মফস্বল সাংবাদিকতার বাস্তবতা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। নিজে মফস্বল পর্যায়ে সাংবাদিকতা করে আসার কারণে এই পেশার আনন্দ যেমন জানি, তেমনি এর নির্মম বাস্তবতাও আমার অজানা নয়। সত্যি বলতে কী, জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা যতটা কঠিন, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন মফস্বলে সাংবাদিকতা করা। কারণ জাতীয় পর্যায়ের একজন সাংবাদিক কোনো একটি ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন করে হয়তো পরদিন অন্য একটি বিষয়ের অনুসন্ধানে চলে যেতে পারেন। কিন্তু মফস্বলের সাংবাদিকের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে যাকে নিয়ে সকালে সংবাদ লিখছেন, বিকেলে হয়তো তার সঙ্গেই একই রাস্তায় দেখা হচ্ছে; যে কর্মকর্তার অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন, পরদিন সেই অফিসেই আবার যেতে হচ্ছে; যে রাজনৈতিক নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, বাজারে, সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা কোনো জনসমাগমে তার সঙ্গেই মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এখানে উল্লেখ্য যে ছাত্রজীবনে মানবজমিনের হাত ধরেই আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। সেই সময় থেকেই অনিয়ম, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক অসততার বিরুদ্ধে কলম ধরেছি। এই পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। সত্য প্রকাশের কারণে আমিও একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছি, চাপ এসেছে, হুমকি এসেছে, নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু কোনো অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করিনি। কারণ আমার কাছে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সত্যের পক্ষে থাকা।
যাহোক মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক, মফস্বলের সাংবাদিকের কর্মক্ষেত্র আসলে তার নিজের সমাজ। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি কেবল একজন ‘সাংবাদিক’ থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন একই এলাকার পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী, কখনো বন্ধুর বন্ধু, কখনো আত্মীয়ের পরিচিত। সেই কারণে তার একটি প্রতিবেদনের অভিঘাতও অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও তাৎক্ষণিক। কারও পক্ষে লিখলে বাহবা আসে, ফোন আসে, আপ্যায়নের আমন্ত্রণ আসে; কিন্তু কারও স্বার্থের বিরুদ্ধে সত্য লিখলেই আচরণ বদলে যায়। শুরু হয় চাপ, তদবির, কটূক্তি, হুমকি—কখনো কখনো হামলাও। এটাই মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা।
এই বাস্তবতার আলোতেই শরীয়তপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাটিকে দেখতে হবে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তিন সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ এবং পরে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফোন করা আরেক সাংবাদিককে হুমকি দেয়ার অভিযোগ নিছক একটি স্থানীয় বিরোধের ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের মফস্বল সাংবাদিকতার সেই দীর্ঘদিনের সংকটকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে একজন সংবাদকর্মীকে প্রতিদিন একই সমাজে বসবাস করে একই সমাজের ক্ষমতাবানদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ করতে হয়।
শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচি কাভার করতে গিয়ে ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর ও জাগো নিউজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে। ঘটনার সময় সেখানে বিএনপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর বিকেলে ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাজিরা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি পলাশ খান ফোন করেন বলে জানা গেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ফোনালাপে আরিফুজ্জামান মোল্লা সাংবাদিকদের আরও মারধরের হুমকি দেন এবং বলেন—‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডাইমু।’ এমনকি পলাশ খানকেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পলাশ খান জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি পুলিশকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন এবং লিখিতভাবে আইনগত পদক্ষেপ নেবেন।
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই হবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ। কিন্তু অভিযোগটি যে প্রশ্নটি সামনে এনেছে, সেটি তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষায়ও রাখা যায় না—বাংলাদেশে একজন সাংবাদিক কতটা নিরাপদে সত্য লিখতে পারেন?
কারণ ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু’—এই কথাটি কেবল একটি হুমকি নয়, যদি সত্যিই এমন কথা বলা হয়ে থাকে, তাহলে এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাতের মানসিকতার প্রকাশ।
মফস্বল সাংবাদিকতা কেন এত কঠিন, সেটি বোঝার জন্য একটি দিনের চিত্রই যথেষ্ট। সকালে একজন সাংবাদিক থানায় গেলেন। সেখানে কোনো মামলার তথ্য নিলেন। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলেন। দুপুরে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি কাভার করলেন। বিকেলে বাজারে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা হলো। সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাবে বসে দিনের সংবাদ সম্পাদনা করলেন। রাতে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন। পরদিন সকালেই সেই প্রতিবেদনের কোনো পক্ষ তার সামনে এসে দাঁড়াতে পারে। সংবাদে যার নাম এসেছে, তার সঙ্গে আবার একই শহরে দেখা হবে। একই চায়ের দোকানে বসতে হবে। একই অনুষ্ঠানে যেতে হবে। একই সামাজিক পরিসরে থাকতে হবে।
এই বাস্তবতা জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিকতার সঙ্গে অনেকটাই আলাদা। জাতীয় পর্যায়ে একটি প্রতিবেদনের কারণে ক্ষুব্ধ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাংবাদিকের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এটিও বাস্তবতা। কিন্তু মফস্বলে সেই চাপ অনেক বেশি সরাসরি, ব্যক্তিগত এবং তাৎক্ষণিক। কারণ এখানে সাংবাদিক ও সংবাদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি একই সামাজিক বলয়ের মধ্যে বসবাস করেন। ফলে সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত বিরোধ অনেক সময় ব্যক্তিগত বিরোধে পরিণত হয়। আর এই জায়গাটিই মফস্বল সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
একজন মফস্বল সাংবাদিকের হাতে সাধারণত বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা থাকে না। অনেকেই সীমিত বেতন বা সম্মানীতে কাজ করেন। অনেকের পেশাগত পরিচয়ও পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষিত নয়। অথচ তাদেরই থানা, আদালত, প্রশাসন, হাসপাতাল, রাজনৈতিক কর্মসূচি, দুর্নীতি, অপরাধ, চাঁদাবাজি, দখল, মাদক, সন্ত্রাস—সবকিছুর খবর সংগ্রহ করতে হয়। এমনকি অনেক সময় জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বড় প্রতিবেদন তৈরির প্রাথমিক তথ্যও আসে এই মফস্বল সাংবাদিকদের কাছ থেকেই।
কিন্তু সংবাদ প্রকাশের সময় যে সাহস দরকার, সংবাদ প্রকাশের পর সেই সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর প্রশ্নে আমরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ি। এখানেই রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যমের মালিকপক্ষ এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব সামনে আসে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে শুধু ঢাকার বড় সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নয়। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা হয় শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা কিংবা দেশের প্রত্যন্ত কোনো উপজেলা শহরে। কারণ রাজধানীর একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা সাংবাদিকের নিরাপত্তা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, একটি উপজেলা পর্যায়ে রাতের আঁধারে কোনো অনিয়মের ছবি তুলে রাখা সাংবাদিকের নিরাপত্তাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। বরং অনেক ক্ষেত্রে মফস্বল সাংবাদিকের ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ তার সংবাদকর্মই তার সামাজিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে থাকে।
কোনো জনপ্রতিনিধির অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করলে পরদিন বাজারে তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করলে ফোন আসতে পারে। কোনো অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ করলে হুমকি আসতে পারে। আবার কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলে দলীয় কর্মীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। বিপরীতে একই সাংবাদিক যখন ইতিবাচক কোনো সংবাদ প্রকাশ করেন, তখন সেই পক্ষই তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিতে পারে। এই ‘পক্ষে গেলে বাহবা, বিপক্ষে গেলে হুমকি’ সংস্কৃতি স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ সাংবাদিকের কাজ কারও পক্ষে বা বিপক্ষে থাকা নয়। সাংবাদিকের কাজ সত্যের পক্ষে থাকা।
কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সংকট হলো, অনেক নেতা এখনো সমালোচনাকে ব্যক্তিগত শত্রুতা হিসেবে দেখেন। সংবাদে নিজের প্রশংসা থাকলে সাংবাদিক ‘ভালো’; সমালোচনা থাকলে ‘শত্রু’। এই মানসিকতা শুধু কোনো একটি দলের সমস্যা নয়; বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক ধারাতেই কোনো না কোনোভাবে এই প্রবণতা দেখা গেছে।
আজ যে দল ক্ষমতায়, সে যদি সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা মনে করে, আগামীকাল সেই দল বিরোধী দলে গেলে স্বাধীন গণমাধ্যমের দাবি তুলবে। আবার যে দল আজ বিরোধী অবস্থানে থেকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে যদি একই সাংবাদিককে চাপ দেয়, তাহলে তার গণতন্ত্রের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য—সেটিও প্রশ্নের বিষয়। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এখন সময় এসেছে নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পুনর্বিবেচনার।
বিএনপি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছে। সেই দলের কোনো নেতার বিরুদ্ধে যদি সাংবাদিককে মারধর ও হুমকি দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে দলটির জন্য বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে; অভিযোগ সত্য না হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেটি পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু কোনোভাবেই সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়তে পারে না।
একইভাবে পুলিশের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেছেন, সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের তথ্য তারা জেনেছেন এবং লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অবশ্যই আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু সাংবাদিকদের ওপর হামলা বা হুমকির অভিযোগে পুলিশের প্রতিক্রিয়া যত দ্রুত ও নিরপেক্ষ হবে, সাংবাদিকদের আস্থাও তত বাড়বে। কারণ একটি হামলার বিচারহীনতা পরবর্তী হামলার সাহস বাড়ায়।
বিশ্বব্যাপীও সাংবাদিক নিরাপত্তা এখন গণতন্ত্রের অন্যতম সূচক। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স বাংলাদেশের সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও দায়মুক্তির অবসানকে গণমাধ্যম সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসও সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা ও দায়মুক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা বলার আগে আমাদের নিজেদের মাটির বাস্তবতা বুঝতে হবে। মফস্বলের সাংবাদিক শুধু সংবাদ লেখেন না; তিনি সেই সংবাদ সমাজের মধ্যেই নিয়ে বেঁচে থাকেন। তার সন্তান একই এলাকায় স্কুলে পড়ে, পরিবার একই এলাকায় বসবাস করে, আত্মীয়স্বজন একই এলাকায় থাকে। ফলে একজন সাংবাদিককে হুমকি দেয়া মানে শুধু একজন পেশাজীবীকে ভয় দেখানো নয়; অনেক সময় তার পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়া।
এই কারণেই মফস্বল সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা দরকার। সংবাদ সংগ্রহের সময় হামলা হলে দ্রুত আইনি সহায়তা, অভিযোগ গ্রহণে পুলিশের বিশেষ গুরুত্ব, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগের দ্রুত তদন্ত—এসব নিশ্চিত করতে হবে।
আর রাজনৈতিক দলগুলোরও স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—সাংবাদিকের সঙ্গে মতের বিরোধ হতে পারে, কিন্তু শারীরিক হামলা বা হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হলো ভয়। আর ভীত সাংবাদিক ধীরে ধীরে নিজের কলমকে নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন। তখন আর কোনো সেন্সরশিপের প্রয়োজন হয় না।
একজন সাংবাদিক যদি ভাবেন, ‘এই খবরটি করলে আমার ওপর হামলা হতে পারে’, তাহলে তিনি হয়তো খবরটি করবেন না। যদি ভাবেন, ‘ওই নেতার বিরুদ্ধে লিখলে কাল বাজারে আমাকে অপমান করা হবে’, তাহলে তিনি হয়তো তথ্যটি বাদ দেবেন। যদি মনে করেন, ‘এই দুর্নীতির অনুসন্ধান করলে পরিবার বিপদে পড়বে’, তাহলে অনুসন্ধান থেমে যাবে। এভাবেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাগজে থাকে, বাস্তবে থাকে না।
তাই শরীয়তপুরের ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তিন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ এবং আরেক সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। সত্য উদঘাটন করতে হবে। দোষী যে-ই হোন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সাংবাদিকরা যেন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিশোধের ভয়ে সংবাদ করা থেকে পিছিয়ে না যান, সেই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,মফস্বল সাংবাদিকতা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মেরুদণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাজধানীর সংবাদমাধ্যমের আলো অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অন্ধকারে প্রথম আলো জ্বালান একজন মফস্বল সাংবাদিকই। তিনি দুর্নীতির খবর দেন, অপরাধের খবর দেন, প্রশাসনের অনিয়ম তুলে ধরেন, সাধারণ মানুষের কথা বলেন, নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ান। অথচ সেই সাংবাদিকই যখন নিজের নিরাপত্তার জন্য অসহায় হয়ে পড়েন, তখন আমাদের গণতন্ত্রের বড় বড় কথাগুলো অর্থহীন হয়ে যায়।
আমার নিজের মফস্বল সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো সেখানে অনেক সময় এক ধরনের নীরব সাহসের পরীক্ষা। কারও পক্ষে লিখলে বাহবা পাওয়া যায়, কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে কখনো কখনো একা হয়ে যেতে হয়। তবুও সাংবাদিককে লিখতে হয়। কারণ তার কলমের পেছনে থাকে অসংখ্য মানুষের না-বলা কথা।
সেই কলমকে যদি হুমকি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে শুধু একজন সাংবাদিক নয়—থেমে যায় সমাজের একটি সতর্ক ঘণ্টাও।
তাই আজ শরীয়তপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, পুলিশ এবং সংবাদমাধ্যম—সবার কাছেই একটি প্রশ্ন তুলতে চাই,
সাংবাদিক লিখবে, নাকি ভয়ে চুপ থাকবে? কোনো রাজনৈতিক নেতার প্রভাবের কারণে যদি সাংবাদিককে চুপ থাকতে হয়, তাহলে
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক বার্তা আর কিছুই হতে পারে না।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।
ই-মেইল: [email protected]
‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু’!—এটাই কি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা?
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
১ ঘন্টা আগে
২৭ আগস্ট (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ১ঃ৪৫ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
