বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চলমান সংকট: উত্তরণের বাস্তব পথ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের চলমান সংকট: উত্তরণের বাস্তব পথ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার, চুক্তির আর্থিক দায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সব সময় প্রয়োজনীয় সামঞ্জস্য তৈরি হয়নি। ফলে কখনো বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু জ্বালানি নেই; কখনো জ্বালানি আছে, কিন্তু উচ্চ ব্যয়ের কারণে উৎপাদন সীমিত; আবার কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না।

এ সংকট তাই কেবল উৎপাদন ঘাটতির সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্বালানি নিরাপত্তা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, চুক্তি ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য, নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষ জনবল এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া গেলে তুলনামূলকভাবে দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব। একই সঙ্গে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, সাশ্রয়ী ও স্থিতিশীল করার জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন।

১)প্রথম অগ্রাধিকার: বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করা
এই মুহূর্তে সবচেয়ে দ্রুত ফল দিতে পারে এমন পদক্ষেপ হলো ভারী জ্বালানি তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা। যেসব কেন্দ্র চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রাখে, কিন্তু জ্বালানি সংকটে উৎপাদন করতে পারছে না, সেগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

এ কাজটি সমন্বিতভাবে করার জন্য সরকারের একটি ছোট, দক্ষ ও ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ দল গঠন করা যেতে পারে। বিদ্যমান চুক্তির কাঠামোর মধ্যেই এই উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। দলের কাজ হবে—কোন কেন্দ্র কেন বন্ধ বা কম উৎপাদনে রয়েছে, জ্বালানি সংগ্রহে বাধা কোথায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায় কতটুকু এবং সরকারকে কোথায় হস্তক্ষেপ করতে হবে—তা দ্রুত নির্ধারণ করে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
বর্তমান সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের ক্ষেত্রে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।

২) জনস্বার্থবিরোধী চুক্তির পুনর্বিন্যাস
যেসব বিদ্যুৎ প্রকল্প জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কিংবা রাষ্ট্রের ওপর অস্বাভাবিক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে, সেসব প্রকল্পের চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরাসরি চুক্তি বাতিল করা অনেক ক্ষেত্রে আইনগত ও বাস্তবিকভাবে জটিল হতে পারে। তাই আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্ত পুনর্বিন্যাস, প্রয়োজনীয় সংশোধন অথবা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খুঁজতে হবে।
এখানে উদ্দেশ্য কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নয়; উদ্দেশ্য হবে রাষ্ট্রের অর্থের সুরক্ষা এবং জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করা। একটি চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হয়েছে বলেই তা রাষ্ট্রের জন্য অনুকূল না হলেও অনন্তকাল বহন করতে হবে—এমন ধারণা অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

৩)উপকূলের বাতাস: অব্যবহৃত শক্তির নতুন দুয়ার
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বায়ুশক্তির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পনাহীনভাবে যেখানে-সেখানে বায়ু টারবাইন বসালে চলবে না।
একটি বায়ু টারবাইনের পেছনে বাতাসের প্রবাহে যে পরিবর্তন সৃষ্টি হয়, তার কারণে পরবর্তী টারবাইনগুলোর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। তাই একই এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে অনেক টারবাইন বসালে বিদ্যমান বায়ুসম্পদের একটি অংশ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে বেসরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকারকে শুধু অনুমোদনদাতা হিসেবে নয়, পরিকল্পনাকারী হিসেবে ভূমিকা নিতে হবে। কোথায় প্রকল্প হবে, কোথায় বাতাসের গতি ও শক্তি পরিমাপ করা হবে এবং কীভাবে টারবাইনগুলো সাজানো হবে—এসব বিষয়ে সরকারি নেতৃত্ব প্রয়োজন।
পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সমুদ্রের ওপর বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৪)এক দেশের ওপর নির্ভরতা নয়, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাজার
বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে উৎসের বৈচিত্র্য আনাও জরুরি। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য অবশ্যই থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড-চীন সম্ভাব্য সংযোগপথসহ অন্যান্য আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সুযোগ খুঁজতে হবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং আসিয়ান বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সংযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে এখন থেকেই কৌশলগত চিন্তা করা প্রয়োজন।
আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে বৈচিত্র্য এলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন উৎস ও পথে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ভারত থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংযোগপথে বিদ্যুৎ আমদানি বাড়ানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নির্ভরশীলতা থাকবে না।

৫) মেয়াদ শেষ হওয়া কেন্দ্র: প্রয়োজন ও অর্থনীতিই হোক মাপকাঠি
মেয়াদ শেষ হওয়া ভারী জ্বালানি তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোন কেন্দ্র সত্যিই প্রয়োজনীয়, তার উৎপাদন ব্যয় কত, বিকল্প কী এবং বিদ্যুৎ কেনার সম্ভাব্য মূল্য কত—এসব অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
যেখানে যুক্তিসংগত মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব, সেখানে নতুন চুক্তি বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ চুক্তিতে একটি মৌলিক নীতি থাকা উচিত—বিদ্যুৎ নেই, অর্থও নেই। অর্থাৎ বিদ্যুৎ সরবরাহ না করলে কেবল সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য রাষ্ট্রকে অর্থ দিতে হবে না।

৬) সক্ষমতা আছে, ব্যবহার নেই—এই বৈপরীত্য দূর করতে হবে
বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাবদ অর্থ প্রদান করা হচ্ছে, অথচ কোনো কোনো কেন্দ্র তুলনামূলকভাবে কম ব্যবহার হচ্ছে—এটি অর্থনীতির জন্য একটি বড় প্রশ্ন।
কম ব্যবহৃত সক্ষমতা-ভিত্তিক অর্থপ্রদান করা কেন্দ্রগুলোর প্রতিটির আলাদা মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোথায় ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব, কোথায় জ্বালানি বা সঞ্চালন অবকাঠামো বাধা হয়ে আছে এবং কোথায় কেন্দ্রের অবস্থানই অকার্যকর—তা চিহ্নিত করতে হবে।
প্রয়োজন হলে অধিক কার্যকর স্থানে কিছু কেন্দ্র স্থানান্তরের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল স্থাপিত থাকলেই তার মূল্য সৃষ্টি হয় না; তার কার্যকর ব্যবহারই প্রকৃত মূল্য সৃষ্টি করে।

৭) জ্বালানি কেনায় সরাসরি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা
ভারী জ্বালানি তেল আমদানির বর্তমান ব্যবস্থার পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের অপ্রয়োজনীয় সম্পৃক্ততা কমিয়ে আন্তর্জাতিক তাৎক্ষণিক বাজার থেকে সরাসরি জ্বালানি কেনার একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি কেনার সুযোগ তৈরি হবে, তখন দ্রুত সেই সুযোগ কাজে লাগানোর মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে দ্রুততা যেন কোনোভাবেই অস্বচ্ছতার অজুহাত না হয়। প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেই সরাসরি ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

৮) একই জ্বালানিতে বিদ্যুৎ ও তাপ: শিল্পে সহ-উৎপাদন
শিল্প খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানোর একটি কার্যকর পথ হলো সহ-উৎপাদন প্রযুক্তি। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বের হওয়া ব্যবহারযোগ্য বাষ্প শিল্পকারখানায় কাজে লাগানো গেলে একই জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ ও তাপ—দুই ধরনের শক্তি পাওয়া সম্ভব।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের অব্যবহৃত বা অতিরিক্ত তাপকে কাজে লাগিয়ে শিল্প উৎপাদনের জ্বালানি ব্যয় কমানো এবং সামগ্রিক শক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তাই শিল্পাঞ্চলগুলোর পরিকল্পনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার পারস্পরিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে।

৯) বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ: দক্ষ মানুষ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অবকাঠামো যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। শুধু সাধারণ প্রশিক্ষণ দিয়ে এই খাতের ভবিষ্যৎ দক্ষতা নিশ্চিত করা যাবে না।
বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, সঞ্চালন, নবায়নযোগ্য শক্তি, বিদ্যুৎ বাজার, চুক্তি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প মূল্যায়ন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং দুর্যোগকালীন পুনরুদ্ধারের মতো ক্ষেত্রে বিশেষায়িত জনবল তৈরি করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এমন একটি দক্ষ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে না; বরং ভবিষ্যতের পরিবর্তিত জ্বালানি ব্যবস্থার নেতৃত্বও দিতে পারবে।

১০) দুর্যোগে বিদ্যুৎব্যবস্থা যেন থেমে না যায়
বিদ্যুৎ ব্যবস্থার স্থায়িত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি। মহামারি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প কিংবা বড় ধরনের কারিগরি বিপর্যয়ের সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতি ও জনজীবনে তার বহুগুণ প্রভাব পড়ে।
তাই জরুরি খুচরা যন্ত্রাংশ, নিজস্ব কারিগরি কর্মশালা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালুর সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট পুনরুদ্ধার পদ্ধতি আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে।
কোন এলাকায় কীভাবে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে তা পুনরুদ্ধার করা হবে, কোন কেন্দ্র আগে চালু হবে, কোথায় জরুরি সরঞ্জাম থাকবে এবং কার দায়িত্ব কী—এসব বিষয়ে পূর্বনির্ধারিত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
সংকটের সময় বিদেশি যন্ত্রাংশ বা সহায়তার জন্য অপেক্ষা না করে যতটা সম্ভব নিজস্ব সক্ষমতায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রস্তুতিই একটি শক্তিশালী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিচয়।

শেষ কথা
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটকে শুধু ‘বিদ্যুৎ কম’ বলে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। কোথাও জ্বালানি ঘাটতি, কোথাও অদক্ষতা, কোথাও অতিরিক্ত আর্থিক দায়, কোথাও চুক্তির অসামঞ্জস্য, কোথাও একক উৎসের ওপর নির্ভরতা, আবার কোথাও বিদ্যমান সক্ষমতার অপব্যবহার—সব মিলিয়েই আজকের সংকট তৈরি হয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক।
প্রথমে বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি নিশ্চিত করে দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে হবে। এরপর অপ্রয়োজনীয় আর্থিক দায় কমাতে হবে, মেয়াদোত্তীর্ণ চুক্তি নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পর্যালোচনা করতে হবে, বিদ্যুৎ আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে, উপকূলের বায়ুশক্তিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে এবং ভবিষ্যতে সমুদ্রভিত্তিক বায়ু বিদ্যুতের দিকে এগোতে হবে। পাশাপাশি শিল্পে সহ-উৎপাদন, দক্ষ জনবল এবং দুর্যোগকালীন স্বনির্ভর পুনরুদ্ধার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, বিদ্যুৎ খাতকে আর শুধু ‘কত মেগাওয়াট উৎপাদন হলো’—এই একটি সংখ্যায় বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে কত কম খরচে, কত নির্ভরযোগ্যভাবে এবং কতটা টেকসইভাবে জনগণ ও অর্থনীতিকে বিদ্যুৎ দেওয়া যাচ্ছে।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা—যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকবে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় সক্ষমতার বোঝা থাকবে না; জ্বালানি থাকবে, কিন্তু একক উৎসের ওপর নির্ভরতা থাকবে না; বিদ্যুৎ আমদানি থাকবে, কিন্তু এক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা থাকবে না; বেসরকারি বিনিয়োগ থাকবে, কিন্তু জনস্বার্থের বিনিময়ে নয়; আর দুর্যোগ এলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না, বরং দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।
কারণ বিদ্যুৎ এখন আর কেবল একটি সেবা নয়। এটি বাংলাদেশের শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রাণপ্রবাহ। সেই প্রাণপ্রবাহকে নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হলে আজকের সংকটকে সাময়িকভাবে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি আগামী দিনের জন্য একটি সুস্থ, সাশ্রয়ী ও স্বনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ভিতও এখনই গড়ে তুলতে হবে।

লেখক: সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব, বিশ্লেষক