মানবিক ও উন্নত দেশ গড়ার জন্য দলমতনির্বিশেষে সবার মান-ইজ্জত ও অধিকারের সুরক্ষা দেয়ার অঙ্গীকার করেছেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, আল্লাহ’র ইচ্ছায় ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিন ফজরের নামাজ পড়ে আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করবো। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। ভাষণটি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মাধ্যমে সম্প্রচার করা হয়।
তিনি বলেন, আমরা এমন এক দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যেখানে কোনো মা বা বোনকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হবে না। আপনাদের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে আমাদের সঙ্গী হোন। একটি উন্নত ও আধুনিক দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে আমাদের নির্বাচিত করুন।
জুলাইয়ের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করে জামায়াত আমীর বলেন, জুলাই হয়েছিল কারণ আমাদের দেশ এক হয়েছিল।
তিনি বলেন, জুলাই হয়েছিল একটা কালো রাজনৈতিক ধারার পরিবর্তনের জন্য। যুগের পর যুগ ক্ষমতা কুক্ষিগত ছিল পরিবারতন্ত্রের হাতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে; সেখান থেকে মুক্তির জন্য। বিশেষ করে, ২০০৯ সাল থেকে জাতির উপর এমন এক শাসকগোষ্ঠী চেপে বসে যারা মানবাধিকার, ভোটাধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে ফেলে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আয়নাঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের উপর নিপীড়ন চালায়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর পরপর তিনটি জাতীয় নির্বাচনের নামে তামাশার মাধ্যমে আমাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়। এই সব নিপীড়ন থেকে মুক্তি ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্যই এসেছিল রক্তাক্ত জুলাই।
তরুণরা এখন একটা নতুন দেশ দেখতে চায় উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, যে দেশকে তারা গর্ব করে বলতে পারবে ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ ২.০’। এক কথায় যদি বলি, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু একটি মহল পরিবর্তনের বিরোধী; কারণ পরিবর্তন হলেই তাদের অপকর্মের পথ বন্ধ হবে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়ার সুযোগ থাকবে না। এই সংস্কৃতি বদলানোর সাহস সবার থাকে না। ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর হিম্মত সবার থাকে না। এই হিম্মত দেখিয়েছে আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ওসমান হাদি ও তাদের সহযোদ্ধারা। তাদের রক্তের শপথ নিয়ে নতুন প্রজন্মের লক্ষ লক্ষ সাহসী সন্তান আজ এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, এই দেশ আমাদের সময়ের এই সাহসী সন্তানদের হাতেই তুলে দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এই তরুণরাই রচনা করবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি এবং এ সংস্কার প্রক্রিয়াকে জারি রাখাসহ সংস্কার নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হচ্ছে। এ গণভোট জনগণের সাধারণ ইচ্ছা প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চাই।
নতুন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষার আলোকে জামায়াতের সব পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও অঙ্গীকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরাই প্রথম ‘পলিসি সামিট’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-কৌশল জনগণের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এর প্রতিফলন রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশের এবং প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা অবদান রেখেছেন। এ ছাড়াও আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে বসেছি এবং তাদের মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ নিয়েছি। আমরা সুযোগ পেলে, মহান আল্লাহ’র ইচ্ছায় ও জনগণের ভালোবাসায় সরকার গঠন করলে প্রথম দিনেই ফজর নামাজ পড়েই আমাদের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন শুরু করবো।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন জাতিকে একটি নতুন স্বপ্নের দিকে নিয়ে যাওয়ার এক মহা-সুযোগ হিসেবে এসেছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যেসব সমস্যা আমরা বিগত দিনে সমাধান করতে পারিনি, যে লুটেরা গোষ্ঠীকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি, সেসব সমস্যার সমাধান এবং লুটেরা গোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ হচ্ছে আগামী নির্বাচন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট কিন্তু জনসংখ্যায় বড় একটি দেশ। এ জনসংখ্যাকে অনেকে সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলেও আমরা মনে করি এটি আল্লাহর নেয়ামত এবং এক বড় সম্পদ। তাই আমাদের জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হলে নীতি ও নৈতিকতা ভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প নেই। সমাজে নীতি-নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারেনি; আমাদের পক্ষেও সম্ভব না। যে সমাজ নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সেই সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। আমরা ক্ষমতায় এলে নারীরা কেবল ঘরের ভেতরে নয়, সমাজের মূলধারার নেতৃত্বে থাকবেন সগৌরবে।
ওলামায়ে কেরামদের উদ্দেশ্যে জামায়াত আমীর বলেন, একাধিক ধর্মের এ দেশে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই মুসলমান হিসেবে এটি আমাদের দায়িত্ব যে সমাজে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো ইসলামের শাশ্বত আদর্শ। সকল মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব; এটি আল্লাহ আমাদেরকে স্পষ্টভাবে বলেছেন। এ দায়িত্ব আমরা সকলে মিলেই পালন করবো।
তাবলীগ জামাতের সদস্যদের ‘ভাই’ সম্বোধন করে তিনি বলেন, আপনারা দ্বীনের জন্য যে মেহনত করছেন, দেশ গড়ার কাজেও আপনারা আমাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলেও আমরা বিশ্বাস করি। আমরা অঙ্গীকার করছি ভবিষ্যতে কেউ আপনাদের অন্যায়ভাবে বিভিন্ন বিশেষণে ‘ট্যাগ’ দিয়ে নির্যাতন করতে পারবে না।
প্রবাসীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। ইতিমধ্যে আপনারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নতুন বাংলাদেশে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে ইতিহাস রচনা করেছেন। আগামী দিনে দেশ গড়ার এই অভিযাত্রায় আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া আমাদের ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যাবে। আমরা চাই প্রবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই প্রবাসীদের জন্য ভলান্টিয়ার প্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে যারা প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, সেবা ও সমস্যার বিষয়ে দূতাবাস বা হাইকমিশনের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় করে প্রবাসীদের স্বার্থে উপদেষ্টা ও প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবেন। এবং প্রবাসীরাও যেন সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ আরও শক্তিশালী করতে আনুপাতিক হারে সংসদে প্রবাসী প্রতিনিধি নির্বাচন বা মনোনয়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে আমানত উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কোনো উপভোগের বিষয় নয়। সর্বাবস্থায় আমরা স্মরণে রাখবো ‘আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং আমাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’। আমরা হযরত ওমর (রাহ.)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি ও দায়িত্বশীলতা মনে রাখবো যে, “ফোরাতের তীরে একটি কুকুর না খেয়ে মরে গেলেও আমি ওমর দায়ী থাকবো”। আল্লাহ’র নির্দেশ অনুসারে আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবো, ইনশাআল্লাহ।
জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ডা. শফিকুর রহমান
ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবো
স্টাফ রিপোর্টার
১০ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
