
জাতীয় সরকারি ফার্মেসিতে শুরুতেই হাজার হাজার ওষুধ রাখার দরকার নেই। প্রথমে একটি হালনাগাদ জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকা নির্ধারণ করতে হবে।
রোগের প্রকোপ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রমাণ, ব্যয়-কার্যকারিতা এবং জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার পাবে-
উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ ও ইনসুলিন, হৃদ্রোগ ও হার্ট ফেইলিউরের ওষুধ, রক্ত জমাট প্রতিরোধকারী ওষুধ, হাঁপানি ও ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগের ওষুধ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ওষুধ, কিডনি রোগের ওষুধ, মানসিক রোগের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ,
নির্বাচিত অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসারের নির্বাচিত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত জীবনরক্ষাকারী ওষুধ।
এই তালিকা নিয়মিত বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে হালনাগাদ করতে হবে।
ব্র্যান্ড নয়, মানসম্পন্ন জেনেরিককে অগ্রাধিকার
সরকারি ফার্মেসির মূলনীতি হতে হবে-
“ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা নয়, মান ও কার্যকারিতার নিশ্চয়তা।”
একই জেনেরিকের অসংখ্য ব্র্যান্ড সরকারি ফার্মেসিতে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।
স্বচ্ছ দরপত্র, উৎপাদনকারীর সক্ষমতা, মাননিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা যাচাই করে গুণগত মানসম্পন্ন জেনেরিক ওষুধ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এতে উল্লেখযোগ্যভাবে খরচ কমানো সম্ভব হবে।
কেন্দ্রীয়ভাবে বৃহৎ পরিমাণে ক্রয়
জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের বড় অর্থনৈতিক সুবিধা হবে বৃহৎ পরিমাণে কেন্দ্রীয় ক্রয়।
সারা দেশের বার্ষিক চাহিদা নিরূপণ করে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বড় পরিমাণে ওষুধ কিনলে সরকার তুলনামূলক কম দামে ওষুধ সংগ্রহ করতে পারবে। তবে সর্বনিম্ন দর কখনোই একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়।
দরপত্র মূল্যায়নের সময় অবশ্যই দেখতে হবে-
ওষুধের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহের ধারাবাহিকতা,
উৎপাদন প্রক্রিয়ার মান, ব্যাচ পরীক্ষার ফলাফল এবং সময়মতো সরবরাহের ইতিহাস।
নীতি হওয়া উচিত-
“কম দাম চাই, কিন্তু মানের বিনিময়ে নয়।”
একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে
জীবনরক্ষাকারী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে একাধিক অনুমোদিত সরবরাহকারী রাখতে হবে। একটি কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ করলে যেন সারা দেশে ওষুধ সংকট তৈরি না হয়।
সরকার যদি এক বা একাধিক বছরের সম্ভাব্য চাহিদার তথ্য উৎপাদক প্রতিষ্ঠানকে আগেই জানায়, তাহলে তারাও কাঁচামাল সংগ্রহ ও উৎপাদন পরিকল্পনা আরও সুশৃঙ্খলভাবে করতে পারবে। এতে ওষুধের কৃত্রিম ও আকস্মিক সংকট কমানো সম্ভব।
স্বাধীন মাননিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক
জাতীয় ফার্মেসিতে ওষুধ পৌঁছালেই সেটি রোগীর হাতে চলে যাবে—এমন ব্যবস্থা করা উচিত নয়। ঝুঁকিভিত্তিক ও নমুনাভিত্তিক পরীক্ষার শক্তিশালী ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রয়োজনে বাজারে বিতরণের পরও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কোনো ব্যাচে সমস্যা পাওয়া গেলে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জানা যাবে-
ওই ব্যাচ কোন জেলায় গেছে, কোন ফার্মেসিতে আছে
এবং কত পরিমাণে বিতরণ হয়েছে। তারপর দ্রুত সারা দেশ থেকে সেই ব্যাচ প্রত্যাহার করা সম্ভব হবে।
প্রতিটি ওষুধের থাকবে ডিজিটাল পরিচয়
প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে অনন্য বারকোড বা কিউআর কোড থাকা উচিত।
স্ক্যান করলে জানা যাবে- ওষুধের নাম,উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাচ নম্বর,উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক তথ্য। এতে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ শনাক্তকরণ সহজ হবে এবং পুরো সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হবে নেটওয়ার্কের মেরুদণ্ড
জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্ককে শুরু থেকেই শতভাগ ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। একটি কেন্দ্রীয় জাতীয় ফার্মেসি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থাকবে।
সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে-
কোন ওষুধের কত মজুত আছে, কোন জেলায় চাহিদা বাড়ছে, কোথায় স্টক শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কোন ব্যাচের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, কোথায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ওষুধ যাচ্ছে এবং কোন অঞ্চলে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে অপচয়, চুরি, অনিয়ম এবং কৃত্রিম সংকট কমানো সম্ভব হবে।
ওষুধের সংকট পূর্বাভাস ব্যবস্থা
ডিজিটাল তথ্য শুধু হিসাব রাখার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য ব্যবহার করতে হবে।
কোন ওষুধ কোন সময়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কোথায় চাহিদা বাড়ছে, কত উৎপাদন হচ্ছে এবং কত মজুত আছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেই সম্ভাব্য সংকটের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থাও ব্যবহার করা যেতে পারে।
এতে সরকার আগেভাগেই সরবরাহ বাড়ানো, বিকল্প উৎপাদক নির্বাচন বা প্রয়োজনে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
রোগীদের জন্য মোবাইল অ্যাপ ও হটলাইন
সাধারণ মানুষের জন্য একটি সহজ মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট থাকা উচিত।
রোগী ঘরে বসেই জানতে পারবেন- কাছের সরকারি ফার্মেসি কোথায়, প্রয়োজনীয় ওষুধটি সেখানে আছে কি না, সরকারি মূল্য কত, ফার্মেসি কখন খোলা এবং ওষুধটি প্রেসক্রিপশন-নির্ভর কি না। প্রবীণ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অক্ষম মানুষের জন্য একটি জাতীয় হটলাইনও থাকতে পারে।
ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশনের সঙ্গে সংযোগ
পর্যায়ক্রমে হাসপাতালের ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের একটি নির্দিষ্ট কোড বা রোগীর স্বাস্থ্য পরিচিতি ব্যবহার করে ফার্মেসি প্রেসক্রিপশন যাচাই করবে।
এর ফলে-
ভুল ওষুধ বিতরণ কমবে, নিয়ন্ত্রিত ওষুধের অপব্যবহার কমবে,
একই প্রেসক্রিপশন বারবার ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হবে, রোগীর ওষুধ গ্রহণের ইতিহাস সংরক্ষণ করা যাবে এবং ওষুধের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া শনাক্ত করা সহজ হবে।
ফার্মাসিস্ট ছাড়া জাতীয় ফার্মেসি নয়
জাতীয় সরকারি ফার্মেসিকে সাধারণ ওষুধের দোকানে পরিণত করা যাবে না। এখানে নিবন্ধিত ও প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্টকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা দিতে হবে। ফার্মাসিস্ট শুধু ওষুধ হাতে তুলে দেবেন না। তিনি রোগীকে বুঝিয়ে দেবেন- কীভাবে ওষুধ খাবেন, কখন খাবেন, কতদিন খাবেন, কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, কোন ওষুধের সঙ্গে সমস্যা হতে পারে, কীভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং কোন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। বয়স্ক এবং একই সঙ্গে অনেক ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের জন্য ওষুধ পর্যালোচনা সেবা চালু করা যেতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধে জাতীয় ফার্মেসি হবে কার্যকর হাতিয়ার
জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রোধ করা।
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এখন বিশ্বব্যাপী একটি বড় জনস্বাস্থ্য হুমকি। বাংলাদেশে চিকিৎসকের যথাযথ প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, ভুল অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন, ভুল মাত্রা এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই ওষুধ বন্ধ করার প্রবণতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের আওতায় কঠোর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ ব্যবস্থা চালু করা উচিত। নিবন্ধিত চিকিৎসকের বৈধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া প্রেসক্রিপশন-নির্ভর অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা যাবে না। পর্যায়ক্রমে ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন চালু করে অ্যান্টিবায়োটিক বিতরণের তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রেখে জাতীয় পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে- কোন অঞ্চলে কোন অ্যান্টিবায়োটিক অস্বাভাবিকভাবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কোন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং কোথায় ব্যবহারের প্রবণতা জাতীয় নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জাতীয় অ্যান্টিবায়োগ্রাম তৈরি করা দরকার
হাসপাতাল ও অঞ্চলভিত্তিক জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতার তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় অ্যান্টিবায়োগ্রাম তৈরি করতে হবে। চিকিৎসক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট এবং সংক্রমণ বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে হাসপাতালভিত্তিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি শক্তিশালী করতে হবে। নিয়মিত প্রেসক্রিপশন অডিট এবং চিকিৎসকদের প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের মোড়কে স্পষ্ট সতর্কতামূলক চিহ্ন এবং বাংলা ভাষায় নির্দেশনা থাকা উচিত। রোগীদেরও বুঝতে হবে- সর্দি-কাশি বা অধিকাংশ ভাইরাসজনিত অসুখে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। চিকিৎসকের নির্দেশিত মাত্রা ও সময়কাল অনুসরণ করতে হবে। “অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ ওষুধ নয়—এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জাতীয় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার অংশ।”
২৪ ঘণ্টার জরুরি সরকারি ফার্মেসি
সব সরকারি ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা বাস্তবসম্মত নয়।
কিন্তু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা সদর হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্রে সরকারি ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা উচিত। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর সংক্রমণ, দুর্ঘটনা বা অন্য জীবনসংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীর স্বজনকে মধ্যরাতে ওষুধের জন্য শহরের এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরতে হওয়া উচিত নয়। হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসার সঙ্গে জরুরি ওষুধ সরবরাহও সমন্বিত থাকতে হবে। দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে, অন্যদের জন্য ন্যায্যমূল্যে
জাতীয় সরকারি ফার্মেসি মানেই সব নাগরিকের সব ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া—এমন ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। বরং একটি স্তরভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
অতি দরিদ্র ও সামাজিক সুরক্ষাভোগীরা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিনামূল্যে বা প্রায় বিনামূল্যে পাবেন। নিম্নআয়ের মানুষ উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি পাবেন। অন্য নাগরিকরা কেন্দ্রীয় ক্রয়ের সুবিধায় ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ওষুধ কিনতে পারবেন। মূলনীতি হবে- “যার আর্থিক সক্ষমতা কম, রাষ্ট্র তার পাশে বেশি থাকবে। দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের জন্য মাসিক ওষুধ প্যাকেজ
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, হাঁপানি এবং অন্যান্য স্থিতিশীল দীর্ঘমেয়াদি রোগে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া যেতে পারে। এতে রোগীকে বারবার ফার্মেসিতে যেতে হবে না এবং চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বাড়বে। ভবিষ্যতে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী বা বিশেষ প্রয়োজনসম্পন্ন রোগীদের জন্য বাড়িতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রেসক্রিপশনের ওষুধ রোগী বাস্তবে পেলেন কি না—রাষ্ট্রকে জানতে হবে
একজন চিকিৎসক পাঁচটি ওষুধ লিখলেন, কিন্তু রোগী সামর্থ্য বা সরবরাহ সংকটের কারণে মাত্র দুটি কিনলেন—বর্তমান ব্যবস্থায় এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সাধারণত স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাছে ফিরে আসে না। জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক চালু করা যেতে পারে- প্রেসক্রিপশন পূরণের হার। অর্থাৎ চিকিৎসকের নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের কত শতাংশ রোগী বাস্তবে পেলেন। এটি ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হতে পারে।
কোল্ড চেইন বাধ্যতামূলক
ইনসুলিন, কিছু টিকা, জৈবিক ওষুধ এবং নির্দিষ্ট ইনজেকশন সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। জাতীয় ফার্মেসির প্রতিটি প্রাসঙ্গিক পর্যায়ে তাপমাত্রা-নিয়ন্ত্রিত গুদাম ও পরিবহনব্যবস্থা থাকতে হবে। ডিজিটাল তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোথাও কোল্ড চেইন ভেঙে গেলে সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে সতর্কতা পাওয়া যাবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অপচয় কমাতে হবে
এক জেলায় অতিরিক্ত ওষুধ পড়ে আছে অথচ অন্য জেলায় একই ওষুধের সংকট—এটি অদক্ষ ব্যবস্থাপনার লক্ষণ। ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ওষুধ পুনর্বণ্টন করা উচিত।
নীতি হওয়া উচিত- “যার মেয়াদ আগে শেষ হবে, সেটিই আগে বিতরণ।” এতে সরকারি অর্থের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যাবে। দুর্যোগের জন্য কৌশলগত ওষুধ মজুত বাংলাদেশ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের অধীনে জরুরি পরিস্থিতির জন্য কৌশলগত ওষুধ মজুত থাকতে হবে। এর মধ্যে থাকবে- জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, ইনসুলিন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ওষুধ, নির্বাচিত অ্যান্টিবায়োটিক, জরুরি ইনজেকশন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জাতীয় ব্যবস্থা
জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্ককে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্ট ডিজিটালভাবে রিপোর্ট করতে পারবেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে একই ওষুধ বা একই ব্যাচের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ এলে দ্রুত সতর্কতা জারি করা সম্ভব হবে। এতে জাতীয় ওষুধ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে।
সরকারি ফার্মেসি বেসরকারি খাতের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়
জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য বেসরকারি ফার্মেসি ব্যবসাকে ধ্বংস করা নয়। বরং এটি একটি জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করবে। কীভাবে ওষুধ সংরক্ষণ করতে হবে, কীভাবে ফার্মাসিস্ট রোগীকে পরামর্শ দেবেন,
কীভাবে মূল্য স্বচ্ছ রাখা হবে এবং কীভাবে প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ওষুধ নিরাপদে বিতরণ করা হবে—সরকারি নেটওয়ার্ক সেই মান নির্ধারণ করতে পারে। ফলে বেসরকারি খাতেও মানোন্নয়নের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে।
কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে
এত বড় কর্মসূচি একসঙ্গে সারা দেশে চালু করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রথম পর্যায়: নীতি ও প্রস্তুতি
প্রথম ছয় মাসে- জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন, আইনি কাঠামো পর্যালোচনা, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ তালিকা চূড়ান্ত,
ক্রয়নীতি, মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ডিজিটাল নকশা, অর্থায়ন কাঠামো এবং জনবল পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়: পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন
প্রথমে নির্বাচিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং কয়েকটি জেলা সদর হাসপাতালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্প চালু করা যেতে পারে।
তৃতীয় পর্যায়: মূল্যায়ন
প্রথম বছর শেষে দেখতে হবে- ওষুধের দাম কতটা কমেছে, প্রাপ্যতা কতটা বেড়েছে, রোগীর ব্যক্তিগত ব্যয় কতটা কমেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে কত ওষুধ নষ্ট হয়েছে, রোগীর সন্তুষ্টি কতটা বেড়েছে, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বেড়েছে কি না এবং কোথায় দুর্নীতি বা অপচয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
চতুর্থ পর্যায়: সব জেলায় সম্প্রসারণ
পরীক্ষামূলক প্রকল্পের ভুল সংশোধন করে পর্যায়ক্রমে দেশের সব জেলা সদর হাসপাতালে চালু করা যেতে পারে।
পঞ্চম পর্যায়: উপজেলা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা
এরপর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং নির্বাচিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হবে।
সফলতা কীভাবে মাপা হবে
শুধু কতটি সরকারি ফার্মেসি খোলা হলো—এটিকে সাফল্য বলা যাবে না।
সাফল্য মাপতে হবে-অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতার হার, রোগীর ওষুধ ব্যয় কতটা কমেছে,ওষুধের ঘাটতির হার,
মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে নষ্ট হওয়া ওষুধের পরিমাণ, প্রেসক্রিপশন পূরণের হার, রোগীর সন্তুষ্টি, অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার, সরবরাহের সময় এবং মানসংক্রান্ত অভিযোগের হার দিয়ে।
এই তথ্য নিয়মিত জনগণের সামনে প্রকাশ করা উচিত। দুর্নীতি প্রতিরোধে শুরু থেকেই শক্ত ব্যবস্থা
বৃহৎ সরকারি ওষুধ ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিয়মের ঝুঁকি থাকবে।তাই শুরু থেকেই থাকতে হবে-
ইলেকট্রনিক দরপত্র, ডিজিটাল ক্রয় আদেশ, ব্যাচভিত্তিক ট্র্যাকিং, অনলাইন মজুত তথ্য, স্বাধীন মান পরীক্ষা, তৃতীয় পক্ষের অডিট, স্বাধীন আর্থিক নিরীক্ষা, অনিয়ম জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদন।
জাতীয় ফার্মেসির সবচেয়ে বড় সম্পদ হবে জনগণের আস্থা। অর্থায়নের একটি টেকসই কাঠামো দরকার
অর্থায়নের উৎস হতে পারে- সরকারি স্বাস্থ্য বাজেট,সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি,ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থা, রোগীর সহনীয় অংশগ্রহণমূলক মূল্য এবং নির্দিষ্ট উন্নয়ন সহযোগিতা। কিন্তু যেকোনো অর্থায়ন ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকতে হবে সামাজিক ন্যায়বিচার।
বাংলাদেশ কী পাবে
একটি সফল জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হলে- মানসম্মত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে।
ওষুধের জন্য রোগীর ব্যক্তিগত ব্যয় কমবে। দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসাজনিত আর্থিক চাপ কমবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বাড়বে। নকল ও নিম্নমানের ওষুধ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। ওষুধের কৃত্রিম সংকট দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। সরকার ওষুধের প্রকৃত জাতীয় চাহিদার তথ্য পাবে। অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ উন্নত হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের অপচয় কমবে।
দুর্যোগে দ্রুত ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে- চিকিৎসার আর্থিক বৈষম্য কমানোর একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
এটি কেবল ফার্মেসি প্রকল্প নয়—সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আগামী কয়েক দশকের জন্য প্রস্তুত করতে হলে শুধু হাসপাতাল, আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাথল্যাব কিংবা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। হাসপাতাল থেকে রোগী বাড়ি ফেরার পরও তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। একজন চিকিৎসকের পক্ষে প্রেসক্রিপশনে পাঁচটি ওষুধ লেখা সহজ। কিন্তু রোগী আগামী পাঁচ বছর সেই পাঁচটি ওষুধ নিয়মিত কিনতে পারবেন কি না—সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানে। ওষুধের প্রাপ্যতা ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অসম্পূর্ণ।
এখনই জাতীয় কমিশন গঠন করা হোক
সরকারের উচিত দ্রুত একটি “জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক বাস্তবায়ন কমিশন” গঠন করা। এই কমিশন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দেবে-
কোন ওষুধ থাকবে,কীভাবে ক্রয় হবে, কীভাবে মূল্য নির্ধারিত হবে, কোথায় প্রথম ফার্মেসি চালু হবে, কতজন ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন, কীভাবে মান পরীক্ষা হবে, কীভাবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং হবে, কারা ভর্তুকি পাবেন, কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধ করা হবে, কীভাবে অর্থায়ন হবে এবং কীভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা হবে।
শেষ কথা
একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সফলতা শুধু কতটি হাসপাতাল তৈরি হলো, কতটি যন্ত্র কেনা হলো বা কতজন চিকিৎসক কর্মরত—তা দিয়ে বিচার করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- একজন সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ কি তিনি সময়মতো, নিরাপদভাবে এবং আর্থিক বিপর্যয় ছাড়াই পাচ্ছেন? বাংলাদেশের জন্য একটি আধুনিক, ডিজিটাল, স্বচ্ছ, ফার্মাসিস্ট-নেতৃত্বাধীন এবং কঠোর মাননিয়ন্ত্রিত জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক সেই প্রশ্নের একটি শক্তিশালী উত্তর হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি ফার্মেসি শুধু ওষুধ বিক্রির স্থান থাকবে না।
এটি হয়ে উঠবে-জনগণের ওষুধ নিরাপত্তার জাতীয় অবকাঠামো, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার প্রতিরোধের শক্তিশালী হাতিয়ার, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনার সহায়ক ব্যবস্থা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত- “অর্থের অভাবে কোনো মানুষ যেন প্রয়োজনীয় ওষুধ থেকে বঞ্চিত না হন।”
রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত- “সঠিক ওষুধ—সঠিক মানে—সঠিক সময়ে—সাশ্রয়ী মূল্যে—সবার জন্য।” আর অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে জাতীয় বার্তা হওয়া উচিত- “অ্যান্টিবায়োটিক কোনো সাধারণ ওষুধ নয়—এর যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জাতীয় জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তার অংশ।” জাতীয় সরকারি ফার্মেসি নেটওয়ার্ক হোক বাংলাদেশের একটি নতুন, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস ( ডিএমসি) এমডি (কার্ডিওলজি ), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলীস্ট
বিভাগীয় প্রধান- কার্ডিওলজী , পপুলার মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল