রংপুরে চার হত্যা মামলার তদন্তের ভার কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। জটিল আকার ধারণ করেছে হত্যা রহস্য। ময়নাতদন্তের আগে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার দাবি করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোম। তবে হত্যাকাণ্ডের শিকার কেউ ধর্ষণের শিকার নয়, এমনটি দাবি করেছেন হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ও মেট্রোপলিটন পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তসহ দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার আগামী চক্রবর্তীর দেহ থেকে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার দাবি করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডোম জয়তুন। তার সঙ্গে কথোপকথনের গোপন ভিডিও একটি বেসরকারি গণমাধ্যমে প্রচার হলে তোলপাড় শুরু হয়।
সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি অনেকদিন ধরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ কাটি। ময়নাতদন্তের জন্য এখানে চারটি লাশ আনা হলে আমি লাশগুলো কাটি। ডাক্তার আমাকে বলে দেখো তো কিছু আছে কিনা। আমি দেখি মেয়ের ভ্যাজাইনা থেকে বীর্য বেরোচ্ছে। তখন ডাক্তার বলছে রাখি দেও। আমি রাখি দিলাম। এর মধ্যে দুইটা ভ্যাজাইনা সোয়াব সিআইডি পুলিশ নিয়ে গেছে, দুইটা মেডিকেলে পরীক্ষা করার জন্য দিছে... গোপন কথা বাহিরে বলা যাবে না। তখন ডাক্তার রিপোর্ট লিখবে একটা, আমি বলবো একটা। ডাক্তার বলতে মানা করছে বলে বলতে পারলাম না।’
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের ইনচার্জ ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ধর্ষণের বিষয়ে আমরা কোনো সাইন পাইনি। আমরা যেসব সোয়াব মাইক্রোবায়োলজিতে পাঠিয়েছিলাম সেখানে ধর্ষণের কোনো সাইন পাওয়া যায়নি। সেই অর্থে আমরা বলতে পারি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আমরা লাশ থেকে কোনো ধর্ষণের আলামত পাইনি। এদিকে গতকাল রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় স্মরণসভা ও প্রার্থনা অনুষ্ঠান করেছে জিলা স্কুলের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। দুপুরে জিলা স্কুলের প্রশাসনিক ভবনের সামনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রিয় শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করেন।
চাঞ্চল্যকর চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলার তদন্ত দেয়া হয়েছিল রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জিকে। মঙ্গলবার এ মামলার তদন্তভার দেয়া হয় গোয়েন্দা বিভাগকে। নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবি’র পরিদর্শক জিনাত আলী। তিনি পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তা মিলন চ্যাটার্জির কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত বুঝে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা যায়, পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তির পর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়া যুবক মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। সিদ্ধার্থ আদালতে জানায়, তার বাড়ি শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া এবং গণপতি চক্রবর্তী তার বাপ-দাদাদের কাছ থেকে জমি কিনে বাড়ি করেছেন। সিদ্ধার্থ আগে মাঝে-মধ্যে ইয়াবা সেবন করতো। গত এক মাস ধরে প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার করে সে একটি করে ইয়াবা সেবন করে। সম্প্রতি তার বড় ভাইয়ের বিয়ে হওয়ায় গত ৬-৭ মাস ধরে সিদ্ধার্থ পার্শ্ববর্তী বিজয়দের বাড়িতে ঘুমায়। তবে গত এক মাস ধরে সিদ্ধার্থ বৃহস্পতিবার করে বন্ধু সীমান্তের বাড়িতে থাকে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ সীমান্তদের বাড়ি গিয়ে ৩টি ইয়াবা সেবন করে। এরপর রাত ৩টার দিকে তাদের ইয়াবা সেবনের ইচ্ছা হলে কামাল কাছনার মাদক কারবারি শান্তর কাছ থেকে আরও ৪টি ইয়াবা কিনে আনে।
এরপর দেবুদের বাসার ছাদে গিয়ে দেখে ছাদ ফাঁকা হওয়ায় বাতাস বইছিল। অপরদিকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে অর্ধেক দেয়াল রয়েছে। তাই দেবুদের ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে এসে পানির ট্যাংকের পাশে বসে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোরের আলো ফুটে আসে। সেই রাতে তারা দু’জন মিলে ৮টি ইয়াবা সেবন করে, যা তাদের জীবনে সর্বোচ্চ ইয়াবা সেবন। সকালে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলে এবং ধমক দেন। বলেন, তোরা এখানে কি করিস। মান-সম্মানের ভয়ে গণপতি চক্রবর্তীর ঘাড়ে থাকা গামছা দিয়ে দু’জন মিলে তাকে মেরে ফেলে। এরপর গণপতির মরদেহ ছাদে টিন দিয়ে ঢেকে রাখে তারা এবং পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। টিন দিয়ে ঢাকার সময় শব্দ হলে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে চলে আসে।
এ সময় মুগ্ধ গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতাকে সেই গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে এবং সিদ্ধার্থ আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখ চেপে ধরে। এতে ধস্তাধস্তি হয় এবং আগামী চক্রবর্তীকে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে কবুতরের খাঁচার কাছে থাকা রশি ও গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এরপর ছাদে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পুরাতন একটি প্লাস পেয়ে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করার জন্য বাড়ির নিচে গিয়ে বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়ে আবার ছাদে চলে আসে। প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর লাশ যেন দেবুদের বাড়ি থেকে দেখা না যায়, সেজন্য তারা সিঁড়ির কাছে দু’জনের লাশ নিয়ে আসে। এরপর দোতলায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ আসলে তারা দেখে প্রিয়ম কেবলমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। সিদ্ধার্থকে দেখেই প্রিয়ম বলে উঠে, সিদ্ধার্থ দা তুমি এখানে কি করো? প্রিয়মের শোবার রুমের পাশে ছিল দেবুদের বাসা। কেউ শুনে ফেলবে সেই ভয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ হাতের কাছে থাকা পেটিকোট ও বালিশ চাপা দিয়ে প্রিয়মকে হত্যা করে।
