আইন, সংবিধান ও জনগণ: রাষ্ট্রতত্ত্বে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা

আইন, সংবিধান ও জনগণ: রাষ্ট্রতত্ত্বে তাদের অবস্থান ও মর্যাদা

ফন্ট সাইজ:

আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য অবশ্যই আইনের দরকার। আইন ছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। বৃটিশ লেখক ও মহুমাত্রিক বুদ্ধিজীবী স্যামুয়েল জনসনের ভাষায় “Society cannot exist without law” (অর্থাৎ “আইন ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না”)। আইন ছাড়া রাষ্ট্র নির্মাণ হবে অনেকটা তাসের ঘর নির্মাণের মতো। যুক্তরাষ্ট্রের ৩৪তম প্রেসিডেন্ট Dwight D. Eisenhower- এর মতে “Law is the firewall that separates civilization from the wild” (অর্থাৎ “আইন হলো সেই সুরক্ষা-প্রাচীর যা সভ্যতাকে বন্যতা থেকে পৃথক করে”)। যেখানে আইন নাই, সেখানেই শুরু হয় উশৃঙ্খলতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, উৎপীড়ন ও স্বেচ্ছাচারিতা। দার্শনিক জন লক- এর ভাষায় “Where law ends, tyranny begins” (অর্থাৎ “যেখানে আইনের সমাপ্তি, সেখানে স্বেচ্ছাচারিতার হয় সূচনা”)।
প্রাগ-ঐতিহাসিক যুগে সমাজে আইনের অস্তিত্ব ছিল না। “Might is right” তথা “জোর যার মুলুক তার” এটাই ছিলো ওই সমাজের মূলমন্ত্র। ওই সমাজ থেকে জণগণের অভিপ্রায়ে ধীরে ধীরে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে আমরা আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণায় আসি। দার্শনিক অ্যারিস্টটলের ভাষায় “A nation is formed by a willingness to live under one common law” (অর্থাৎ “একটি সাধারণ আইনের অধীনে বসবাসের ইচ্ছার মাধ্যমেই একটি জাতি গঠিত হয়”)। সভ্যতা বিনির্মাণে আইনের গুরুত্ব অপরিসীম। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রধান বিচারপতি Earl Warren এর মতে “Without law, civilization is a house built on sand” (অর্থাৎ “আইন ছাড়া সভ্যতা হলো বালির ওপর নির্মিত একটি বাড়ি”)।
আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রে আইনের পাশাপাশি বেশ কিছু সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও আচার থাকে। এগুলোকে জনগণ খুব গুরুত্ব দেয় ও পালন করে। সমাজ ও রাষ্ট্রভেদে এসব সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও আচার ভিন্ন হয়। এগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনগণের মন-মননের সাথে সম্পর্কিত — যার শত শত বছর এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। সামাজিকভাবে এসব প্রথা, রীতিনীতি ও আচার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো রাষ্ট্রের আইনের মর্যাদা পায় না। এগুলো ভাঙলে বা পালন না করলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো সেংশন নেই, নেই কোন ধরনের শাস্তির বিধান। তাই এসব সামাজিক প্রথা, রীতিনীতি ও আচারের সাথে আইনের তুলনা করলে আইনের মর্যাদা ও অবস্থান হবে এগুলোর ঊর্ধ্বে।
আবার রাষ্ট্রে আইনের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে, আছে ভিন্নতা। সব আইনের মান ও মর্যাদা এক বা সমান নয়। সরকারের বিভিন্ন দপ্তর বা অধিদপ্তর অথবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত ক্ষমতা (delegated power) বলে বিভিন্ন ধরনের উপবিধি (by-laws), নিয়মকানুন (rules and regulations), বিধি, বিধান ও নিয়ম চালু বা প্রচলন হয়। এগুলো রাষ্ট্রের কার্যকর আইন। এগুলোর মর্যাদা ও অবস্থান সমাজের প্রথা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি, আচার ও আচরণের ঊর্ধ্বে। তবে delegated power- এর আওতায় করা বিধিবিধানের চেয়ে জাতীয় সংসদ যে সরাসরি আইন প্রণয়ন করে (Acts of Parliament - Statute) সেগুলোর অবস্থান ও মর্যাদা উপরে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বৃটেনে লিখিত সংবিধান নেই। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রথা, রীতিনীতি, আচার ও কনভেনশন বৃটেনের অলিখিত সংবিধানের অন্যতম প্রধান উৎস। একইভাবে বৃটিশ পার্লামেন্টে পাস করা আইনও (Statutes) সংবিধানের অন্যতম উৎস। তাই বৃটিশ পার্লামেন্টে পাস করা আইন ও রাষ্ট্রের আচারিত রীতিনীতি ও কনভেনশনের আলাদা গুরুত্ব আছে। এগুলো সাংবিধানিক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তবে বাংলাদেশে লিখিত সংবিধান থাকার কারণে পুরো চিত্র, মর্যাদা ও অবস্থা ভিন্ন ও আলাদা। বাংলাদেশে সংসদে পাস করা সাধারণ আইন কখনো সাংবিধানিক মর্যাদা পায় না। একইভাবে সমাজে আচারিত প্রথা, রীতিনীতি ও আচরণ আইনের মর্যাদা পায় না বা দেয়া হয় না।
সংবিধান হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন, কেননা এই সংবিধান হলো জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি। রাষ্ট্রের সব ধরনের আইনের ঊর্ধ্বে সংবিধানের অবস্থান। রাষ্ট্র সংবিধান পরিপন্থী কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবে না। রাষ্ট্রের কোনো আইন সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্য হলে যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হবে। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলেছে “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”। সংবিধানের প্রাধান্যকে (Supremacy of the Constitution) বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বহুল প্রচারিত অষ্টম সংশোধনী মামলায় “সংবিধানের অন্যতম মৌলিক কাঠামো” (Basic Structures of the Constitution) হিসেবে ঘোষণা করেছে।

আবার সংবিধান প্রজাতন্ত্রের যতই সর্বোচ্চ আইন হোক না কেন সংবিধানের উপরে হচ্ছে জনগণের অবস্থান। জনগণ রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ও প্রধান উপাদান। রাষ্ট্র গঠনের অপর তিনটি উপাদান তথা ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব থাকলেও জনগণ না থাকলে রাষ্ট্র গঠন হবে না বা যাবে না। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট করে বলেছে, “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ”। Anwar Hossain Chowdhury V Bangladesh 41 DLR (AD) 165 মামলায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, “The Constitution remains at the apex because it is the supreme law. It remains sui generis only so long as it is accepted by the people” (অর্থাৎ “সংবিধান সর্বোচ্চ আইন হিসেবে শীর্ষস্থানে অধিষ্ঠিত থাকে। তবে এটি কেবল ততক্ষণই তার অনন্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য (sui generis) বজায় রাখে, যতক্ষণ জনগণ একে মেনে নেয়”)।

জনগণ তাদের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে চারটি পন্থায়: সাধারণ নির্বাচনে ভোট, গণভোট, গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব। সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের মাধ্যমে জনগণ সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করে। এর মাধ্যমে সাধারণত একটি নতুন সরকার গঠিত হয়। যেমন: ১৯৯১ এর সাধারণ নির্বাচন, ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচন ইত্যাদি। পক্ষান্তরে, গণভোট হলো এমন একটি সরাসরি ভোটদান প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে দেশের জণগণ কোনো নির্দিষ্ট আইন, নীতি বা সাংবিধানিক প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে তাদের মতামত প্রকাশ করেন। গণভোটের কিছু উদাহরণ: ১৯৭৭ সালের শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গণভোট, ১৯৮৫ সালের প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গণভোট এবং ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার আমলে সরকার পদ্ধতির (রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি থেকে সংসদীয় প্রদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন) ব্যাপারে গণভোট।

গণঅভ্যুত্থান হলো সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও গণজোয়ারে গড়ে ওঠা আন্দোলন যা মূলত কোনো শাসক বা সরকারের পতন ঘটায়। গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে জনতার ঢল ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। সহজ কথায় গণঅভ্যুত্থান হলো ক্ষমতা বদলের বিস্ফোরণ। গণঅভ্যূত্থান সম্পর্কে মিশরীয় প্রো-ডেমোক্রেসি মুভমেন্টের নেতা Wael Ghonim বলেন “The power of the people is much stronger than the people in power” (অর্থাৎ “ক্ষমতাসীনদের চেয়ে জনগণের শক্তি অনেক বেশি শক্তিশালী”)। ইতিহাসের পাতায় কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণ: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান যার ফলে আইয়ুব খানের পতন ঘটে এবং অল্পদিনের মধ্যে নতুন দেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে, ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান যার ফলে এরশাদের এক দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে, আরব বসন্ত (২০১০-২০১১) যার ফলে তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে, ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান যার ফলে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
অপরদিকে, বিপ্লব হলো সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোগত ও মৌলিক পরিবর্তন যা শুধু সরকার বা শাসক বদলায় না বরং পুরো সিস্টেম বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বদলে দেয়। আর বিপ্লবে দীর্ঘ মেয়াদী আদর্শ, পরিকল্পনা ও কাঠামোগত রুপান্তর ঘটে। মার্কিন দার্শনিক Grace Lee Boggs - এর মতে “Revolution is about the need to evolve, not just a desire to protest” (অর্থাৎ “বিপ্লব মানে বিবর্তিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা, কেবল প্রতিবাদ করার আকাঙ্ক্ষা নয়”)। কিউবার বিপ্লবের নায়ক চে গেভারার ভাষায় “The revolution is not an apple that falls when it is ripe. You have to make it fall” (অর্থাৎ “বিপ্লব এমন কোনো আপেল নয় যা পেকে গেলেই নিজে থেকে নিচে পড়ে যায়; একে নিচে নামিয়ে আনতে হয়”)। ইতিহাসে বিপ্লবের কয়েকটি উদাহরণ: রুশ বিপ্লব (১৯১৭) - বলশেভিকদের নেতৃত্বে রাশিয়ায় জার শাসনের অবসান ও সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা, ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯) - এই বিপ্লব ইরানকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে, চীন বিপ্লব (১৯১১) - সিনহাই বিপ্লবের মাধ্যমে চীনের রাজবংশের অবসান ঘটে।

পরিশেষে, সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা থেকে রাষ্ট্রের আইনের মর্যাদা ও অবস্থান ঊর্ধ্বে। সকল আইনের চেয়ে বাংলাদেশের সংবিধান ঊর্ধ্বে। সংবিধানের উপরে হচ্ছে আবার জনগণের অবস্থান, কেননা সংবিধান অনুযায়ী জনগণ হচ্ছে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিক। জনগণ চাইলে সংবিধান বাতিল করতে পারে, পুনর্লিখনও (Re-write) করতে পারে, যেমন চিলিতে করেছে ১৯৮০ সালে, আইসল্যান্ডে করেছে ২০০৮ সালে, ভেনেজুয়েলাতে করেছে ১৯৯৯ সালে, ফিলিপাইনে করেছে ১৯৮৬ সালে এবং তিউনিসিয়াতে করেছে ২০১১ সালে। শুধু তাই নয়, জনগণ চাইলে রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও চরিত্র (nature ও character) পরিবর্তন করতে পারে, যেমন: ফ্রান্স চতুর্থ রিপাবলিক বাতিল করে পঞ্চম রিপাবলিক ঘোষণা করেছে, ইরান ১৯৭৯ সালে নতুন প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে এবং ইথিওপিয়া ১৯৭৫ সালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ইথিওপিয়াকে সোস্যালিষ্ট রিপাবলিক ঘোষণা করেছে।


নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

ইমেইল: [email protected]