সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে ফের আলোচনা হয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে মাগরিবের বিরতির পরে সংসদীয় কমিটি পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হয়। এসময় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, মাননীয় স্পিকার কমিটি গঠন কার্যক্রমের আগে বিরোধী দলীয় উপনেতাকে কিছু বলার সুযোগ দিন, উনারা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশ্রহণের লক্ষ্যে কমিটির সদস্যদের নাম দিতে সম্মত হয়েছেন। এরপরই বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে মাইক দেয়া হয়। এসময় তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্য থেকে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত কমিটিতে নাম দেয়ার বিষয়ে সম্মতির কথা বলিনি। এরপরে ফ্লোর নিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন আপনারা সবই জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে চাইবেন, অথচ সনদ বাস্তবায়নের জন্য সহযোগিতায় আসবেন না। দুইটা বিপরীতমুখী হয়ে যায়।
বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সংসদে আমাদের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী আমরা ২৬ শতাংশ স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য পদ পাচ্ছি। একইভাবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, কমিটিগুলোর সভাপতিরও ২৬ শতাংশ বিরোধী দল থেকে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো মন্ত্রণালয়ের কমিটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হয়নি।
চিফ হুইপের সঙ্গে ফোনালাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি স্পষ্ট করেন, সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আমরা যাব এবং সেই হিসেবে আপনি আমাদের সভাপতি দেবেন, এমন কথা আমরা কখনোই বলিনি। আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, আমরা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে অংশগ্রহণ করব না। একটি কমিটিতে জয়েন করানোর জন্য শর্ত আরোপ করে জোর জবরদস্তি করার ট্র্যাডিশন আমরা সঠিক মনে করি না।
অতীত সংসদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তাহের বলেন, অতীতে তো স্পিকারকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী সাহেবকে হত্যা করা হয়েছে, জুতা ছোড়াছুড়ি হয়েছে। আমরা সেই কালো ইতিহাসে ফিরে যেতে চাই না। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এটা জনগণের সংসদ, তাই বৈষম্যবিরোধী এই সংসদে আমরা আমাদের অধিকার চাই।
চিফ হুইপ জানান, বিরোধী দলের উপনেতার সঙ্গে ফোনালাপের ভিত্তিতে তিনি আশা করেছিলেন বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকবে।
চিফ হুইপ বলেন, বিগত ৫৪-৫৫ বছরে বিরোধী দল থেকে কোনো কমিটির (পাবলিক অ্যাকাউন্টস বাদে) সভাপতি করার রেওয়াজ নেই। তারপরও আমরা আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে ১০টি কমিটির সভাপতি পদ দিতে রাজি আছি। কিন্তু আমাদের কথা ছিল, সংবিধান সংশোধন করেই আমরা ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন করব। উনারা যদি সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নেন, তবে আমরা পদ দিতে রাজি আছি। আমরা কোনো কিছু আটকে রাখতে চাই না।
সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সেজন্য আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি আন্ডার রুলস ২২৬ আমরা গঠন করেছি। পাঁচজন সদস্যের জায়গা রাখা হয়েছে বিরোধী দলের জন্য।’
তিনি বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বশীল অন্যান্য রাজনৈতিক দল, স্বতন্ত্র সদস্যসহ বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিত্বও কমিটিতে রাখা হয়েছে। বিরোধী দল নীতিগতভাবে কমিটিতে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হতেই পারে। যদি সংবিধান সংশোধিত না হয়, জুলাই জাতীয় সনদ তো বাস্তবায়িত হলো না। হওয়ার পরে হবে। আমরা কাজ শুরু করেছি, সেই কমিটি গঠিত হয়েছে।’
তিনি জানান, তার সভাপতিত্বে কমিটির একটি বৈঠক ইতোমধ্যে হয়েছে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে কমিটি প্রতিবেদন তৈরি করবে।
তিনি বলেন, ‘এভাবে আমরা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলব। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা রিপোর্টটা প্রণয়ন করব।’
পরে আইন মন্ত্রণালয় ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদকে সামনে রেখে, জুলাই জাতীয় সনদের বাইরেও সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আমাদের নির্বাচন ইশতেহার অনুযায়ী এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী আর যাদের সঙ্গে আমরা কথা বলব, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সবকিছু ধারণ করে আমরা একটা সমৃদ্ধ সংবিধান সংশোধনী বিল আনবো।’
বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যা বক্তব্য আছে, আমরা সেটা লিপিবদ্ধ করব। আপনাদের সমস্ত রিপোর্ট, বক্তব্য সেই রিপোর্টে থাকবে। আপনাদের বক্তব্য জাতি জানবে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের সকল দাবি মানতে হবে, তারপরও আমরা আপনাদের এই সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসবো না, এটা সহযোগিতা হলো না। আপনারা সংবিধান সংশোধনী কমিটিতে আসুন। আপনাদের যখনই অংশগ্রহণ করবেন, আমরা স্বাগত জানাব। তখন জুলাই জাতীয় সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে। তার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান বিধান অনুসারে আমরা যাই।
