যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প একে ‘ছোটখাটো অভিযান’ হিসেবে আখ্যা দিলেও এটি এখন একটি চরম অজনপ্রিয় ও স্থবির যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। এটি তার প্রেসিডেন্ট পদকেই হুমকির মুখে ফেলছে। ইরান এখনও আত্মসমর্পণ করেনি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সর্বোপরি যুদ্ধ শেষের কোনো সুস্পষ্ট পথও দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে সামরিক হামলার বদলে ইরানকে দুর্বল করতে অর্থনৈতিক চাপের পথে হাঁটছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, আপাতত নতুন করে হামলার কোনো সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধের ছয়টি প্রধান পরিণতি এরই মধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে ট্রাম্পকে: এই যুদ্ধের কারণে রাজনৈতিকভাবে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। রয়টার্স/ইপসস-এর জরিপ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে তার প্রতি জনসমর্থন ৪০ শতাংশ থেকে কমে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষ এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এটি রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা, তবে যতটা আশা করা হয়েছিলো তার চেয়ে কম: বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই জলপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্বজুড়ে মন্দার আশঙ্কা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এ বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ ভাগ থেকে কমিয়ে ৩ ভাগে নামিয়ে এনেছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের প্রসার এবং সত্তরের দশকের তুলনায় জ্বালানি নির্ভরতা কমে যাওয়ায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। এতে যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিলো তার চেয়ে কম ধাক্কা লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
ইরান আহত তবে পরাজিত নয়: যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তারা পরাজিত হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, তারা ইরানের ১৬১টি নৌযান এবং ৮২ ভাগ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছে। তা সত্ত্বেও ইরানের কাছে এখনও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি চরমে পৌঁছেছে, বিশেষ করে জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১২৮ ভাগে দাঁড়ায়। তবে জাতীয় ঐক্যে এখনো বড় কোনো চির ধরেনি।
মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীল, ঝুঁকিতে মার্কিন মিত্ররা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ করা। কিন্তু উল্টো মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং লোহিত সাগরে হুথিদের অবরোধের কারণে পুরো অঞ্চলে পরিবহন ও বিমা খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে ইরানের আরও সময় লাগতে পারে: এ যুদ্ধের ফলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যমতে, বোমার জন্য পর্যাপ্ত ফিসাইল উপাদান তৈরির সময়সীমা ছয় মাস থেকে বেড়ে এক বছরে দাঁড়িয়েছে। তবে জাতিসংঘের পরিদর্শকরা ইরানে ফিরতে না পারায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত অবস্থা এখনও অজানা। বিশেষ করে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কাছে কোনো তথ্য নেই।
কমে গেছে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি: সংঘাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতা ও প্রস্তুতি অনেকটাই কমে গেছে। একটি কংগ্রেশনাল রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ৪২টি সামরিক বিমান হারিয়েছে। এছাড়া প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ৬৫ ভাগ এবং থাড ক্ষেপণাস্ত্রের ৩৮ ভাগ মজুত শেষ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে যুদ্ধবিমান ও রণতরি সরিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে ওয়াশিংটন। ফলে অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
