এক বুক স্বপ্ন নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কারও লক্ষ্য ছিল উচ্চশিক্ষা, কারও পরিবারকে স্বচ্ছল করা, আবার কেউ চেয়েছিলেন নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই স্বপ্নের পথে নেমে এসেছে অন্ধকার। ক্যান্সারসহ জটিল রোগ কেড়ে নিচ্ছে তাদের স্বাভাবিক জীবন, থামিয়ে দিচ্ছে পড়াশোনা এবং অনিশ্চিত করে তুলছে ভবিষ্যৎ।
অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানো বাংলাদেশি তরুণদের বেশ কয়েকজন এখন হাসপাতালের বেডে, কেউ দীর্ঘ চিকিৎসার অনিশ্চিত পথে। শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা যাদের, তাদের দিন কাটছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি কিংবা ওষুধের হিসাব করতে করতে। অসুস্থতার সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তাদের সামনে বড় হয়ে উঠেছে চিকিৎসা ব্যয়, বাসাভাড়া, টিউশন ফি এবং আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার সংকট। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা পরিবারগুলোর জন্যও সন্তানের অসুস্থতা হয়ে উঠেছে নতুন এক যুদ্ধ। এসব শিক্ষার্থীর জন্য অসুস্থতা তাই শুধু শারীরিক সংকট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আর্থিক চাপ, মানসিক দুর্ভোগ এবং ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
সিডনিতে ৩০ বছর বয়সী বাংলাদেশি রাহিমুল বারি চৌধুরী বর্তমানে স্টেজ-৪ কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ায় এসে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন হঠাৎ থমকে গেছে প্রাণঘাতী এ রোগে। নিয়মিত পরীক্ষা, স্ক্যান, চিকিৎসকের পরামর্শ ও কেমোথেরাপির মধ্যেই এখন তার জীবন।
রাহিমুল জানান, রোগটি শনাক্ত হওয়ার সময় ক্যান্সার চতুর্থ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। তার স্বাস্থ্যবীমা হাসপাতালের কিছু ব্যয় বহন করলেও স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ও কেমোথেরাপির মতো বেশ কিছু খরচ নিজেদেরই মেটাতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে মোট আরও ছয়টি কেমোথেরাপি নিতে হবে। এর মধ্যে তিনটি শেষ হয়েছে। প্রতি দুই সপ্তাহ পরপর একটি করে কেমোথেরাপিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার।
চিকিৎসার এই খরচের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে PET স্ক্যান, বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়। অসুস্থতার কারণে রাহিমুল এখন কাজ করতে পারছেন না। তার স্ত্রী শিক্ষার্থী হওয়ায় সীমিত সময় কাজ করতে পারেন। ফলে চিকিৎসা ও সংসার—দুই ধরনের ব্যয় সামলাতে গিয়ে চাপে পড়েছে পরিবারটি।
রাহিমুলের ভাষায়, প্রতিটি দিন এখন ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভরা। তবু তিনি হাল ছাড়তে চান না। স্ত্রীকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান, পূরণ করতে চান তাদের দেখা স্বপ্ন। এজন্য মানুষের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
এদিকে সিডনিতে ২৬ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফারহান ইসলাম বর্তমানে মারাত্মক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ফারহান জানিয়েছেন, হঠাৎ এই কঠিন রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে ফারহান ও তাঁর পরিবার জীবনের অন্যতম কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফারহানের কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন। আশার বিষয় হলো, তাঁর এক চাচাতো ভাই কিডনি দান করতে সম্মত হয়েছেন। তবে এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় অত্যন্ত বেশি।
ফারহানের হেলথ ইনসুরেন্স তাঁর হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ কভার করলেও কিডনি দাতার হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় তাঁকেই বহন করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্যও প্রয়োজন হবে উল্লেখযোগ্য অর্থের।
বর্তমানে সিডনির লিভারপুল হাসপাতালের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে ফারহানের নিয়মিত চিকিৎসা চলছে। তাঁর জন্য প্রয়োজন হচ্ছে—বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ও নিয়মিত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, প্যাথলজি ও বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পরীক্ষা। সম্ভাব্য ডায়ালাইসিস ও অন্যান্য কিডনি চিকিৎসার ব্যয় কিডনি প্রতিস্থাপন ও দাতার সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ব্যয়সহ সব মিলিয়ে ফারহানের চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে প্রায় ৫০,০০০ অস্ট্রেলিয়ান ডলার সংগ্রহের প্রয়োজন হচ্ছে। ফারহান আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান এবং তাঁর স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চান। এই কঠিন সময়ে সামান্য সহযোগিতাও তাঁর জন্য হতে পারে অত্যন্ত মূল্যবান।
আরেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মাজেদ লড়ছেন সারকোমা ক্যান্সারের সঙ্গে। তাদের মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে ক্যান্সার, কিডনি জটিলতা, স্ট্রোক, হৃদরোগ কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ চিকিৎসার মধ্যে পড়েছেন।
গত মে মাসে মেলবোর্নের রয়্যাল হসপিটালে ব্রেইন টিউমারের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নওশিন নাওয়ার উর্বি। একই সময়ে মেলবোর্নে জরায়ুর ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে গিয়ে মারা যান সাবিনা ইসলাম সাথি।
বীমা থাকলেও দুশ্চিন্তা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় ওভারসিজ স্টুডেন্ট হেলথ কভার (ওএসএইচসি) বাধ্যতামূলক। কিন্তু গুরুতর রোগের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় বীমা সব ধরনের ব্যয় বহন করে না—এমন অভিযোগ রয়েছে। বিশেষায়িত চিকিৎসা, নির্দিষ্ট ওষুধ, পরীক্ষা, থেরাপি, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ অনেক সময় ব্যক্তিগতভাবে সামলাতে হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় আয়ের সংকট। পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ করা শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হয়ে পড়লে কর্মঘণ্টা কমে যায়, কখনো কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একদিকে আয় কমে, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় বাড়তে থাকে।
দূর দেশে অসুস্থতা, দেশে আরেক যুদ্ধ
অস্ট্রেলিয়ায় সন্তানের চিকিৎসা মানে বাংলাদেশে থাকা পরিবারের জন্যও নতুন সংকট। কেউ সঞ্চয় ভাঙছেন, কেউ ঋণ করছেন; কারও সামনে সম্পদ বিক্রির চিন্তাও আসছে। সন্তানের পাশে থাকার ইচ্ছা থাকলেও দূরত্ব ও নানা বাস্তবতায় অনেক পরিবার দ্রুত অস্ট্রেলিয়ায় আসতে পারেন না।
বিপদের দিনে কমিউনিটিই শেষ ভরসা
এই কঠিন সময়ে এগিয়ে আসছে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটি। সিডনি থেকে মেলবোর্ন, ব্রিসবেন থেকে অ্যাডিলেড, পার্থ থেকে ক্যানবেরা—বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশিরা অসুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য অনুদান সংগ্রহ করছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিউনিটির এই সহযোগিতাই হয়ে উঠছে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার প্রধান অবলম্বন।
প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মতে, কমিউনিটির মানবিক উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
তাদের দাবি, বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। ক্যান্সারসহ প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা অনুদান, জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার। একটি কার্যকর জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে হয়তো কোনো শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পড়াশোনা বন্ধ করতে হবে না। বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোর মাধ্যমে সংকটাপন্ন শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলারও দাবি উঠেছে। কারণ, হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও এসব তরুণের স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি। কেউ আবার বই হাতে শ্রেণিকক্ষে ফিরতে চান, কেউ চান প্রিয়জনের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন। বিদেশের মাটিতে অসুস্থতার এই লড়াই তাই শুধু রোগের বিরুদ্ধে নয়—এটি স্বপ্ন টিকিয়ে রাখারও সংগ্রাম।
