নেপালে ভয়াবহ বন্যা, ভূমিধস থেকে বাঁচতে জঙ্গলে ছুটে গিয়ে গাছে উঠে আশ্রয় নেয় ৮ বছরের জোয়াল ঘালে। দীর্ঘ সময় পর শুক্রবার মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়েছে সে। এ সময় এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। তার মা আশঙ্কা করছিলেন, স্কুলে থাকা অবস্থায় বন্যায় তার দুই সন্তানই হয়তো মারা গেছে। এক দিন আগে ৮ বছরের ঘালে’কে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলা থেকে হেলিকপ্টারে করে উদ্ধার করা হয়। তার একটি পা ভেঙে গেছে এবং মুখে ছিল কাটা ছেঁড়ার দাগ। এদিকে তার ২৮ বছর বয়সী মা মত্তি মায়া তামাং নিখোঁজ দুই সন্তানকে খুঁজতে এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে আরেক আশ্রয়কেন্দ্র ও বিভিন্ন সংগ্রহকেন্দ্রে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
তামাং বলেছেন, চতুর্থ জায়গাতেও আমার সন্তানদের নাম তালিকায় ছিল না। আমি মেনে নিতে শুরু করেছিলাম যে আমার দুই সন্তানই আর বেঁচে নেই। কেবল কাঁদা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, কাঠমান্ডুর উত্তরে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলায় বন্যায় অন্তত ১৭ হাজার শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের শনাক্ত, নিবন্ধন ও তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনে নেপাল সরকারের সঙ্গে কাজ করছে সংস্থাটি। তামাং ও তার পরিবার অবশ্য ভাগ্যবানদের মধ্যে রয়েছেন। নেপাল ও চীনের তিব্বতে বন্যায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৮০ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। আরও কয়েক দফা ব্যর্থভাবে সন্তানদের খোঁজার পর বৃহস্পতিবার তামাং রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বাজরাচার্যের ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। এর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রতিবেশী নুয়াকোট জেলার একটি ছোট হাসপাতালে ঘালে’কে দেখতে গিয়েছিলেন বাজরাচার্য।
এক শিশুকে হাসপাতালে আনা হয়েছে এবং তার পরিবারের অবস্থান সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ কিছুই জানে না- এমন খবর পেয়ে বাজরাচার্য ও রয়টার্সের একটি দল ওই হাসপাতালে গিয়েছিল। হেলিকপ্টারে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঘালে’কে অন্যত্র নেয়ার আগে বাজরাচার্য তার সঙ্গে কথা বলেন। পরিবারের সন্ধান পাওয়ার আশায় ঘালের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে সে সম্মতি দেয়। বাজরাচার্য হাসপাতালে তার ফোন নম্বর রেখে এসেছিলেন। কয়েক ঘণ্টা পর তামাং তাকে ফোন করেন। বাজরাচার্য যখন তাকে জানান যে ঘালে জীবিত আছে এবং তাকে কাঠমান্ডুতে নেয়া হয়েছে, তখন তামাং তা প্রায় বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না।
তামাং বলেন, আপনি যখন বললেন যে আপনি জানেন জোয়াল ঘালে কোথায় আছে, তখন কথাটা আমার কাছে বাস্তব মনে হচ্ছিল না। আমি ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছিলাম যে তাদের আর খুঁজে পাব না। এরই মধ্যে তামাং তার ছোট ছেলেকেও জীবিত অবস্থায় খুঁজে পান। তিনি বলেন, বড় ছেলেকে খুঁজে পাওয়ার পর মনে হলো, আমার জীবনটা যেন আবার ফিরে পেলাম।
বুধবার সকালে দুই ভাই স্কুলের গাড়িতে করে স্কুলে গিয়েছিল। আর বাড়িতে বসে বুননের কাজ করছিলেন তাদের মা। হঠাৎ তিনি ভূমিকম্পের মতো একটি শব্দ শুনতে পান। রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে। সেটি নিচের উপত্যকায় গড়িয়ে পড়ার পর বরফ ও পাথরের বিশাল ধসের সৃষ্টি হয়। এর ফলে ব্যাপক ভূমিধস শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও যাচাই করে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে রয়টার্স। তামাং বলেন, আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমার সন্তানরাও হয়তো ভেসে যাচ্ছে।
তিনি সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের গাড়ির পথ পাড়ি দিয়ে ছেলেদের স্কুলে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার ভাষায়, তখন পুরো এলাকার চেহারা এমনভাবে বদলে গিয়েছিল যে জায়গাটি প্রায় চিনতেই পারছিলেন না। স্কুল ভবনটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর আর কাদা। ভূমিধসের কারণে উত্তর নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে এবং পরে তা তিব্বতেও প্রবেশ করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো জনপদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে নুয়াকোটের ১৫ শয্যার চক্র দেব হাসপাতালে রয়টার্সের সাংবাদিকরা ঘালের দেখা পান। তখন হাসপাতালের কেউই জানতেন না, তার পরিবারের সদস্যরা কোথায় রয়েছেন। তার ডান পা ভাঙা ছিল। মুখে ছিল আঁচড় ও আঘাতের দাগ। তবে বাঁ হাতে সে শক্ত করে ধরে রেখেছিল ১০ রুপির দুটি নোট। কর্মকর্তারা জানান, তাকে উদ্ধার করা পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালে যেতে রাজি করানোর জন্য ওই টাকা দিয়েছিলেন। ঘালে জানান, বন্যা আঘাত হানার সময় সে স্কুলে পড়াশোনা করছিল। হঠাৎ চারদিক ‘এত অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল’ যে সে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। সে জানায়, এক বন্ধুর সঙ্গে স্কুল থেকে দৌড়ে জঙ্গলে চলে যায় এবং বন্যার পানি থেকে বাঁচতে গাছে উঠে আশ্রয় নেয়। সে সময় ভয় পেয়েছিল কি না জানতে চাইলে ঘালে মাথা নাড়ে।
‘না।’
অবশেষে মা-ছেলের পুনর্মিলন
শুক্রবার তামাং অবশেষে কাঠমান্ডুর সেই হাসপাতালে পৌঁছান, যেখানে এরই মধ্যে ঘালেকে নেয়া হয়েছে। হাসপাতালটি তাদের বাড়ি থেকে গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। বন্যার কারণে সব বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তামাংয়ের জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করেন রয়টার্সের সাংবাদিক সাহানা বাজরাচার্য। কয়েক দিন ধরে মরিয়া হয়ে সন্তানদের খোঁজার পর তামাং অবশেষে ছেলের শয্যার পাশে নীরবে দাঁড়ান। তামাং জানান, জাপানে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করা ঘালের বাবাও তখন কাঠমান্ডুর পথে ছিলেন। বুধবারের ভয়াবহ বন্যা রাসুয়ায় মানুষের জীবন পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। তবে তামাংয়ের জন্য অন্তত কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। ছেলের দিকে তাকিয়ে তামাং বলেন, ও সবসময়ই দুষ্টু ছেলে। এই প্রথম তার হাড় ভাঙেনি।
