প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত সরকারের ভালো কাজে সহযোগিতা করবে এবং জনস্বার্থবিরোধী কাজে প্রতিবাদ জানাবে। তবে সেই বিরোধিতা হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক। তিনি বলেন, অতীতের মতো অসহিষ্ণু, অস্থিতিশীল বা সহিংস পথে না গিয়ে সংসদকে কার্যকর রাখা এবং দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চায় জামায়াত।
সোমবার বেলা ১২টায় প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার আমন্ত্রণে দেশের প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদকদের সম্মানে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষ হয়েছে। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জাতীয় সমস্যা, জনদুর্ভোগ, জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন নিয়ে তৈরি সংকট, সংসদে জামায়াত ইসলামী তথা ১১ দলীয় ঐক্যের ভূমিকা এবং বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, সংসদে জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে নীতি, তা আমাদের আমীর সংসদের ভেতরে-বাইরে বলে আসছেন। আমরা একটি দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব। প্রচলিত প্রথাগত বিরোধী দলের রাজনীতিতে যে খারাপ ঐতিহ্য ছিল, তা ভেঙে দেশের স্থিতিশীলতা, রাজনীতি ও গণতন্ত্রের উত্তরণে ভালো কাজে সরকারকে সহযোগিতা করব। আর সব মন্দ ও জনস্বার্থবিরোধী কাজে প্রতিবাদ করব।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এই নীতি সম্পাদকদের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। সম্পাদকদের মধ্য থেকেও জামায়াতের এই পার্লামেন্টারি পলিসিকে প্রশংসা করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, গঠনমূলকভাবে দেশকে স্থিতিশীল রেখে সরকারকে বিরোধিতার জায়গায় বিরোধিতা এবং সহযোগিতার জায়গায় সহযোগিতা করে একটি বিরোধী দল যে বৃহৎ ভূমিকা পালন করতে পারে, এটি আমরা প্রথম দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমাদের আমীর সম্পাদকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সব অন্যায়, গণবিরোধী ও জনস্বার্থবিরোধী কাজে আমরা সবসময় প্রতিবাদ জানিয়ে যাব। তবে আমাদের বিরোধিতা ও প্রতিবাদ হবে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলক।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও সম্পাদকদের সঙ্গে আমিরে জামায়াতের প্রশ্নোত্তর ও মতবিনিময় হয়েছে। জামায়াতের বিভিন্ন নীতি ও অবস্থান, যা আমীর বিভিন্ন সময়ে জনসভা ও সংসদে তুলে ধরেছেন এবং গতকাল ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে বলেছেন, সেগুলোও আলোচনায় এসেছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পাদকরা পরামর্শ দিয়েছেন—আপনারা বিরোধিতা করবেন গঠনমূলকভাবে, আলোচনা করবেন এবং জনগণের দাবি নিয়ে প্রয়োজন হলে রাজপথেও থাকবেন। তবে আগের বিরোধী দলের মতো অসহিষ্ণু, অস্থিতিশীল বা সহিংস কোনো পথে গিয়ে দেশকে আর অস্থিতিশীল করবেন না।
তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের নেতা ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা প্রথমবারের মতো জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও খোলামেলাভাবে মতবিনিময় করেছেন। সম্পাদকরা এতে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তারা বলেছেন, এ ধরনের সুযোগ পেলে মাঝে মাঝে তারা নিজেদের মতামত দিতে পারবেন।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গে বৈষম্য, উন্নয়নকাজে বরাদ্দ ও বণ্টন, সংসদের ফ্লোরে কথা বলার সুযোগ, আইন প্রণয়ন ও বিভিন্ন নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ধরনের আচরণ করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, গণভোটের গণরায় কার্যকর করা, দ্রব্যমূল্য, প্রবাসীদের অধিকারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াত সংসদে কী ভূমিকা পালন করেছে, তা সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরেছেন আমীর।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, সংসদে স্পিকার অথবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা অনেক ক্ষেত্রে ইনসাফপূর্ণ আচরণ পাইনি। বরং বিভিন্ন জায়গায় আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি। এসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। সাংবাদিক ও সম্পাদকরা তাদের লেখনী ও সাংবাদিকতার মাধ্যমে জাতির কাছে সত্য তথ্য তুলে ধরেন। গণতন্ত্রের উত্তরণে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে সহযোগিতা করার জন্য আমাদের আমীর সম্পাদকদের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন।
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদে অতীতে বিরোধী দল কীভাবে দেশকে অস্থিতিশীল ও সংসদকে অকার্যকর করেছে, সম্মানিত সম্পাদকরা সেই ইতিহাস স্মরণ করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান যে ব্যতিক্রম, সেটিও তারা প্রশংসা করেছেন। আমরা সংসদকে কার্যকর রাখতে চাই। তবে একটি কনস্ট্রাক্টিভ ও রেসপন্সিবল অপজিশন হিসেবে আমরা দায়িত্ব পালন করতে চাই।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরাও বলেছি, সরকারের দায়িত্বে যারা আছেন তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু বিরোধী দল একা সব দায়িত্ব নিয়ে দায়িত্বশীল হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের পক্ষ থেকেও সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। এসব বিষয় নিয়েই আজকের মতবিনিময় সভায় আলোচনা হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সময়ের আলোর সৈয়দ শাহ নেওয়াজ করিম, নয়া দিগন্তের সালাহ উদ্দিন বাবর, বাণিজ্য প্রতিদিনের গিয়াস উদ্দিন, যায়যায়দিনের শফিক রেহমান, দেশ রুপান্তরের মুস্তাফিজ শফি, খবরের কাগজের মোস্তফা কামাল, বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, আজকের পত্রিকার কামরুল হাসান, ঢাকা মেইলের হারুন জামিল, প্রতিদিনের বাংলাদেশের সম্পাদক মারুফ কামাল খান সোহেল, ইনকিলাবের এ এম এম বাহাউদ্দীন, আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, মানবকন্ঠের সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, আগামীর সময়ের সম্পাদক মোস্তফা মামুন, ভোরের ডাকের কে এম বেলায়েত হোসেন, কালবেলার সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ডেইলি ইভিনিং নিউজের এবিএম সেলিম আহমেদ, দৈনিক এদিনের মোস্তফা কামাল মজুমদার।
