একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু শিল্প, অবকাঠামো কিংবা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে না। এর অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। মানুষ যত সুস্থ থাকবে, তত বেশি সময় কাজে যুক্ত থাকতে পারবে, উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় কমবে। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা, চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা সরাসরি শ্রমঘণ্টা নষ্ট করে এবং পরিবারের সঞ্চয় কমিয়ে দেয়। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে না দেখে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে দেখার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করতে চাইলে স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশ করতে হবে। এ জন্য সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই অর্থ জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশের সমান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানান, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও রোগ নির্ণয়কেন্দ্রকে মানসম্মত সেবার আওতায় আনার পাশাপাশি সেবার মূল্য ও রোগীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার নজর দিচ্ছে। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সহযোগিতা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সুফল সরাসরি অর্থনীতিতে পড়ে। একজন সুস্থ শ্রমিক বেশি সময় কর্মক্ষম থাকেন। একজন সুস্থ কৃষক, পোশাকশ্রমিক, উদ্যোক্তা কিংবা অফিসকর্মী-র বেশি কর্মক্ষমতা থাকে। অন্যদিকে, অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হলে উৎপাদন কমে যায়।পরিবারের বড় অংশের আয় চিকিৎসায় চলে গেলে ভোগ, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ-সবই বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্যতথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে রোগীর বারবার একই পরীক্ষা করার প্রয়োজন কমবে, চিকিৎসকের কাছে আগের রোগের ইতিহাস দ্রুত পাওয়া যাবে এবং রোগীকে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় কমানো গেলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—দুই পক্ষেরই অর্থ সাশ্রয় হবে।
স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারপারসন ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবাকে শুধু রোগীর চিকিৎসার বিষয় হিসেবে দেখলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বড় অংশই অদেখা থেকে যাবে। সিএসইআরের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য খাত একই সঙ্গে একটি সামাজিক সেবা এবং বড় অর্থনৈতিক খাত। হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসা, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা প্রযুক্তি, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত জনবল ও গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়লে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যে অর্থ চলে যায়, তার একটি বড় অংশ দেশেই রাখা সম্ভব হবে। সাকিফ শামীম বলেন, এই মুহূর্তে আধুনিক চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি ও অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসার সুব্যবস্থা ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দিতে আঞ্চলিক বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগকে নীতিগত সহায়তা দিলে স্বাস্থ্য খাতে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। কোন এলাকায় কী ধরনের হাসপাতাল প্রয়োজন, কত শয্যা দরকার, কী ধরনের চিকিৎসক ও নার্স প্রয়োজন এবং কী ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি লাগবে এসবের ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালা প্রয়োজন। হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানি, চিকিৎসা প্রযুক্তি, মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট নীতিগত কাঠামো দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. রুমানা হক মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো ইতিবাচক হলেও শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না; সেই অর্থ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে দারিদ্র্য কমানো, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে রোগের জটিলতা কমবে এবং পরবর্তী পর্যায়ের ব্যয়বহুল চিকিৎসার চাপও কমানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ মানবসম্পদও প্রয়োজন। সেই মানবসম্পদের প্রথম শর্ত সুস্থ থাকা। তাই স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানে শুধু হাসপাতাল তৈরি নয়; এটি শ্রমশক্তির সক্ষমতা বাড়ানো, কর্মঘণ্টা রক্ষা করা, পরিবারের আর্থিক ঝুঁকি কমানো এবং নতুন শিল্প ও সেবাখাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
স্বাস্থ্যসেবায় পিপিপি অংশীদারিত্ব নিয়ে সিএসইআরের বিশ্লেষণ:
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর) এর চেয়ারপারসন, অর্থনীতিবিদ ও ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম স্বাস্থ্যসেবায় পিপিপি অংশীদারিত্ব নিয়ে একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। ওই বিশ্লেষণে তিনি জানান, স্বাস্থ্যসেবা একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি দেশের মানুষ কতটা সুস্থ, কতটা সহজে চিকিৎসা নিতে পারছে এবং আধুনিক চিকিৎসা কতটা মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে, তার ওপর দেশের উৎপাদনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক জীবনমান অনেকাংশে নির্ভর করে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসা অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা, উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক চিকিৎসার সীমিত সুযোগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব অত্যন্ত জরুরী। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু রাষ্ট্রের একার পক্ষে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিটি স্তরে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সেবা নিশ্চিত করা কঠিন। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের রয়েছে বিনিয়োগ সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং দ্রুত সেবা সম্প্রসারণের অভিজ্ঞতা। এই দুই শক্তিকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যাশা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। মানুষ এখন চিকিৎসার পাশাপাশি দ্রুত রোগ নির্ণয়, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষায়িত চিকিৎসা, উন্নত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রত্যাশা করে। ক্যানসার, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিসসহ জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এসব রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অবকাঠামো। একই সময়ে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা পায় না। ফলে রোগীদের রাজধানী বা বড় শহরমুখী হতে হয়। এতে চিকিৎসার ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি রোগী ও পরিবারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া জরুরি। এর জন্য সরকারি হাসপাতাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে সঠিক নীতিমালার আওতায় স্বাস্থ্য খাতে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা Public-Private Partnership (PPP) অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। এখানে সরকারের ভূমিকা হবে নীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ, মান নিশ্চিতকরণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রণোদনা প্রদান এবং সবার জন্য সেবার সুযোগ নিশ্চিত করা। বেসরকারি খাত তার বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং সেবা প্রদানের সক্ষমতা নিয়ে অংশগ্রহণ করবে।
উদাহরণ হিসেবে জেলা পর্যায়ে PPP মডেলে বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা যেতে পারে। কোনো একটি জেলা বা অঞ্চলে যেখানে ক্যানসার, কিডনি, হৃদরোগ বা অন্যান্য বিশেষায়িত চিকিৎসার চাহিদা রয়েছে, সেখানে সরকার জমি, অবকাঠামো বা অন্যান্য সুবিধা প্রদান করতে পারে এবং বেসরকারি খাত হাসপাতাল নির্মাণ, প্রযুক্তি, জনবল ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে পারে। এর মাধ্যমে সরকারি সম্পদের ওপর চাপ কমবে এবং জনগণও তাদের আবাসস্থলের নিকটবর্তী জায়গায় উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাবে।
স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত চিকিৎসা ব্যয়কে মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা। একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি সেবা গ্রহণের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
এক্ষেত্রে সরকার নির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসা ও সেবার জন্য PPP হাসপাতালগুলোতে subsidized treatment বা নির্ধারিত মূল্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সরকারি ভর্তুকি, স্বাস্থ্য কার্ড বা insurance-based payment system চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বেসরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন: স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের উদ্দেশ্য যেমন ব্যবসায়িকভাবে টেকসই হওয়া, তেমনি রাষ্ট্রের লক্ষ্য হতে হবে জনস্বার্থ ও সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই সফল PPP মডেলের মূল শর্ত।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার বড় একটি দুর্বলতা হলো চিকিৎসাব্যবস্থার অসম বণ্টন। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে আধুনিক হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হলেও জেলা পর্যায়ে এই সুযোগ সীমিত। এ অবস্থার পরিবর্তনে জেলা-ভিত্তিক health hub তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি অঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যানসার চিকিৎসা, কার্ডিয়াক কেয়ার, কিডনি চিকিৎসা, আইসিইউ, ডায়াগনস্টিক সেবা, মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং ইমার্জেন্সি কেয়ারের সুবিধা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সরকার চাইলে প্রয়োজনীয় জমি, অবকাঠামো, কর সুবিধা বা অন্যান্য নীতিগত সহায়তা দিতে পারে। বেসরকারি খাত সেখানে হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বিশেষায়িত চিকিৎসা অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে। এর ফলে ঢাকামুখী রোগীর চাপ কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
আগামী দিনের স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তিনির্ভর হবে। Artificial Intelligence, telemedicine, digital health records, remote diagnostics এবং data-driven healthcare ব্যবস্থাকে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সব ধরনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সবসময় উপস্থিত রাখা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসককে রাজধানীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। একইভাবে আধুনিক diagnostic technology ব্যবহার করে দূরবর্তী এলাকা থেকেও রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি করা যায়। সরকার প্রয়োজনীয় digital health infrastructure ও regulatory framework তৈরি করতে পারে। বেসরকারি খাত সেখানে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও innovation নিয়ে আসতে পারে। এতে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি সময় ও খরচও কমানো সম্ভব হবে। স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানবসম্পদ ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। একজন সুস্থ মানুষ বেশি সময় কর্মক্ষম থাকেন, উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং পরিবারের চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কমে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগের দিকে এগোচ্ছে, তখন একটি সুস্থ ও দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রয়োজন। তাই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতিমালা প্রয়োজন। হাসপাতাল নির্মাণ, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি আমদানি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, মেডিকেল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট নীতিগত কাঠামো থাকলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আরও বাড়তে পারে।
ঢাকায় যে চিকিৎসা পাওয়া যায়, ধীরে ধীরে সেই চিকিৎসার মানসম্মত সুযোগ জেলা পর্যায়েও পৌঁছে দিতে হবে।
সবার জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পরিবর্তে অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। সরকার দিতে পারে নীতি, নিয়ন্ত্রণ, প্রণোদনা ও জনস্বার্থের নিশ্চয়তা। বেসরকারি খাত দিতে পারে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা। এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হতে পারে একটি টেকসই ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে পরবর্তী বড় অগ্রগতি আনতে হলে আমাদের হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার মান, প্রযুক্তির ব্যবহার, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং চিকিৎসার আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব সেই পরিবর্তনের একটি কার্যকর পথ হতে পারে। সঠিক নীতি, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে এই অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলে উন্নত চিকিৎসা আর কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও নিজের কাছাকাছি মানসম্মত চিকিৎসার সুযোগ পাবে। আর তখনই স্বাস্থ্যসেবা সত্যিকার অর্থে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য, মানসম্মত ও টেকসই হয়ে উঠবে।
