নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে বুধবার পাহাড়ি মাটি ও পাথরের বিশাল স্তর নদীতে ধসে ভয়াবহ প্রাণহানি হয়েছে। আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে সেখানে। এতে নেপাল অংশে কমপক্ষে ৩১ জন নিহত এবং শত শত পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতীয় মিডিয়া জানিয়েছে নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে কমপক্ষে ১০৫ জন ভারতীয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি আছেন কিনা তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, এখনও উদ্ধার অভিযান চলমান। যাচাই করা ভিডিওতে সীমান্ত এলাকায় বহু মানুষকে পানির স্রোতে ভেসে যেতে দেখা গেছে। দুই দেশের কর্তৃপক্ষই আশঙ্কা করছে, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।নেপালে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প পানির স্রোতে ভেসে গেছে।
অন্যদিকে তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্তবর্তী গিরং এলাকায় ভূমিধসের পর ‘বড় ধরনের প্রাণহানির’ আশঙ্কা রয়েছে এবং কয়েকজন নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বুধবার দেশটির পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের কারণে তুষারধস বা পাহাড়ধস সৃষ্টি হয়ে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
নেপালের পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই অঞ্চল থেকে কমপক্ষে ৩৮৪ জন পর্যটক ও ভ্রমণকারী নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৫ জন ভারতীয়, ৯৩ জন নেপালি, তিনজন মার্কিন নাগরিক এবং ১২ জন বৃটিশ নাগরিক রয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ সংস্থা ইয়োনহাপ জানিয়েছে, আরও প্রায় আটজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে নেপালের সীমান্তবর্তী ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা কয়েকটি নদী এসব রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
চীন-নেপাল সীমান্তের চীনা অংশে থাকা নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, বিশাল পাথর, কাদা ও পানির স্রোত ধেয়ে আসার আগে মানুষজন দ্রুত পালানোর চেষ্টা করছেন। এরপর ওই স্রোত ভবন ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
ভূমিধসের সঠিক কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস জানিয়েছে, ভিডিওতে ধারণ করা সময়ের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪.৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নেপালের লেন্দে খোলা নদীতে বরফ ও পাথরের ধস এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত করে থাকতে পারে।
তবে এর মূল কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনও একটি বড় বাধা আটকে থাকায় দ্বিতীয় দফায় আরও বড় বন্যা হতে পারে। নেপালের রাসুয়া জেলার শ্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার নামতে পারেনি। নদীর পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক ওপরে উঠে গেছে।
টেলিভিশন ফুটেজে দেখা গেছে, বন্যার পানিতে বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, গাড়ি ভেসে যাচ্ছে এবং একটি ধাতব সেতু পানির স্রোতে ভেসে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পুরো গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার বলেন, ভারী প্রাণহানি বা সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। তিনি ভোতে কোশি নদীর তীরে বসবাসকারীদের উঁচু এলাকায় সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রাসুয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিক রয়টার্সকে বলেন, যেদিকেই তাকাই, ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।
চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ভূমিধসটি নেপালের অংশে শুরু হয়ে সীমান্তের গিরং বন্দরে আঘাত হানে। এতে তিব্বতের শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, গিরং সীমান্ত এলাকায় অন্তত ৫৭৪ জন উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। একজন উদ্ধারকর্মী সিসিটিভিকে জানান, প্রায় দেড় মিটার গভীর কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষ পথ আটকে থাকায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে উদ্ধারকারী দলের অন্তত চার ঘণ্টা লাগতে পারে। তার ভাষ্য, ধ্বংসাবশেষ নেপালের দিক থেকে সীমান্ত পার হয়ে উজানের দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে ‘সর্বাত্মক’ প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে তিনি দ্বিতীয় দফা বিপর্যয় ঠেকাতে আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেপালের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বন্যায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর বেশিরভাগই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। রয়টার্সের হিসাবে, এটি নেপালের মোট ৩.২ গিগাওয়াট জলবিদ্যুৎ সক্ষমতার ১২ শতাংশেরও বেশি। উদ্ধার অভিযানে পুলিশ ও সেনাবাহিনী যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নদীর তীরবর্তী বাসিন্দাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে এবং পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানিয়েছেন, নয়াদিল্লি প্রয়োজনীয় সব ধরনের মানবিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত এবং ভারত ও নেপালের সংশ্লিষ্ট দলগুলো উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করছে। তিব্বত থেকে উৎপত্তি হওয়া ভোতে কোশি নদী নেপালের ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে মিশেছে। পরে এই নদী ভারতে প্রবেশ করে গান্ডাক নামে প্রবাহিত হয়েছে। এর আগে গত বছরও ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যায় ৯ জন নিহত ও ২৪ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। ওই বন্যায় নেপাল ও চীনের মধ্যে যোগাযোগকারী ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ ভেসে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছিল। আঞ্চলিক জলবায়ু পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার মতে, গত বছরের বন্যার কারণ ছিল তিব্বতের একটি সুপ্রাগ্লেশিয়াল হ্রদের পানি বেরিয়ে যাওয়া।
