প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার নয় বছর পূর্ণ হয়েছে ২৫ আগস্ট। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বর্বরোচিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হয়ে রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসেন তারা। কক্সবাজারে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শরণার্থী শিবিরে বর্তমানে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অত্যন্ত মানবেতর ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। তবে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিজ বাসভূমে নিরাপদ ও স্থায়ী প্রত্যাবাসন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রোহিঙ্গাদের জন্য ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের অমানবিক নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাই প্রথম নয়। বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত বঞ্চনার অংশ। এর আগে ১৯৭৮ সালে প্রায় ২ লাখ এবং ১৯৯১-৯২ সালে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রতিবারই নাগরিকত্ব, মৌলিক মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করেই মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে, ইতিহাস বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখেছে এবং অধিকারহীন রোহিঙ্গারা বারবার বিতাড়িত হওয়ার একই দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে।
জাতিসংঘ, পশ্চিমা বিশ্ব, দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো শুরু থেকেই এই সংকটকে কেবল একটি মানবিক সংকট হিসেবে মূল্যায়ন করে আসছে। কিন্তু এই সংকট মূলত একটি গভীর রাজনৈতিক সংকট। দাতারা একদিকে যেমন ত্রাণ ও তহবিল সহায়তা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে আত্মনির্ভরশীলতার কথা বলছে। কিন্তু মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার, কাজ করার সুযোগ, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং শিক্ষার অধিকার না দিয়ে কেবল ত্রাণ সহায়তার ওপর নির্ভর করিয়ে রোহিঙ্গাদের স্বাবলম্বী হওয়ার আহ্বান জানানো চরম অবাস্তব। বিষয়টিকে হাত-পা বেঁধে কাউকে সাঁতার কাটতে বলার মতোই। মানবিক সংস্থাগুলো শুধু সাময়িকভাবে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বর্তমানে আরও জটিল রূপ নিয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং তাদের জন্মভূমি নিয়ন্ত্রণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কারণে। ১৯৮২ সালের যে বর্ণবাদী ব্যবস্থা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল এবং রাষ্ট্রহীন করেছিল, সেই একই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে পুরো মিয়ানমারজুড়ে সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন ও বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে। রাষ্ট্রহীনতার কারণেই আজ রোহিঙ্গারা মানব পাচার, যৌন সহিংসতা, শিশু অপহরণ ও জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগের মতো ভয়ংকর পরিস্থিতির শিকার হচ্ছে। তাই মিয়ানমারের সামগ্রিক রাজনৈতিক মুক্তি এবং জনগণের স্প্রিং রেভল্যুশন-এর লক্ষ্য অনুযায়ী একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই রোহিঙ্গাদের স্থায়ী প্রত্যাবাসনের একমাত্র চাবিকাঠি।
মিয়ানমারের জনগণ আজ যে স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, তার সাথে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রোহিঙ্গাদের সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। প্রথমত, ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের অবিলম্বে কাজ করে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ দিতে হবে। যেন তারা নিজেদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, টেকসই প্রত্যাবাসনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য ক্যাম্পে রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের অধিকার, তরুণদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং শিশুদের বর্মি পাঠ্যক্রমে শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মাতৃভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির খাদ্য সহায়তাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক তহবিল অব্যাহত রাখতে হবে।
পরিশেষে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা যেন অবিলম্বে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাকে এড়িয়ে এই সংকটে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপ ও হস্তক্ষেপে এগিয়ে আসে। সামরিক জান্তার সাথে সব ধরনের সম্পৃক্ততা বর্জন করে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আসিয়ানকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক: লাকি করিম একজন রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী, রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনালের একজন ফেলো এবং রিফিউজি উইমেন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস (আরডব্লিউপিজে)-এর প্রতিষ্ঠাতা।
