২০২৬ সালের ৭ই আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ অদূর ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশ এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সিরিয়া এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। অন্যদিকে গত সপ্তাহে ইরানকে এই জোটে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত এক সপ্তাহে বাংলাদেশও ‘মক্কা চুক্তিতে’ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ এবং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা এই জোটে অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করতে প্রস্তুত।
উল্লেখ্য, তিন দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে চুক্তির পক্ষগুলো জোর দিয়ে বলেছে, এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। ‘মক্কা চুক্তি’র এসব মূলনীতি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এতে যোগ দিলে ঢাকা, রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের জন্য সম্ভাব্য সুবিধা-অসুবিধাগুলো বিশ্লেষণ করা যাক।
ঢাকার কী লাভ হবে?
‘মক্কা জোটে’ যোগ দিলে বাংলাদেশ একটি সম্মিলিত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাবে, যা নিঃসন্দেহে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি ইসলামী বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও আরও বিস্তৃত হবে। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সামনে রেখে সক্রিয়ভাবে কাজ করা বাংলাদেশের সরকারের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। কারণ বর্তমানে ঢাকার কোনো শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক জোট নেই। একই সঙ্গে এই জোটে যোগ দিলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে সম্পর্কের বৈচিত্র্য বাড়বে। এ ছাড়া চুক্তিতে যোগ দেয়ার ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের, সম্পর্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ সৌদি আরব ও তুরস্ক উভয়ই ওয়াশিংটনের মিত্র। এগুলো হলো সম্ভাব্য সুবিধা। তবে সম্ভাব্য অসুবিধার দিকও রয়েছে।
ঢাকার ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগ দেয়া ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত ইতিমধ্যে এই চুক্তিকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি নতুন কৌশলগত সংযোগ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। এরই মধ্যে, যথেষ্ট কারণ ছাড়াই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর একটি প্রচলিত প্রচেষ্টা বলে মনে হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের এই সামরিক জোটে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নয়াদিল্লি দ্রুত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, বাংলাদেশের এমন পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষক মহলও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছে। কয়েকজন বিশ্লেষকের দাবি, ইসলামাবাদ সক্রিয়ভাবে ঢাকাকে ‘মক্কা জোটে’ যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করছে এবং চুক্তির সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ নিতে চাইবে। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোটটি যেন ভারতের পূর্ব সীমান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত না হয়, তা ঠেকাতে নয়াদিল্লি বর্তমানে সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দিলে সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
আঞ্চলিক ভূদৃশ্যে পরিবর্তন
বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগদানের বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। কারণ একসময় যে দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তারা এখন একই আঞ্চলিক কাঠামোর- আরও নির্দিষ্টভাবে বললে, একই নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার হতে পারে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়। তৎকালীন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ এবং পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখত। নির্বাচনে বাঙালি রাজনৈতিক দলের বিজয়ের পর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী স্থানীয় বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।
ভারত প্রকাশ্যে বাঙালিদের পক্ষে যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয় এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এরপর কয়েক দশক ধরে গভীর বৈরিতা বজায় থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক দ্রুত উন্নত হতে শুরু করেছে। ঢাকায় নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশ রাজনৈতিক সংলাপ বাড়িয়েছে, সরাসরি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন চালু করেছে, ভিসা বিধিনিষেধ শিথিল করেছে এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ‘মক্কা চুক্তিতে’ যোগদানকে একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাব আরও বাড়াতে পারে।
আঙ্কারা ও রিয়াদের জন্য বাংলাদেশ কী নিয়ে আসবে?
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান সম্প্রতি আশরাক আল-আওসাতকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এমন একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে যে, এই অঞ্চলের সমস্যাগুলো নিজেদের সদস্যদেরই সমাধান করা উচিত। তার ভাষায়, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট গঠনের পরিবর্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সংহতি ও সম্মিলিত প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি কৌশলগত ইচ্ছার প্রকাশ। তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেয়া এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের মূল ধারণা হলো- একজনের নিরাপত্তাই সবার নিরাপত্তা। তুর্কি প্রেসিডেন্টের এই বার্তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দেয়া হলেও, বিশেষ করে ভারতের মতো যেসব দেশ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে বলে তুরস্ক মনে করে, তাদের জন্যও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ‘মক্কা চুক্তির’ আওতায় এলে তিন দেশের এই চুক্তি একটি বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোয় পরিণত হবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তুরস্কের কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার একটি নতুন বাজারে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম- বিশেষ করে মানববিহীন আকাশযান (ইউএভি বা ড্রোন)-রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে এই অঞ্চলে আঙ্কারার উপস্থিতিও বাড়বে। অন্যদিকে সৌদি আরবের জন্য বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তির অর্থ হবে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে চুক্তিটির প্রভাববলয় সম্প্রসারণ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা জোরদার এবং ইসলামী বিশ্বে সৌদি নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ সৌদি আরবের শ্রমবাজারে লাখ লাখ কর্মী সরবরাহ করে। ফলে চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে। সবকিছু বিবেচনায় নিলে বলা যায়, ‘মক্কা চুক্তিতে’ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এটি আর শুধু তিনটি দেশের জোট থাকবে না; বরং একটি বৃহত্তর ইসলামী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে। আর এমন একটি পরিবর্তন নিঃসন্দেহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বার্থকে আরও শক্তিশালী করবে।
(আজারবাইজানের অনলাইন ক্যালিবার থেকে অনুবাদ)
