দুই বছর পর প্রকাশ্যে সেলিন ডিয়ন, প্যারিসে ভক্তদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত, ফিরছেন মঞ্চে

দুই বছর পর প্রকাশ্যে সেলিন ডিয়ন, প্যারিসে ভক্তদের ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত, ফিরছেন মঞ্চে

ফন্ট সাইজ:

দুই বছর পর প্রকাশ্যে এলেন হলিউডের সুপারস্টার গায়িকা সেলিন ডিয়ন (৫৮)। আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হলেন। প্যারিসের হোটেল ল্য রয়্যাল মনসোর বাইরে জড়ো হওয়া ভক্তদের দিকে হাত নেড়ে ও উড়ন্ত চুমু ছুড়ে অভিবাদন জানান তিনি। এ সময় তাকে বেশ আবেগাপ্লুত দেখাচ্ছিল। ক্যামেল রঙের ট্রেঞ্চ কোট ও হিল পরা সেলিন কালো সানগ্লাসের আড়ালে চোখ রেখেছিলেন। তবে ছবি তোলার সময় তার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। স্টিফ পারসন সিনড্রোমের (এসপিএস) সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের কারণে বিশ্ব সফর বাতিল করেন তিনি। প্রায় তিন বছর পর আবার মঞ্চে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সেলিন। বিরল এই স্নায়ুবিক রোগে শরীরে তীব্র পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া এবং যন্ত্রণাদায়ক খিঁচুনি দেখা দিতে পারে।

গত ছয় বছরে মাত্র একবার মঞ্চে পারফর্ম করেছেন তিনি। ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া তার প্রামাণ্যচিত্র ‘আই অ্যাম: সেলিন ডিয়ন’-এ রোগটির সঙ্গে তার কঠিন লড়াইয়ের বিস্তারিত উঠে আসে। ওই বছর সৌদি আরবের রিয়াদে এলি সাবের একটি ফ্যাশন অনুষ্ঠানে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক জনসমক্ষে উপস্থিত হয়েছিলেন তিনি। এরপর তাকে পল ম্যাকার্টনি ও কোল্ডপ্লের কনসার্টের দর্শকসারিতেও দেখা গেছে।

চলতি বছরের মার্চে সেলিন ঘোষণা করেন, শরৎ থেকে প্যারিসে ১০টি কনসার্টের মাধ্যমে তিনি মঞ্চে ফিরবেন। ব্যাপক চাহিদার কারণে পরে আরও ১৬টি পারফরম্যান্স যোগ করা হয়। চলতি সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের মে পর্যন্ত চলবে তার এই মঞ্চযাত্রা। চলতি মাসে হার্পার’স বাজার’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে শোয়ের প্রস্তুতি এবং রোগ নির্ণয়ের পর থেকে নিজের ভেতরের নানা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ওঠার কথা বলেছেন সেলিন। মঞ্চে ফেরার জন্য কঠোর শরীরচর্চা করছেন তিনি। সপ্তাহে তিন দিন ৯০ মিনিট করে পিলাটিস করার পাশাপাশি স্থানীয় একটি ব্যালে কোম্পানির সঙ্গে সপ্তাহে দু’বার ব্যালে ক্লাস করছেন। এসপিএস সম্পর্কে সেলিন বলেছেন, এটি একটি ক্রমাগত অগ্রসরমান শারীরিক অবস্থা। তবে তিনি একে ‘রোগ’ বলতে পছন্দ করেন না।

২০২২ সালে দীর্ঘদিনের উপসর্গের পর সেলিনের এসপিএস শনাক্ত হয়। এর আগে ২০২০ সালে, করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর সময়, তার শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি হয়। প্রায় তিন বছর ভক্তদের কাছ থেকে নিজেকে অনেকটাই আড়ালে রেখেছিলেন সেলিন ডিয়ন। এর একটি কারণ ছিল, ভক্তরা হয়তো মনে করতে পারেন তিনি স্বাভাবিক ও আনন্দময় জীবনযাপন করছেন, অথচ ইচ্ছা করেই কনসার্ট বাতিল করছেন। এই সময় প্রকৃতির প্রতি তার ভালোবাসাও আরও গভীর হয়। সেলিন বলেন, তিনি গাছকে খুব ভালোবাসেন এবং একসময় পাতার আড়ালে নিজেকে হারিয়ে ফেলার একটি দৃশ্য কল্পনা করতেন। শরতের সেই পাতাহীন গাছকে তিনি নিজের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও দেখেছিলেন। তার ভাষায়, তিনি যেন গাছকে বলতে চেয়েছিলেন, ‘দুঃখিত, তোমাদের দেয়ার মতো আর কোনো আপেল আমার কাছে নেই।’

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকসে পারফর্ম করাই ছিল সেলিনের সর্বশেষ মঞ্চ পরিবেশনা। এবার মঞ্চে ফেরার আগে ব্যস্ত শরীরচর্চার রুটিন অনুসরণ করছেন তিনি। নিজের বর্তমান সময়কে বারবার পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোর সময় হিসেবে বর্ণনা করেছেন এই গায়িকা। ভক্তদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, এত দীর্ঘ সময় পর তাদের জন্য এমন কিছু উপহার দিতে চান, যা দিয়ে বোঝাতে পারবেন তিনি তাদের কতটা মিস করেছেন। নিজের সাফল্যের পেছনে ভক্তদের অবদানের কথাও স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন সেলিন। তিনি বলেছেন, ভক্তরা তার কনসার্টের টিকিট কিনেছেন, তার রেকর্ড কিনেছেন এবং তাকে সেই বিলাসবহুল জীবন উপভোগের সুযোগ দিয়েছেন। তাই তাদের অন্তত এটুকু জানানো তার দায়িত্ব যে, তিনি বেঁচে আছেন।

এখন আবার কাজে ফিরতে প্রস্তুত তিনি- এমনকি পপ তারকা হওয়ার কিছু বিরক্তিকর দিকও মেনে নিতে প্রস্তুত। নিজেকে উদ্দেশ করে তিনি মজা করে বলেছেন, যদি অটোগ্রাফ দিতে না চান, সাজগোজ করতে না চান কিংবা পাস্তা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার ভয়ে কেউ বিরক্ত করুক তা না চান, তাহলে বাড়িতেই থাকা যায়। কিন্তু তখন যে সুযোগটি হারাতে হবে, সেটিই আসল বিষয়।

স্টিফ পারসন সিনড্রোম একটি বিরল স্নায়ুবিক রোগ, যাতে পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া ও যন্ত্রণাদায়ক খিঁচুনি দেখা দিতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। সেলিন জানিয়েছেন, রোগটি তার বিখ্যাত কণ্ঠকেও প্রভাবিত করেছে। ২০২২ সালে প্রথমবার এসপিএস আক্রান্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করে তিনি তখন বাকি সফরের সব কনসার্ট বাতিল করেছিলেন। সেসময় ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত এক ভিডিওতে আবেগাপ্লুত সেলিন বলেছিলেন, এই খিঁচুনি তার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। কখনো হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে, আবার কখনো নিজের স্বাভাবিক কায়দায় গান গাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোকাল কর্ড ব্যবহার করতে পারছেন না। তিনি জানান, প্রতিদিন স্পোর্টস মেডিসিন থেরাপিস্টের সঙ্গে কাজ করে নিজের শক্তি ও আবার পারফর্ম করার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছিলেন, এই লড়াই সহজ ছিল না।

‘আমি শুধু গান গাইতেই জানি। সারা জীবন এটাই করেছি, আর আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি এটিই’- বলেছিলেন তিন সন্তানের মা সেলিন ডিয়ন। ২০২৪ সালের মে মাসে ভোগ’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে নিজের স্বাস্থ্যের অগ্রগতি জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, তার ‘আনন্দ ফিরে এসেছে’। তার ভাষায়, কাঁধের ওপর থেকে বড় একটি বোঝা নেমে গেছে এবং সেই ভারের অনেকটাই এখন আর নেই। ফলে তিনি বাস্তবতার দিকে মনোযোগ দিতে পারছেন- যেটিকে তিনি অসাধারণ বলে বর্ণনা করেন। গত বছর টুডে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেলিন আরও বলেছিলেন, তিনি নিজের ওপর এবং নিজের সাহসের ওপর বিশ্বাস রাখেন। এই রোগকে তিনি কোনোভাবেই নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে দেবেন না।