মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ: কৌশলগত সুযোগ, না নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি?

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশ: কৌশলগত সুযোগ, না নতুন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি?

ফন্ট সাইজ:

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা নিছক একটি সামরিক চুক্তিতে যোগ দেওয়া বা না দেওয়ার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ অভিমুখ, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণ, মুসলিম বিশ্বের পরিবর্তিত ভূরাজনীতি এবং ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের ভারসাম্য।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অথবা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে ঢাকা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্যব্যবস্থা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এই বক্তব্যের ভাষা সতর্ক ও কূটনৈতিক। সম্ভাবনা বিবেচনার অর্থ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। তবে এমন একটি কাঠামো নিয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখানোও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যহীন নয়। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ তার কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিসর সম্প্রসারণ করতে চায় এবং প্রচলিত কয়েকটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল না থেকে নতুন বিকল্প অনুসন্ধান করছে।

মুসলিম বিশ্বের নতুন নিরাপত্তা বলয়

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্য এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। এই নীতি অনেকটাই ন্যাটোর অনুচ্ছেদ পাঁচের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনুরূপ।

এর পাশাপাশি চুক্তিতে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক সমন্বয়, যৌথ মহড়া, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিমান প্রতিরক্ষা, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সামরিক সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি দেশকে এই কাঠামোয় যুক্ত করার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, যার রয়েছে বৃহৎ সামরিক বাহিনী ও দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে সৌদি আরবের আছে বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, জ্বালানি সম্পদ এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক প্রভাব।

এই তিন শক্তির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের নিরাপত্তার মধ্যে একটি নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ সেই কাঠামোর অংশ হলে তার আন্তর্জাতিক অবস্থানেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ থেকে বহুমুখী অংশীদারিত্ব

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ নীতিটি আজও প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে শুধু বন্ধুত্বের ঘোষণা দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব নয়। বিশ্ব এখন পরাশক্তির প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক যুদ্ধ, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, বাণিজ্যিক বিভাজন, সাইবার হুমকি এবং প্রযুক্তিগত আধিপত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একদিকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে; অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য মুসলিম দেশের সঙ্গে নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে হচ্ছে। এটিকে প্রচলিত অর্থে কোনো একটি শিবিরে যোগদান না বলে বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব বলা যেতে পারে।

মক্কা চুক্তির প্রতি ঢাকার আগ্রহ তাই পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতির বিসর্জন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং এটি হতে পারে বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্প সম্প্রসারণের একটি প্রচেষ্টা। তবে সেই প্রচেষ্টা যেন নতুন কোনো নির্ভরতার জন্ম না দেয়, সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

বাংলাদেশের কী লাভ হতে পারে?

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের প্রয়োজন উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সামুদ্রিক নজরদারি, ড্রোন, সাইবার নিরাপত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষমতা, আধুনিক নৌযান এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। মক্কা চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা দিতে পারে।

বিশেষ করে তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময়। তুরস্কের ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধপ্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করেছে। শুধু সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র এবং সামরিক গবেষণার সুযোগ পাওয়া গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার পথ প্রশস্ত হতে পারে।

পাকিস্তানের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, বিমানবাহিনী, সামরিক চিকিৎসা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তবে এ সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত ঐতিহাসিক প্রশ্নকে অস্বীকার করা যাবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় মর্যাদার বিনিময়ে নয়।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শুধু ধর্মীয় আবেগের নয়; এর গভীর অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, বন্দর, কৃষি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ক্রমেই সমুদ্রনির্ভর হয়ে উঠছে। মক্কা চুক্তির আওতায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উদ্ধার অভিযান, নৌ প্রশিক্ষণ, জলদস্যুতা প্রতিরোধ এবং সমুদ্রপথের নজরদারিতে সহযোগিতা পাওয়া গেলে তা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন যৌথ প্রতিরক্ষার দায়

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনা যতই আকর্ষণীয় হোক, চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা শর্তটি বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো সদস্যের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করার অর্থ কী? এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কি সামরিক বাহিনী পাঠাতে বাধ্য হবে? নাকি রাজনৈতিক, গোয়েন্দা, চিকিৎসা কিংবা সরবরাহ-সহায়তা দেওয়াই যথেষ্ট হবে?

আক্রমণকারী কে, তা নির্ধারণ করবে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠান? সীমান্ত সংঘর্ষ, সাইবার হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ কিংবা কোনো সদস্যরাষ্ট্রের বিতর্কিত সামরিক অভিযানের পর পাল্টা আঘাতকেও কি যৌথ প্রতিরক্ষার আওতায় আনা হবে? সদস্যরাষ্ট্র নিজেই উত্তেজনা সৃষ্টি করলে অন্যদের দায় কতটুকু থাকবে?

সৌদি আরবের নিরাপত্তা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি স্থাপনা এবং উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত। তুরস্ক একই সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সংঘাতপূর্ণ। বিশেষ করে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে যেকোনো ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা বাংলাদেশের সামনে গুরুতর কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী আন্তর্জাতিকভাবে সম্মান অর্জন করেছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা অভিযানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। দূরবর্তী কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে পক্ষভুক্ত হওয়া শান্তিরক্ষার এই ঐতিহ্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধ-প্রতিশ্রুতির মধ্যে স্পষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে।

ভারতের উদ্বেগ কতটা যৌক্তিক?

বাংলাদেশের যেকোনো প্রতিরক্ষা উদ্যোগ ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, বিশেষ করে সেই উদ্যোগে পাকিস্তান যুক্ত থাকলে। বাংলাদেশকে তিন দিক থেকে ঘিরে থাকা ভারতের সঙ্গে আমাদের চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। বাণিজ্য, নদীর পানি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতার সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি সম্পর্কিত।

পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সম্পর্ক গভীর হলে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা এটিকে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বঙ্গোপসাগরের কাছে নতুন কৌশলগত উপস্থিতি হিসেবে দেখতে পারেন। তুরস্কের কাশ্মীরবিষয়ক অবস্থান এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দিল্লির সংশয় বাড়াবে।

তবে ভারতের উদ্বেগ বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর কোনো ভেটো হতে পারে না। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে। কিন্তু সার্বভৌমত্বের দায়িত্বশীল প্রয়োগ মানে প্রতিবেশীকে অপ্রয়োজনে উসকানি দেওয়া নয়। ঢাকা স্পষ্ট করে জানাতে পারে, নতুন কোনো সহযোগিতা ভারতের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে না, বাংলাদেশের মাটিতে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হবে না এবং তৃতীয় কোনো দেশের বিরুদ্ধে এ ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

ভারতকেও বুঝতে হবে, বাংলাদেশের অংশীদারিত্বের বহুমুখীকরণ মানেই ভারতবিরোধিতা নয়। দিল্লি যদি ঢাকার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকতে চায়, তবে সেই অবস্থান পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা এবং বাংলাদেশের উদ্বেগের প্রতি সংবেদনশীলতার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে একচ্ছত্র প্রভাব দাবি করে নয়।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণ

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও অবকাঠামো অংশীদার। মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ বেইজিংও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পাকিস্তান চীনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গেও বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই চুক্তিটি সরাসরি চীনবিরোধী নয়। তারপরও নতুন কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামো বাংলাদেশের বিদ্যমান সামরিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত ভারসাম্যে কী প্রভাব ফেলবে, তা বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবও উপেক্ষা করা যাবে না। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য; সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘ নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে। তা সত্ত্বেও স্বতন্ত্র একটি প্রতিরক্ষা বলয়ের উত্থান পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর আস্থার ঘাটতির প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে কোনো চুক্তির কারণে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অসামঞ্জস্য অথবা পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে কি না, তা আগে থেকেই মূল্যায়ন জরুরি।

ধর্ম নয়, জাতীয় স্বার্থই ভিত্তি

বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে পারে না। দেশের সংবিধান, বহুত্ববাদী সামাজিক চরিত্র এবং সব নাগরিকের স্বার্থকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরাইল, উপসাগরীয় দেশ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে জটিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকারের সমর্থক, আবার ইরানের সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়ে ঢাকা যেন সুন্নি-শিয়া বিভাজন কিংবা অন্যের আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সামরিক বাধ্যবাধকতাকেও পৃথকভাবে বিচার করা দরকার। সৌদি বিনিয়োগ, তুর্কি প্রযুক্তি অথবা পাকিস্তানি প্রশিক্ষণের বিনিময়ে বাংলাদেশ কোনো অস্পষ্ট যুদ্ধ-প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতে পারে না। ভ্রাতৃত্বের আবেগ নয়, লাভ-ক্ষতি ও ঝুঁকির বাস্তব হিসাবই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত।

তাড়াহুড়ো নয়, ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া দরকার

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে প্রথমে পর্যবেক্ষক বা সংলাপ-অংশীদারের মর্যাদা চাওয়া। দুর্যোগ মোকাবিলা, সামরিক চিকিৎসা, সাইবার নিরাপত্তা, সমুদ্র উদ্ধার, শান্তিরক্ষা প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাস দমন এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনের নির্বাচিত ক্ষেত্রে সহযোগিতা শুরু করা যেতে পারে। এতে চুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হবে, অথচ শুরুতেই স্বয়ংক্রিয় যৌথ প্রতিরক্ষার দায় নিতে হবে না।

সরকারকে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এবং সম্ভাব্য গোপন প্রটোকল পর্যালোচনা করতে হবে। সংসদে আলোচনা, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই করা প্রয়োজন। কত টাকা ব্যয় হবে, বিদেশে সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা থাকবে কি না এবং চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিধান কী এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশকে কয়েকটি সুস্পষ্ট সীমারেখাও নির্ধারণ করতে হবে। দেশের মাটিতে স্থায়ী বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নয়; সাংবিধানিক অনুমোদন ছাড়া বিদেশে যুদ্ধের জন্য সৈন্য পাঠানো নয়; কোনো সাম্প্রদায়িক বা আঞ্চলিক সংঘাতে জড়ানো নয়; এবং বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া নয়।

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন কৌশলগত দরজা খুলতে পারে। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, সামরিক প্রশিক্ষণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মুসলিম বিশ্বে কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও কম নয়।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ শুধু আকর্ষণীয় রাজনৈতিক স্লোগান হলে চলবে না। এর অর্থ হতে হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সার্বভৌমত্ব এবং কৌশলগত স্বাধীনতাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা। নতুন অংশীদারিত্ব যদি দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বাড়ায়, তবে তা বিবেচনার যোগ্য। কিন্তু পুরোনো নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আরেকটি নতুন নির্ভরতার মধ্যে প্রবেশ করলে সেটি কৌশলগত সাফল্য হবে না।

বাংলাদেশ মক্কা চুক্তির দরজা খোলা রাখতে পারে। তবে সেই দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশের আগে চুক্তির প্রতিটি ধারা, প্রতিটি দায় এবং প্রতিটি সম্ভাব্য পরিণতি গভীরভাবে বুঝে নেওয়াই হবে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞার পরিচয়।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।