দেশে দেশে সরকারপ্রধানরা কেন কানকথা শোনেন

দেশে দেশে সরকারপ্রধানরা কেন কানকথা শোনেন

ফন্ট সাইজ:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুগম্ভীর পণ্ডিতরা যতই সংবিধানের ভারসাম্য, নীতি-নির্ধারণ আর সুশাসনের রূপরেখা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা করুন না কেন, ক্ষমতার আসল রসায়ন লুকানো থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জৈবিক প্রত্যঙ্গে। সিংহাসনে যিনি বসেন, তাঁর চোখের দৃষ্টি দিগন্ত পার হতে না পারলেও চলে। কিন্তু তাঁর কানের দৈর্ঘ্য হওয়া চাই আকাশচুম্বী। রাজনীতিতে প্রবাদ আছে যে, দেওয়ালেরও কান থাকে। তবে ক্ষমতার মসনদে দেওয়ালের চেয়েও বড় কানটি থাকে খোদ শাসকের। আমাদের দেশেও সরকারপ্রধানরা কানকথা শুনে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নেন। এই কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গেলে বিশ্ব ইতিহাসের সুদীর্ঘ অলিন্দ ধরে একটু হাঁটাহাঁটি করা প্রয়োজন। কারণ রাজনীতিতে কানকথা শোনা কোনো তাৎক্ষণিক চারিত্রিক দুর্বলতা নয়। এটি অনেকটাই ক্ষমতার রাজপ্রাসাদে টিকে থাকার জন্য যুগে যুগে চর্চিত ধ্রুপদী ও নান্দনিক শিল্পকলা।
বাস্তবতা হলো, একজন সাধারণ গেরস্তের কাছে যা 'পরনিন্দা' কিংবা নিতান্ত পাড়াতুতো কুটনামি, রাজদরবারে তা-ই 'অভ্যন্তরীণ বিশেষ মূল্যায়ন' বা 'উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পর্যবেক্ষণ'। ক্ষমতার চূড়ায় ওঠা মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত একাকীত্বের বৃত্তে বাঁধা পড়ে। যত মানুষ কাছে আসে, সবার মুখেই যখন অতিভক্তির অমল হাসি, তখন মনের গভীরে এক ধরনের সূক্ষ্ম সংশয় বাসা বাঁধে। এই প্রবল স্তুতিবাক্যের ভিড়ে কোনটা খাঁটি আর কোনটা চামচামি, তা যাচাই করতে গিয়ে অবচেতনভাবেই নেপথ্যের ফিসফিসানিকে সবচেয়ে নিখাদ তথ্য বলে মনে হতে থাকে। পারিষদ ও চামচাকুলও এই মনস্তাত্বিক শূন্যতা খুব ভালো বোঝে। তারা জানে, তরবারি দিয়ে যা জয় করা যায় না, নেতার কানের গহ্বরে এক ফোঁটা চাটুকারিতার বিষ ঢেলে দিলে তার চেয়ে দশ গুণ দ্রুত কার্যোদ্ধার সম্ভব।
ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের সেরা সেরা সাম্রাজ্যের ভাগ্য বদলে গেছে কোনো না কোনো অদৃশ্য ফিসফিসানিতে। প্রাচীন রোমে খোদ জুলিয়াস সিজার যদি বিরোধী সিনেটরদের চাপা অসন্তোষ আর গুজবের খবরকে কানকথা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিতেন, তবে সিনেটের পাথুরে মেঝেতে তাঁর এমন রক্তাক্ত প্রস্থান ঘটত না। ওদিকে শেক্সপিয়রের 'ওথেলো' নাটকের ট্র্যাজেডি তো কোনো আকাশভাঙা দুর্যোগ ছিল না; খলনায়ক ইয়াগো সেনাপতি ওথেলোর কানে কেবল একটু একটু করে সন্দেহের বিষ ঢেলেছিল, আর তাতেই গোটা মসনদ তছনছ হয়ে গিয়েছিল। রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াস তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর সেজানুসের কানকথার ওপর এমন চোখ বুজে নির্ভর করতেন যে, সেজানুস নিজের প্রতিটি ব্যক্তিগত শত্রুকে রাষ্ট্রের শত্রু বানিয়ে সম্রাটের কান দিয়ে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন।
প্রাচ্যের দরবারে এই শ্রবণশিল্প আরও বেশি রমরমা ছিল। চাণক্যের 'অর্থশাস্ত্র' তো ছদ্মবেশী সন্ন্যাসী ও বারবনিতাদের দিয়ে প্রজাদের খাস কামরার কানকথা সংগ্রহের বিজ্ঞানসম্মত পাঠশালা খুলে বসেছিল। মোগল সালতানাতে বাদশাহ আকবরের সভাসদরা বীরবলকে ল্যাং মারার জন্য কত শত মুখরোচক কানকথা বাদশাহর নাস্তাপর্বে পরিবেশন করতেন, তার কোনো লিখিত দলিল নেই। নূরজাহানের অলিখিত রাজত্ব, শাহজাহানের শেষ জীবনে ভাইদের মধ্যে রক্তগঙ্গা আর আওরঙ্গজেবের কড়া নজরদারির সিংহাসন-সবকিছুর নিচে কানভাঙানির এক বহমান নদী বয়ে যেত।
পশ্চিমা বিশ্বেও এই ঐতিহ্যের কমতি ছিল না। ফরাসি সম্রাট চতুর্দশ লুইয়ের ভার্সাই প্রাসাদ তো ছিল রূপকথার এক বিশাল 'কানকথা বিপণি'। সেখানে ডিউকরা সুগন্ধি মেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরঘুর করতেন রাজার কান লক্ষ্য করে। কার চোখের পলক বেশি কাঁপল আর কার করমর্দনে আনুগত্যের ঘাটতি ছিল, সেসব রাজকীয় কানকথার ওপর নির্ভর করে বহু লর্ডের জমিদারি হাওয়া হয়ে যেত। এমনকি সাবেক সোভিয়েতের ক্রেমলিনে জোসেফ স্তালিনের যুগে গোটা প্রশাসনই চলত কানকথার জোরে। কমরেডরা রাতে ঘুমানোর সময়ও ভয়ে কাঁপতেন-স্বপ্নে দলের বিরুদ্ধে কোনো বিড়বিড়ানি যদি খাস কামরায় পৌঁছে যায়, তবে সকালের নাস্তা জুটবে সোজা সাইবেরিয়ার বরফে।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক গণতন্ত্রে কানকথার আবেদন কিন্তু একবিন্দুও কমেনি। বরং এর আধুনিক কর্পোরেট রূপান্তর ঘটেছে। এখন আর দরবারে গিয়ে হাঁটু গেড়ে ফিসফিস করতে হয় না। এখন কানকথা আসে ফাইলে মুড়ে 'লবিং নোট' হিসেবে, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের চতুর স্ক্রিনশটে কিংবা আড্ডার টেবিলের 'অফ দ্য রেকর্ড' মুখরোচক বিশ্লেষণে।
আমাদের দেশেও সরকারপ্রধানদের ক্ষেত্রে এই সমীকরণটি কেমন দাঁড়ায়, তা কল্পনা করা খুব কঠিন নয়। সকালে একনিষ্ঠ এক পারিষদ মুখে দুনিয়ার তাবৎ ষড়যন্ত্রের আতঙ্ক ফুটিয়ে হয়তো এসে দাঁড়ালেন। চেয়ারে সামান্য ঝুঁকে তিনি খুব নিচু গলায় বলতে পারেন যে, অমুক জেলার অমুক প্রভাবশালী নেতা জনসভায় নেতার নামে স্লোগান দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মাইকের ভলিউম অন্য বক্তাদের চেয়ে তিন ডেসিবেল কম ছিল।
আরেক তরুণ নেতা আইপ্যাডের স্ক্রিন সামনে তুলে ধরে দেখাতে পারেন যে, অমুক জেলার সাধারণ সম্পাদক নেতার দীর্ঘ বক্তব্যের লাইভ ভিডিও শেয়ার করেছেন বটে, কিন্তু ক্যাপশনে কোনো আগুনের বা ভালোবাসার ইমোজি দেননি-যার নিহিত অর্থ হলো তাঁর আনুগত্যে কিছুটা মরচে ধরেছে। এমনকি কোনো বিশেষজ্ঞ যদি দলে আধুনিক কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে আসেন, অমনি দরবারের পুরোনো পাহারাদাররা ফিসফিস করে বলে উঠতে পারে যে, এই তরুণের আসল ধান্দা হলো নেতাকে তাঁর ত্যাগী ও অন্ধ সমর্থকদের বলয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।
রাজনীতিতে একজন কাঁচা নেতার সঙ্গে পাকা দাবাড়ুর তফাৎ তৈরি হয় এই কানকথা ব্যবস্থাপনার দক্ষতায়। নেতা যদি কানকথা শুনেই তৎক্ষণাৎ চোখ লাল করে সিদ্ধান্ত নিতে যান, তবে তাঁর দল বা সরকার ধসে পড়তে বেশি সময় লাগবে না। পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের মস্তিষ্কে একটি স্বয়ংক্রিয় 'পলিটিক্যাল নয়েজ-ক্যান্সেলেশন' ফিল্টার বসানো থাকে। তাঁরা কানকথা শোনেন পরম কৌতূহল নিয়ে। মুখে কোনো ভাবান্তর আসতে দেন না, যাতে চাটুকার বুঝতে না পারে তার ছুড়ে দেওয়া তীর লক্ষ্যভেদ করেছে কি না।
চতুর নেতা কানকথাকে দেখেন কাঁচা মরিচের মতো। একবারে বেশি চিবিয়ে ফেললে বুক জ্বলবে। কিন্তু খাবারে একদম না দিলে রাজনীতিটাই পানসে ঠেকবে। তাই তাঁরা কানভাঙানি নিয়ে আসা মানুষটিকে দিয়েই হয়তো তাঁর প্রতিপক্ষকে নানা রাজনৈতিক কাজে ব্যস্ত রাখেন। আবার দিনশেষে কোনো পক্ষকেই কানকথার চূড়ান্ত ফায়দা লুটতে দেন না।
দিনশেষে দেওয়ালের যেমন কান থাকে, তেমনি নেতার কানের ওপর পুরো রাজনৈতিক ইকোসিস্টেমের নজর থাকে। কানকথা শোনা কোনো অপরাধ নয়। ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার অপরিহার্য জ্বালানি। আসল কেরামতি হলো হাজারো বিষাক্ত ফিসফিসানি ও চামচামির ভেতর থেকে আসল সুরটি চিনে নেওয়া এবং কানকথা শুনেও এমন ভান করে থাকা যেন- তিনি কিছুই শোনেননি। অথচ পুরো নাটকের প্রতিটি অঙ্কের সংলাপ তাঁর নখদর্পণে মুখস্থ।