জটিলতায় আটকে আছে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল এর গ্রিন স্টিল প্রকল্প

জটিলতায় আটকে আছে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল এর গ্রিন স্টিল প্রকল্প

ফন্ট সাইজ:

দেশে পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পিত শিল্পায়নের লক্ষ্যে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাই চট্টগ্রামে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম গ্রিন স্টিল প্রকল্প বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বিএমএসআইএল) এখন চরম অনিশ্চয়তায়। ৫ হাজার ৬৪১ কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হলেও ব্যাংক ঋণ ছাড়ে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা এবং বন্দরে আটকে থাকা যন্ত্রপাতির কারণে প্রকল্পটি কার্যত থমকে গেছে। প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে সাত হাজার কোটি ছাড়িয়েছে বলে জানায় সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল এর গ্রিন স্টিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 
প্রকল্পের পটভূমি:
প্রস্তাবিত প্রকল্পে আধুনিক ইতালিয়ান প্রযুক্তি ড্যানিয়েলি মিডা কিউএলপি মিনিমিল ব্যবহার করে উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয়ী ইউরোপীয় মান সম্পন্ন রড ও অন্যান্য আমদানি বিকল্প স্টিল পণ্য উৎপাদনের খরচ প্রায় টন প্রতি ৩ হাজার টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রথমবারের মতো দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়। প্রকল্প চালু হলে প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং আমদানি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
ঋণ ছাড়ে স্থবিরতা:
২০২২ সালে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে ৮টি ব্যাংক থেকে ২৩০৫ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ অনুমোদিত হলেও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নির্দেশানায় লীড ব্যাংক ঋণ বিতরণ না করায় অন্যান্য সদস্য ব্যাংকও ঋণ বিতরণ বন্ধ রাখে এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৪০ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে যা বর্তমানে সুদে আসল দাড়িয়েছে ৮২২.০০ কোটি। অবশিষ্ট ঋণ বিতরণ না হওয়ায় একদিকে প্রকল্পের অগ্রগতি যেমন থমকে গেছে তেমনি অন্যদিকে ঋণপত্র স্থাপনকারী ব্যাংকগুলো ডিমান্ড লোন সৃষ্টি করে আমদানি ব্যয় পরিশোধ করায় ঋণগুলো মন্দ ঋণে পরিণত হয়ে বাণ্যিজিক কার্যক্রম শুরুর আগেই হাজার কোটি টাকা ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরও সম্ভাবনাময় এই শিল্পটি রুগ্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সিন্ডিকেটেড ঋণ বিতরণ না হওয়ায় বন্দরে আটকে থাকা মেশিনের চালানের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর আমদানি বিল পরিশোধের প্রেক্ষিতে ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,৪৬০ কোটি টাকা। এখনি অতিদ্রুত কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নিলে ব্যাংক ও উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের জন্য ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসবে বলেও জানিয়েছে  সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল এর গ্রিন স্টিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। 

বন্দরে আটকে থাকা যন্ত্রপাতি:
জানা যায়,  চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ২৫০ কনটেইনারে ৫৩৪ কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি পড়ে আছে। ব্যাংকগুলো শিপিং ডকুমেন্ট ছাড় না দেওয়ায় এই যন্ত্রপাতি ছাড় হয়নি। ফলে বন্দর মাশুল ও ডেমারেজ চার্জ বেড়ে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে। এতে প্রকল্পের সময়সীমা অন্তত ১৮ মাস পিছিয়ে গেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার চাপ:
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১৫৯ কোটি টাকা। কিন্তু ডলার ও ইউরোর বিপরীতে টাকার মান ৩০.৩৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ঋণ অনুমোদনের সময় ডলারের দর ছিল ৮৬ টাকা, যা এখন প্রায় ১২৫ টাকা। এতে অতিরিক্ত ৯৮৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হয়েছে। একই সঙ্গে সুদের হার ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫.৫৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বিএমএসআইএল) এর উদ্যোক্তা সাফওয়ান সোবহান দেশে দ্রুত শিল্পায়ন ও বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১৭ সালে বসুন্ধরা গ্রুপ থেকে বের হয়ে বিপুল বিনিয়োগ করে নতুন নতুন অনেক শিল্প স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছেন। বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড (বিএমএসআইএল) এর প্রকল্প ঋণসহ সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবালের অধীন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ঋণও বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডাটা বেইস অনুযায়ী পৃথক ঋণগ্রহিতা সীমা হিসাবে মঞ্জুর করা হয় এবং বিতরণ করা হয়। যেখানে বসুন্ধরা গ্রুপের কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল এর ঋণ ও দেনাপাওনার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু হঠাৎ বিগত ১০ এপ্রিল, ২০২৫, বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকে এক নির্দেশনা প্রদান করে যেখানে সাদাত সোবহান ও সাফিয়াত সোবহান এর প্রতিষ্ঠানসহ বসুন্ধরা সংশ্লিষ্ট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে একই গ্রুপভূক্ত বিবেচনার জন্য বলা হয়। উক্ত নির্দেশনায় সাফওয়ান সোবহান ও তার কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম না থাকলেও অগ্রণী ব্যাংক ঋণ বিতরণ না করায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে বিনিয়োগ, শিল্প ও কর্মসংস্থানবান্ধব সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বসুন্ধরা সংশ্লিষ্ট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে ০৫ টি পৃথক গ্রুপ হিসাবে ভাগ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে অবহহিত করার নির্দেশনা প্রদান করে। সেই অনুযায়ী অগ্রণী ব্যাংক বসুন্ধরা সংশ্লিষ্ট ২০টি প্রতিষ্ঠানকে ৫ টি পৃথক গ্রুপে বিভক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকে বিগত ১১.০৩.২৬ তারিখে অবগত করলেও আজ অবদি ঋণ বিতরণ না করায় প্রকল্প বাস্তবায়ন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এদিকে সিন্ডিকেটভূক্ত ব্যাংকের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের বাস্তবায়নকালীন সময় ১৮ মাস বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ করা হলে বিগত ১২ মাসে মাত্র ০৪টি ব্যাংকে অনুমোদিত হয়। অবশিষ্ট ৪টি ব্যাংকে যেমন- জনতা ব্যাংক, রুপালী ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক এখনো প্রকল্পের বাস্তবায়নকালীন সময় বাড়ায়নি। ফলে সরবরাহকারী প্রকল্পের অবশিষ্ট যন্ত্রপাতির চালান জাহাজীকরণ করতে পারছে না। এতে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে ইউরোপের বিখ্যাত সরবরাহকারীর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।

ইউটিলিটি সংযোগে অতিরিক্ত ব্যয়:
সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রকল্প হওয়ায় প্রকল্পটির গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা বেজা কর্তৃক সরবরাহ করার কথা থাকলেও বিদ্যুতের ট্রান্সমিশন লাইন উদ্যোক্তাদের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। বিদ্যুৎ লাইনের জন্য প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা, জ্বালানি সরবরাহ লাইনে ২৫২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সন্দ্বীপ চ্যানেলে জেটি নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও তা শুরু হয়নি।
সম্ভাবনা ও হুমকি:
দেশের অবকাঠামো নির্মাণে স্টিলের চাহিদার ৬৫ শতাংশ এই ধরনের প্রকল্প থেকে মেটানো সম্ভব। ২০৩০ সালের মধ্যে মাথাপিছু স্টিল ব্যবহারের পরিমাণ ১০০ কেজির বেশি হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে হাজার হাজার কর্মসংস্থান হারাবে এবং আমদানি বিকল্প উৎপাদন শুরু হবে না। উদ্যোক্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশি উদ্যোক্তারা যদি হোঁচট খান, তাহলে বিদেশি উদ্যোক্তারা কেন আসবেন?
জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান:
এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার সাহেদ জাহিদ বলেন, হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে আমরা এখন চরমভাবে শঙ্কিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে যত বিলম্ব হবে, ব্যয় তত বাড়বে। তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থান হারাবে, চুক্তি ভঙ্গ হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ব্যাংকগুলোও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়বে।
বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্পে নতুন যুগের সূচনা করতে পারত এই গ্রিন স্টিল প্রকল্প। কিন্তু ব্যাংক ঋণ ছাড়ে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা ও বন্দরে আটকে থাকা যন্ত্রপাতির কারণে প্রকল্পটি এখন কার্যত হুমকীর মুখে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের সবচেয়ে বড় স্টিল কারখানা নির্মাণের স্বপ্ন ভেঙে পড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নষ্ট হবে।