সিডনি ম্যারাথনে রেকর্ড ভেঙে ইথিওপিয়ান গোবনার বাজিমাত

সিডনি ম্যারাথনে রেকর্ড ভেঙে ইথিওপিয়ান গোবনার বাজিমাত

ফন্ট সাইজ:

সিডনির পথে তখন শেষ লড়াই। সামনে আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার। সাতজনের জমাট লড়াইয়ে বোঝার উপায় নেই—কার হাতে উঠবে শিরোপা। শেষ পর্যন্ত গতি বাড়িয়ে ৪০ হাজার দৌড়বিদকে পেছনে ফেললেন ইথিওপিয়ার ২১ বছর বয়সী আদ্দিসু গোবনা। শুধু শিরোপাই নয়, সিডনি ম্যারাথনের কোর্স রেকর্ডও নিজের করে নিলেন তিনি। আর নারীদের বিভাগে শুরু থেকেই দাপট দেখিয়ে সোনার পদক গলায় তুললেন কেনিয়ার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পেরেস জেপচিরচির।
রবিবার ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে নর্থ সিডনি থেকে শুরু হয় ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটারের এই দৌড়। মনোরম পথ পেরিয়ে দৌড়বিদদের গন্তব্য ছিল সিডনি অপেরা হাউস। এবারের ম্যারাথন ২০২৬ আসরে অংশ নেন রেকর্ড ৪০ হাজার প্রতিযোগী। সাধারণ দৌড়বিদদের পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ম্যারাথন তারকারাও অংশ নেন এই প্রতিযোগিতায়। এবার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো সিডনি ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হচ্ছে অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরস-এর মর্যাদা নিয়ে। ফলে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ম্যারাথন সিরিজের অংশ হিসেবে প্রতিযোগিতাটির গুরুত্বও বেড়েছে। পুরুষ বিভাগে শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে ছিলেন গোবনা। ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে তিনি শুধু শিরোপাই জেতেননি, গড়েছেন নতুন কোর্স রেকর্ডও। ২০২৫ সালের বিজয়ী হাইলেমারিয়াম কিরোসের ২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৬ সেকেন্ডের রেকর্ডের চেয়ে গোবনার সময় প্রায় দেড় মিনিট দ্রুত। গত বছর সিডনি ম্যারাথনে দ্বিতীয় হয়েছিলেন গোবনা। এবার ফিরেই কাঙ্ক্ষিত শিরোপা জয়ের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো পুরুষ অ্যাথলেটের করা দ্রুততম ম্যারাথনের নজির গড়েছেন তিনি।
পুরুষ বিভাগে রৌপ্য জিতেছেন চিমদেসা দেবেলে গুদেতা। তৃতীয় হয়েছেন তেবেনো রামাকোঙ্গোয়ানা। দুজনই আগের কোর্স রেকর্ডের চেয়ে কম সময়ে দৌড় শেষ করেছেন।
নারীদের বিভাগেও ছিল তারকাখচিত লড়াই। ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে শিরোপা জিতেছেন কেনিয়ার পেরেস জেপচিরচির। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জেপচিরচির দ্বিতীয় হওয়া ইরিন চেপতাইকে ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে পেছনে ফেলেন। তৃতীয় হয়েছেন শুর ডিমাইজ ওয়্যার। তবে জেপচিরচিরের জয়ের দিনেও অক্ষত থাকেনি কোর্স রেকর্ড। গত বছর সিফান হাসানের করা ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ২২ সেকেন্ডের রেকর্ডের চেয়ে ৯ সেকেন্ড পিছিয়ে দৌড় শেষ করেন জেপচিরচির।

হুইলচেয়ারে নতুন দুই রেকর্ড
মূল ম্যারাথনের আগেই ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করেন হুইলচেয়ার ম্যারাথনাররা। পুরুষ বিভাগে যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিয়েল রোমানচুক ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে নতুন কোর্স রেকর্ড গড়েন। গত বছর মার্সেল হাগের করা ১ ঘণ্টা ২৭ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের রেকর্ড ভাঙেন তিনি।
নারীদের বিভাগে প্যারালিম্পিক অ্যাথলেট ম্যানুয়েলা শারও গড়েছেন নতুন রেকর্ড। ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ৪ সেকেন্ডে ম্যারাথন শেষ করেন তিনি। আগের রেকর্ডধারী সুজান্না স্কারোনির ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের সময়ের চেয়ে ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড দ্রুত ছিলেন শার। এই জয়ের মধ্য দিয়ে অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের আটটি কোর্সেই জয় পাওয়া প্রথম অ্যাথলেট হওয়ার কীর্তি গড়েছেন তিনি।

সবার আগে অস্ট্রেলিয়ান বুকানন
সিডনি ম্যারাথনে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সবার আগে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেন অ্যান্ডি বুকানন। তাঁর সময় ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। নারীদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ফিনিশার ছিলেন এলি প্যাশলি। তিনি সময় নেন ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ২৮ সেকেন্ড।

কেমোথেরাপির মধ্যেও ফুলারের অনন্য লড়াই
সিডনি ম্যারাথনে সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পগুলোর একটি লিখেছেন ফাইভ ডকের টবি ফুলার। ২৩ বছর বয়সে রক্তের ক্যান্সার মাল্টিপল মায়েলোমায় আক্রান্ত হন তিনি। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই ম্যারাথনে অংশ নিয়ে ৩ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে দৌড় শেষ করেন ফুলার। তাঁর এই কীর্তি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস স্বীকৃতি পেয়েছে—দ্রুততম সময়ে কেমোথেরাপি নেওয়া অবস্থায় ম্যারাথন সম্পন্ন করা রোগী হিসেবে। ফিনিশ লাইনে পৌঁছে আবেগাপ্লুত ফুলার বলেন, আমি দারুণ খুশি। তবে তাঁর কাছে এই দৌড় মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিটি কিলোমিটারই ছিল কঠিন। তবু শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাই তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন। দৌড় শেষে প্রিয়জনদের সঙ্গে কারি খেয়ে সাফল্য উদযাপনের পরিকল্পনা ছিল ফুলারের।

এদিকে শুধু প্রতিযোগিতাই নয়, মানবিকতার দিক থেকেও এবারের সিডনি ম্যারাথন ছিল উল্লেখযোগ্য। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সিডনি ম্যারাথনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত দাতব্য কর্মকাণ্ডে ৩৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার জন্য তহবিল সংগ্রহের এই উদ্যোগ ম্যারাথনটির সামাজিক গুরুত্বও বাড়িয়েছে। ফলে সিডনি ম্যারাথন এখন শুধু দৌড়ের প্রতিযোগিতা নয়, মানবিকতারও এক বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।