মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্টের আওতায় আজ সোমবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল অ্যান্ড ডিফেন্স কমিটির উদ্বোধনী মিটিং শুরু হচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোববার এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এর আগে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের শীর্ষ কর্মকর্তারা আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে প্রথম এই মিটিংয়ে বসছেন।
এ মিটিংয়ে পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করবেন উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ও সেনা প্রধান চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। উল্লেখ্য, এই চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেয়া নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্ক ইতিবাচক বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। রোববার বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানান তিনি।
রয়টার্সের খবরে আরও বলা হয় সোমবার মক্কা চুক্তির পর প্রথম বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন তুরস্ক ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ কর্মকর্তারা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও চিফ অব জেনারেল স্টাফ। এর আগে গত ৭ই আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের তিন মিত্র পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান স্বাক্ষর করেন মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট। এই চুক্তিকে সংক্ষেপে মক্কা প্যাক্ট বলেও অভিহিত করা হয়। এতে বলা হয়েছে, চুক্তিতে স্বাক্ষর করা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনকে সবার ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর প্রেক্ষিতে দেশ তিনটির মধ্যে সম্মিলিত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। বিষয়টি ন্যাটোর আর্টিক্যাল ৫-এর মতো।
সোমবারের বৈঠকের এজেন্ডায় থাকবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনায় আসবে। দেশ তিনটির সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বৃহত্তর যোগাযোগ নিশ্চিত করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। এর মধ্যে থাকবে প্রতিরক্ষা বিষয়ক যৌথ উৎপাদন ও উন্নয়ন। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে। এ যুদ্ধ পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এতে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশও জড়িয়ে পড়েছে এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
ইরান মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এমন কয়েকটি আঞ্চলিক দেশের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি তেহরান সতর্ক করে বলেছে, ওয়াশিংটন যাতে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে কোনো দেশের ভূখণ্ড বা স্থাপনা ব্যবহার করতে না পারে, সেদিকে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার ছয় মাস পরও আলোচনা অচলাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে। ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির দেশ তুরস্ক জানিয়েছে, পরমাণু অস্ত্রধর পাকিস্তান ও বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের সঙ্গে করা প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে মিশরের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে এই চুক্তির উদ্দেশ্য বিদ্যমান কোনো জোট বা মিত্রতাকে প্রতিস্থাপন করা নয় বলে জানিয়েছে তুরস্ক।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিশর আঞ্চলিক বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় একটি জোট গঠন করেছে। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ। তুরস্ক জানিয়েছে, ‘আর-৪’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য হলো কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পারস্পরিক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর আগে বলেছিলেন, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং সব ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের অংশগ্রহণের জন্য এটি উন্মুক্ত। এক্সে দেয়া এক পোস্টে এরদোগান বলেন, সম্মিলিত প্রতিরোধের ওপর ভিত্তি করে করা এই চুক্তি আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এগিয়ে নিতে, প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ প্রকল্প গড়ে তুলতে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবদান রাখবে।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত আত্মরক্ষার অধিকারকে পুনর্ব্যক্ত করা এই চুক্তি কোনো দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। এটি আমাদের অঞ্চলের শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে কাজ করতে আগ্রহী সব ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত।
