গণঅভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের তাত্ত্বিক পাঠ

জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র

গণঅভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের তাত্ত্বিক পাঠ

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণআন্দোলনের দুই বছরের পর্যালোচনায় প্রকাশিত মাহফুজ পারভেজের ‘জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক পাঠ’ গ্রন্থটি বাংলাদেশ রাজনীতি অধ্যয়নের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ। কারণ, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি গভীর সন্ধিক্ষণ। একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক কর্তৃত্বের অবসান, রাষ্ট্রক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, তরুণ প্রজন্মের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সক্রিয়তা এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন—সব মিলিয়ে জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একটি অধ্যায় সৃষ্টি করেছে, যার তাৎপর্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের অনেক ঊর্ধ্বে।

এই ঘটনাকে কী নামে অভিহিত করা হবে—গণআন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব, রাজনৈতিক রূপান্তর, নাকি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সূচনা—তা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান। এই বিতর্কের মধ্যেই মাহফুজ পারভেজের ‘জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক পাঠ’ গ্রন্থটির প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বইটি জুলাই ২০২৪-কে শুধু ঘটনাক্রম হিসেবে বর্ণনা করতে চায়নি। বরং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ব্যাখ্যার জন্য একটি তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করেছে। গ্রন্থটির অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কি কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা, নাকি এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি বৈপ্লবিক সূচনা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই লেখক প্রস্তাব করেছেন Theory of Democratic Revolutionary Institutionalisation (TDRI) বা গণতান্ত্রিক বিপ্লবী প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ তত্ত্ব। পাশাপাশি বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যার জন্য তিনি উপস্থাপন করেছেন July Democratic Transformation Model (JDTM)। ফলে গ্রন্থটির গুরুত্ব মূলত দুটি স্তরে—একদিকে এটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে, অন্যদিকে সেই অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণীকরণযোগ্য তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করে ঘটনাকে ইতিহাস থেকে তত্ত্বে উত্তরণের প্রয়াস আকারে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ভাষ্য, সংবাদ প্রতিবেদন, স্মৃতিকথা ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে তাৎক্ষণিক লেখালেখি এবং সেই ঘটনাকে সমাজবিজ্ঞানী বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দৃষ্টিকোণ থেকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করা এক জিনিস নয়। এখানেই মাহফুজ পারভেজের গ্রন্থটির একটি স্বতন্ত্রতা রয়েছে।
লেখক জুলাইয়ের ঘটনাকে একটি বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বিস্ফোরণ হিসেবে দেখেননি। বরং রাষ্ট্রের চরিত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক বৈধতা, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নকে একই বিশ্লেষণী কাঠামোর মধ্যে এনেছেন। এই পদ্ধতিটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইতিহাসে বিপ্লবের মুহূর্ত যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি গণঅভ্যুত্থান পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু নতুন ও অধিকতর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে না পারলে সেই অভ্যুত্থানের অর্জন টেকসই হয় না। এই জায়গাতেই ঞউজও-এর সম্ভাব্য তাত্ত্বিক গুরুত্ব নিহিত, যা বিপ্লব বনাম প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের মীমাংশায় ব্রতী।

রাজনৈতিক তত্ত্বের ইতিহাসে বিপ্লবকে প্রায়ই পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার আকস্মিক ভাঙন হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা কীভাবে গড়ে ওঠে তার ওপর। ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব, ইরানি বিপ্লব কিংবা বিভিন্ন উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা দেখায় যে বিপ্লবী শক্তি পুরোনো শাসনব্যবস্থা উৎখাত করলেও নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে না। এই বাস্তবতার আলোকে বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য—গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক বৈধতাকে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতায় রূপান্তর করার প্রয়োজনীয়তায় নিহিত। অর্থাৎ রাজপথে মানুষের সমাবেশ, প্রতিবাদ, আত্মত্যাগ কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এগুলোকে সংবিধান, নির্বাচন, জবাবদিহি, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার, মানবাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতার মতো স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করার প্রয়োজনীয়তাও অপরিসীম।

এখানে গ্রন্থটি একটি মৌলিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রশ্ন সামনে আনে: বিপ্লব কীভাবে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করে এবং প্রতিষ্ঠান কীভাবে বিপ্লবের মূল্যবোধকে সংরক্ষণ করে? এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তুলনামূলক রাজনৈতিক অধ্যয়নের জন্যও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। যে আলোচনার সূত্র ধরে ঔউঞগ নামে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের একটি বিশ্লেষণী মডেল উপস্থান করেছেন মাহফুজ পারভেজ।

গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য অবদান হলো July Democratic Transformation Model বা JDTM মডেল। এই মডেলটি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের ধাপগুলোকে একটি সুসংহত বিশ্লেষণী কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। এই মডেলের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মডেল তখনই তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী হয়, যখন সেটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বর্ণনা না দিয়ে কারণ, প্রক্রিয়া ও ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে।
সেই অর্থে ঔউঞগ-এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো জুলাইকে একটি process of transformation হিসেবে দেখা। অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই কোনো সমাপ্তি নয়; বরং একটি রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচনা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে জুলাইকে তিনটি পর্যায়ে পড়া যায়—পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বৈধতা-সংকট, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার কাঠামোর ভাঙন এবং পরবর্তী রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চেষ্টা। এই ত্রিস্তরীয় পাঠ বইটির বিশ্লেষণকে কেবল ঘটনাভিত্তিক না রেখে একটি পরিবর্তন-তত্ত্বের দিকে নিয়ে যায়। এভাবে বইটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে তত্ত্ব নির্মাণ। কারণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক গবেষণায় একটি পুরোনো প্রবণতা হলো পশ্চিমা রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোকে বাংলাদেশের ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা। সেটি প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। কারণ প্রত্যেক সমাজের রাজনৈতিক রূপান্তরের নিজস্ব ইতিহাস, সামাজিক কাঠামো ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে। মাহফুজ পারভেজের গ্রন্থের আকর্ষণ এখানেই যে লেখক বাংলাদেশের জুলাই অভিজ্ঞতা থেকে নিজস্ব তাত্ত্বিক ধারণা নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

এটি সহজ কাজ নয়। কারণ একটি নতুন তত্ত্বকে একই সঙ্গে তিনটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। প্রথমত, সেটিকে সংশ্লিষ্ট বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান তত্ত্বগুলোর তুলনায় নতুন ব্যাখ্যামূলক মূল্য দিতে হবে। তৃতীয়ত, সেটিকে বাংলাদেশের বাইরেও তুলনামূলক গবেষণায় প্রয়োগযোগ্য হতে হবে। মডেলটি এই তিনটি মানদণ্ড কতটা পূরণ করতে সক্ষম হবে, সেটিই ভবিষ্যৎ গবেষণার বড় প্রশ্ন। তবে ধারণাটি যে গবেষণাযোগ্য এবং তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয়, তাতে সন্দেহ নেই।

গ্রন্থটির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো গণতন্ত্রের ধারণাকে বিস্তৃত করা। প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনায় গণতন্ত্র প্রায়ই নির্বাচন, রাজনৈতিক দল এবং সরকার গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য নির্বাচন প্রয়োজনীয় হলেও একমাত্র বা যথেষ্ট নয়। গণতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, সংখ্যালঘু অধিকার এবং নাগরিক অংশগ্রহণ।

জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে এই প্রশ্নগুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেই নতুন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন এবং ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিষ্ঠানগত নিয়ম পরিবর্তন—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়। এই জায়গায় গ্রন্থটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করতে পারে।

গ্রন্থটির রাজনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট। বইটি শুধু একাডেমিক পাঠকদের জন্য নয়। এর সম্ভাব্য পাঠক রাজনৈতিক কর্মী, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরাও। কারণ জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কে ক্ষমতায় থাকবে তা নয়; বরং কী ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, দলীয়করণ এবং জবাবদিহির ঘাটতি অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রে পরিবর্তন সীমিত হতে পারে।
অতএব, বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক বিপ্লবের চূড়ান্ত পরীক্ষা রাস্তায় নয়—প্রতিষ্ঠানে।

লেখক মাহফুজ পারভেজ প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)। তার আগ্রহ কেবল রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রচলিত একাডেমিক পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণা, ইতিহাস, রাজনীতি, শান্তি ও সংঘাত, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন—বিভিন্ন বিষয় তাঁর লেখালেখির ক্ষেত্র।
এই বহুমাত্রিক আগ্রহই সম্ভবত তাঁকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে একক কোনো শাস্ত্রের চোখে না দেখে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমকালীন রাজনৈতিক তত্ত্বের সংযোগস্থলে বিশ্লেষণ করতে উৎসাহিত করেছে। এরও আগে তিনি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই জুলাই নিয়ে প্রথম বই Student Protest and Hasina's Downfall in Bangladesh: Causes and Consequences প্রকাশ করেন, যার প্রকাশক স্টুডেন্ট ওয়েজ। আলোচ্য ‘জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক পাঠ’ গ্রন্থটিও প্রকাশ করেছে স্টুডেন্ট ওয়েজ। জুলিাই বিষয়ক দ্বিতীয় বইটি একই সঙ্গে সমকালীন ইতিহাসের দলিল, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং তত্ত্ব নির্মাণের প্রয়াস হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

মাহফুজ পারভেজ যথার্থই চিহ্নিত করেছেন যে, জুলাইয়ের প্রকৃত পরীক্ষা সামনের দিনগুলোতে। তাই গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় গুরুত্ব সম্ভবত এখানেই যে এটি আমাদের অতীতের একটি ঘটনা নিয়ে শুধু স্মৃতিচারণ করতে না বলে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র নিয়ে প্রশ্ন ও চিন্তা করতে বাধ্য করে। কারণ, একটি গণঅভ্যুত্থান কখনোই নিজে নিজে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করে না। অভ্যুত্থান ক্ষমতার দরজা খুলে দিতে পারে; কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কোন বা কেমন রাষ্ট্র প্রবেশ করবে, তা নির্ধারণ করে প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ। এই অর্থে মাহফুজ পারভেজের ধারণাটি বাংলাদেশের জুলাই অভিজ্ঞতাকে একটি বৃহত্তর তাত্ত্বিক প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করেছে: গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে কীভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বে রূপান্তর করা যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বৈরতন্ত্রের পতন, গণআন্দোলন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণেও এটি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
ফলে এটি একটি সমাপ্তির বই নয়: চলমান রাজনৈতিক পরীক্ষার তাত্ত্বিক পাঠ। বইটির প্রকৃত সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে জুলাই কতটা পরীক্ষিত, পরিমার্জিত ও তুলনামূলকভাবে প্রয়োগযোগ্য হয় তার ওপর।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই ২০২৪ যদি সত্যিই একটি যুগসন্ধিক্ষণ হয়ে থাকে, তবে তার মূল্যায়ন শুধু অতীতের ঘটনাবলি দিয়ে হবে না। মূল্যায়ন হবে—সেই অভ্যুত্থান কি একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র নির্মাণের পথ তৈরি করতে পেরেছে? মাহফুজ পারভেজের গ্রন্থটি সেই বৃহত্তর প্রশ্নটিই সামনে এনে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রেখে রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রণোদিত করার মাধ্যমে।