সৌরবিদ্যুৎ: জ্বালানি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে সমস্যার সমাধান করা কঠিন। দেশীয় গ্যাসের ঘাটতি, আমদানিনির্ভর এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা- সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বিকল্প পথ খোঁজা এখন আর পছন্দের বিষয় নয়, প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে আগামী এক বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৪,০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত উৎপাদনের পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে, তা সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ৫,৫০০ মেগাওয়াটে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু তার আগেই এক বছরের মধ্যে ৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য নির্ধারণ প্রমাণ করে, সরকার এই খাতে দ্রুত এগোতে চাইছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সম্ভবত উৎপাদনের পরিমাণ নয়, বরং ব্যবসায়িক মডেল। সরকার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাজার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ সরকারকে প্রতিটি প্রকল্পে নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে না; বেসরকারি কোম্পানি অর্থায়ন করবে, সোলার প্যানেল বসাবে, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। ভবন বা কারখানার মালিক সেই বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন এবং কোনো কোনো মডেলে ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে আয়ও করতে পারবেন।
এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশে অসংখ্য কারখানা, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস এবং আবাসিক ভবনের ছাদ কার্যত অব্যবহৃত পড়ে আছে। নতুন সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে এই ছাদগুলোই যদি ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে একই সঙ্গে ভূমির সংকট ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমস্যার একটি অংশ মোকাবিলা করা সম্ভব।
শিল্প খাত হতে পারে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী
এই উদ্যোগের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুফল পেতে পারে দেশের শিল্প খাত। গ্যাসের সংকটে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। অন্যদিকে, গ্রিডের বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়েও শিল্পমালিকদের উদ্বেগ রয়েছে।
বড় কারখানার বিশাল ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে দিনের বেলায় তাদের বিদ্যুতের চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সেখান থেকেই মেটানো সম্ভব। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সিরামিকসহ দিনের বেলায় বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী শিল্পের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ।
আর এখানেই ওপেক্স মডেলের সুবিধা। একটি কারখানাকে শুরুতেই কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সোলার প্যানেল কিনতে হবে না। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজ খরচে ব্যবস্থা স্থাপন করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিনিয়োগ তুলে নেবে। ফলে শিল্পমালিকের মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
এর আরও একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ববাজারে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প যদি নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, তাহলে ইউরোপ ও অন্যান্য বড় বাজারে দেশের পণ্যের পরিবেশগত গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ ছাদের সোলার শুধু বিদ্যুতের বিষয় নয়; ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতারও অংশ হয়ে উঠতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ
বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থনীতির বড় দুর্বলতা আমদানিনির্ভরতা। এলএনজি, তেল এবং অন্যান্য জ্বালানি আমদানিতে প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে সেই চাপ সরাসরি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর এসে পড়ে।
৪,০০০ মেগাওয়াট সৌর সক্ষমতা মানেই অবশ্য সারাক্ষণ ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া নয়। সূর্যের আলো, আবহাওয়া ও ব্যবস্থার দক্ষতার কারণে প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় কম হবে। তারপরও এত বড় পরিমাণ সৌর সক্ষমতা যুক্ত হলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এতে গ্যাস, এলএনজি ও তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অংশ প্রতিস্থাপিত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ জ্বালানি আমদানির প্রয়োজন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগ। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
সূর্যের আলোর ক্ষেত্রে সেই ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নেই। এর জন্য কোনো হরমুজ প্রণালী, এলএনজি টার্মিনাল কিংবা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
ছাদ হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক সম্পদ:
সরকারের প্রস্তাবিত তৃতীয় মডেলটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এতে ভবনমালিক উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার করবেন, উদ্বৃত্ত অংশ গ্রিডে যাবে এবং ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে তিনি ভাড়াও পেতে পারেন।
অর্থাৎ এতদিন যে ছাদের সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না, সেটিই আয় সৃষ্টিকারী সম্পদে পরিণত হতে পারে।
এই ধারণা শহর থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত করা গেলে নতুন ধরনের একটি সৌর অর্থনীতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সার্ভিস প্রোভাইডার হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকাকেন্দ্রিক কয়েকটি বড় কোম্পানির মধ্যে বাজার সীমাবদ্ধ থাকবে না।
স্টার্ট-আপ ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অতিরিক্ত পয়েন্ট এবং নারী মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থাও ইতিবাচক। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুধু প্যানেল বসানোর ব্যবসা নয়। এর সঙ্গে প্রকৌশলী, ইলেকট্রিশিয়ান, ডিজাইনার, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী, বিক্রয়কর্মী, সফটওয়্যার ও মনিটরিং সেবা, অর্থায়ন এবং সরঞ্জাম সরবরাহের দীর্ঘ একটি অর্থনৈতিক শৃঙ্খল তৈরি হবে।
৪,০০০ মেগাওয়াটের বাজার সত্যিই সৃষ্টি হলে দেশে হাজার হাজার দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়াও স্বাভাবিক।
কৃষিতেও রয়েছে বড় সম্ভাবনা:
এই পরিকল্পনাকে শুধু শহরের ছাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। সরকার সৌরচালিত সেচ, হিমাগার, ইভি চার্জিং স্টেশন, ভাসমান সৌর প্রকল্পসহ অন্যান্য প্রযুক্তিকেও এর সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে সেচ এবং ফসল সংরক্ষণের ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার বিস্তার ডিজেল ও গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে। একইভাবে গ্রামাঞ্চলে ছোট ও মাঝারি সৌরচালিত হিমাগার গড়ে উঠলে কৃষককে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হবে না। ফল, সবজি, মাছ, দুধসহ দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য সংরক্ষণের সুযোগ বাড়বে।
অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি সঠিকভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর সুফল বিদ্যুৎ খাত ছাড়িয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পৌঁছাতে পারে।
বেসরকারি খাত তাই যৌক্তিকভাবেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে- কম খরচে দ্রুত ঋণ, প্রকল্পের ব্যাংকযোগ্যতা, উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের আকর্ষণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি ট্যারিফ, নেট মিটারিংয়ের ওয়ান-স্টপ অনুমোদন এবং আমদানি করা যন্ত্রপাতির যৌক্তিক শুল্ক।
এসব সমস্যার সমাধান না করে শুধু লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করলে ৪,০০০ মেগাওয়াট কাগজেই থেকে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- তা হলো মান নিয়ন্ত্রণ। দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের প্রতিযোগিতায় নিম্নমানের প্যানেল, ইনভার্টার কিংবা দুর্বল বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করা হলে কয়েক বছরের মধ্যে বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। ছাদের কাঠামোগত সক্ষমতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাও কঠোরভাবে যাচাই করতে হবে।
সার্ভিস প্রোভাইডার নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাই রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি কিংবা কাগুজে কোম্পানির প্রবেশ ঠেকাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
লক্ষ্য শুধু মেগাওয়াট নয়:
বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে দীর্ঘদিন বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র, বড় প্রকল্প এবং বড় বিনিয়োগই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের নতুন পরিকল্পনা সেই চিন্তায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করছে- বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিকেন্দ্রীকরণ করা।
হাজার হাজার কারখানা, অফিস, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, বিপণিবিতান এবং বাড়ির ছাদ যদি বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে, তাহলে গ্রাহক শুধু বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী থাকবেন না; অনেকেই উৎপাদকও হয়ে উঠবেন।
সরকারের ৪,০০০ মেগাওয়াটের লক্ষ্য তাই কেবল একটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি সফল হলে জ্বালানি আমদানির চাপ কমানো, শিল্পের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার নতুন পথ খুলতে পারে।
তবে সাফল্যের শর্ত একটাই- ঘোষণার গতির সঙ্গে বাস্তবায়নের গতির মিল থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীকে লাভের নিশ্চয়তা, গ্রাহককে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ, ব্যাংককে ঋণ ফেরতের আস্থা এবং রাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ- এই চার পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
এগুলো করা গেলে বাংলাদেশের হাজার হাজার অব্যবহৃত ছাদ আর নিছক ছাদ থাকবে না। সেগুলো হয়ে উঠতে পারে দেশের নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র- আর সূর্যের আলো হয়ে উঠতে পারে আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক