বৃটেনের সহায়তা কমছে ৫০ শতাংশের বেশি, বিপাকে হাজারো বাংলাদেশি

বৃটেনের সহায়তা কমছে ৫০ শতাংশের বেশি, বিপাকে হাজারো বাংলাদেশি

ফন্ট সাইজ:

বৈদেশিক সহায়তা বাজেট কমিয়ে দেয়ায় বাংলাদেশে বৃটেনের অর্থায়নে পরিচালিত সুন্দরবনভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকল্পটির আওতায় থাকা প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রত্যাশিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং ইতোমধ্যে নেয়া কিছু উদ্যোগও কার্যত ঝুঁকির মুখে পড়বে। দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের অনলাইন প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
বৃটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সালে সুন্দরবন এলাকায় প্রকল্পটি শুরু করে। ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা থাকা প্রকল্পটির আওতায় সৌরবিদ্যুৎ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, মাছ চাষের প্রযুক্তি এবং ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টির আগাম সতর্কতাব্যবস্থা দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। লক্ষ্য ছিল ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানো। কিন্তু অর্থ কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত চলতি বছর মাত্র ৩৭ হাজার মানুষ সুবিধা পাবেন।

প্রকল্পটির জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২.২ মিলিয়ন পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এর তুলনায় ‘অনেক কম’ অর্থ পেয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে তাদের জুনের মধ্যে প্রকল্প বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়। পরে তদবিরের পর সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের প্রকল্পটি বৃটেন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সহায়তা কমানোর বৃহত্তর সিদ্ধান্তের অংশ। ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশে বৃটেনে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ৬৬.৭ মিলিয়ন পাউন্ড থেকে কমে ৩১ মিলিয়ন পাউন্ডে নামবে- অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি কমছে।
একই সময়ে বৃটেনের সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তা বাজেট জিএনআইয়ের ০.৫ শতাংশ থেকে ০.৩ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের জলবায়ু সহনশীলতা বিষয়ক প্রধান তামান্না রহমান বলেন, আকস্মিকভাবে প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তৈরি হওয়া আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রকল্পের সুফল টেকসই করার সুযোগও কমে গেছে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দা বিনা মণ্ডল একটি সৌর প্যানেল পেয়েছেন। এতে রাতেও কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তার পরিবারের মাছ ধরার আয় মাসে প্রায় ২-৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪-৫ হাজার টাকায় উঠেছে। আরেক বাসিন্দা বাসন্তী মণ্ডল সৌরচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন পেয়ে বাড়িতে বসে আয় করার সুযোগ পেয়েছেন।
প্রকল্প বন্ধের খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেঁদেছেন, আবার কেউ বুঝতে পারেননি- যখন উদ্যোগগুলো সুফল দিতে শুরু করেছে, তখন কেন সহায়তা বন্ধ হচ্ছে।
এ ছাড়া বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে ১৪০ জন উদ্যোক্তার একটি প্রকল্প নিয়ে। প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও এখন প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে তারা আবার ‘শূন্য অবস্থায়’ ফিরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বলছে, প্রকল্পের ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান পাওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের নোটিশে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ায় নতুন অর্থায়ন খোঁজার সময়ও পাওয়া যায়নি।
বৃটিশ পার্লামেন্টের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক কমিটির চেয়ার সারাহ চ্যাম্পিয়ন বলেছেন, এভাবে প্রকল্প দুই বছর আগে বন্ধ করে দেয়া জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিম্নআয়ের দেশগুলোর পাশে থাকার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এতে বৃটিশ করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং লন্ডনের আন্তর্জাতিক সুনাম- দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে বৃটেনের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস তথা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (এফসিডিও) বলেছে, তারা উচ্চমাত্রার অনুদানভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্বে বেশি গুরুত্ব দেবে।
তাদের দাবি, এর মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, অর্থায়ন বাড়ানো এবং সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।