দেবিদ্বারে অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা দ্বন্দ্বে বন্ধ মা ও শিশু হাসপাতাল, মামলা

ফন্ট সাইজ:

কুমিল্লার দেবিদ্বারে সাড়ে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬ তলাবিশিষ্ট ১০০ শয্যার অত্যাধুনিক ‘জালাল উদ্দীন আহমেদ ফাউন্ডেশন কমিউনিটি ভিত্তিক মা ও শিশু ডায়াবেটিস হাসপাতালটি অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা দ্বন্দ্বে তালাবদ্ধ রয়েছে। ফলে ফাউন্ডেশন’র ট্রাস্টি বোর্ডের পরিচালকদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা আদালতে ভাড়াটিয়া ময়নাল হোসাইন বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। জানা যায়, ভাড়া জটিলতায় চলতি বছরের গত ১৮ই জুন থেকে হাসপাতালটির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ হাসপাতালটির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে শত শত রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

অপরদিকে হাসপাতালের অনেকের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা জেলায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হাসপাতালগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় ও আধুনিক। ২০১৭ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং ‘জালাল উদ্দীন আহমেদ ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ উদ্যোগে দেবিদ্বার পৌর এলাকার বারেরা গ্রামে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২৪ কোটি ৫৪ লাখ ২১ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই প্রকল্পে সমাজসেবা অধিদপ্তর ৮০ শতাংশ এবং জালাল উদ্দীন আহমেদ ফাউন্ডেশন ২০ শতাংশ অর্থ জোগান দেয়। দরপত্রের মাধ্যমে কাজটির কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মহিউদ্দিন এন্টারপ্রাইজ’। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৭-২০২০ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দফায় দফায় সময় পেছানো হয়। দীর্ঘ বিলম্বের পর অবশেষে গত ২০২৫ সালের ২০শে আগস্ট হাসপাতালটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধন ও পরবর্তী পরিচালনা প্রক্রিয়াও ছিল নিয়মবহির্ভূত। নীতিমালা অনুযায়ী, মূল ফাউন্ডেশনের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ভাড়ায় হাসপাতাল পরিচালনা করার সুযোগ নেই। কিন্তু ফাউন্ডেশন’র ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষে আর্থিক সংকটে হাসপাতালটি চালাতে পারছিল না। তাই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ট্রাস্টি বোর্ড হাসপাতালটি ভাড়া দিয়ে দেন। তবে রোগীদের স্বার্থে এগিয়ে আসা মো. সফিউল্লাহ সরকার, মো. ময়নাল হোসেন ও আল আমিনের কাছে ২০২৫ সালের ২০শে আগস্ট থেকে ২০৪০ সালের ২০শে আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালের ট্রাস্টি বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তিনামার ভিত্তিতে এ চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী চুক্তিনামা সম্পাদনে ৩৫ লাখ টাকা নগদে অগ্রিম দেয়া হয়। এ টাকার অতিরিক্ত ফাউন্ডেশন ১২ লাখ টাকার একটি চেকও দেয়া হয়। এ ছাড়া মাসিক ভাড়া হিসেবে ১৫ বছরের মধ্যে প্রথম ৪ বছর মাসিক ১ লাখ টাকা করে, দ্বিতীয় ধাপে ৪ বছর মাসিক ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং বাকি ৭ বছর ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে ১৫ বছরের ভাড়া প্রদানের চুক্তিপত্র হয়। ভাড়াটিয়ারা জানান, নিজেদের অর্থায়নে সঠিক স্বাস্থ্যসেবার মানের লক্ষ্যে নিজ তহবিল থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি। ৩০% ছাড় ও বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করি। আমাদের সাফল্য দেখে তারা মেনে নিতে পারেনি। ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান একেএম খাইরুল আলম, (সাবেক অতিরিক্ত সচিব) সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক একেএম শফিকুল আলম (ভিপি কামাল), কোষাধক্ষ্য জিএম নুরুল আলম রাজীব এর কুদৃষ্টি পড়ে। তারা বিনা ইনভেস্টে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নেয়ার পাঁয়তারা শুরু করে। ২৪ ঘণ্টা হাসপাতাল খোলা রাখার নিয়ম থাকলেও দুপুর ২টায় হাসপাতালের গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। সকালে ডায়াবেটিসের রোগীদের হাসপাতালে ঢুকতে দেয়া হয়না। একপর্যায়ে প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে, চাঁদা দিতে রাজি না হলে সন্ত্রাসী নিয়ে হসপাতালটির আসবাবপত্র ভাঙচুর করে মালামালসহ তালা বন্ধ করে। এ বিষয়ে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং কুমিল্লা সমাজসেবা কার্যালয় উপ-পরিচালক ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিলেও এখনো কোনো প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে গত ১১ই আগস্ট আদালতে মামলা করি। ভুক্তভোগী ময়নাল হোসাইন জানান, চুক্তির ৪-৫ মাসের মধ্যেই ফাউন্ডেশনের কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে হাসপাতালটি বন্ধ করে দেয়। জীবনের সমস্ত অর্জন এমনকি জমি বিক্রি করে বিনিয়োগ করেছি। আজ আমি নিঃস্ব। প্রতিদিন কিস্তির টাকা, এনজিও’র টাকাসহ বিভিন্ন কোম্পানির বকেয়া রয়েছে ৯২ লাখ টাকা। এছাড়া ডাক্তার, নাসর্, টেকনিশিয়ানসহ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর প্রায় ১১ লাখ টাকা বেতন বকেয়া। তাই ভুক্তভোগীরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সঠিক বিচার দাবি জানান। এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের ডিডি নুরুল ইসলাম বলেন, আমরা অভিযোগ পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। এ বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খাইরুল আলমকে মুঠোফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করার পর সাংবাদিক পরিচয় জেনে নিজেই বলেনÑ এটা খাইরুল আলম নয়।