ভারত ও বাংলাদেশের একে অপরকে প্রয়োজন, তাহলে সম্পর্ক কঠিন হয়ে উঠছে কেন?

ডেকান হেরাল্ডের কলাম

ভারত ও বাংলাদেশের একে অপরকে প্রয়োজন, তাহলে সম্পর্ক কঠিন হয়ে উঠছে কেন?

ফন্ট সাইজ:

২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বেশ কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এ বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবারও স্বাভাবিক পথে ফিরবে এমন আশা তৈরি হয়েছিল। কারণ বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে ভারত সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্যও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ঢাকায় ভারতের নতুন দূত দিনেশ ত্রিবেদী ১০ আগস্ট তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথম বৈঠক করলে আসন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়টি দ্রুত চূড়ান্ত হবে- এমন প্রত্যাশাও ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা খুব দ্রুতই ভেস্তে যায়।

এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না থাকলেও ধারণা করা যায়, ইতিবাচক আলোচনা সত্ত্বেও সফর আয়োজনের জন্য সম্ভবত কিছু শর্ত দেয়া হয়েছে। ভারত সেসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করায় বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, অনুকূল পরিবেশ না থাকায় এই মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় সফর সম্ভব নয়। কয়েকটি দীর্ঘস্থায়ী বিরক্তির বিষয় থাকলেও ভারত ও বাংলাদেশকে তখনও এমন পর্যায়ে দেখা হয়নি যে দুই দেশ সম্পর্কচ্ছেদের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। প্রধান বিরোধের বিষয়গুলো হলো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার প্রত্যর্পণের দাবি। শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেয়াটা বোধগম্য ছিল। কিন্তু ভারতে অবস্থান করে তাকে একাধিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়ার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে, তা ঢাকায় ভালোভাবে নেয়া হয়নি। এরপর ২০২৬ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই বক্তব্যে ঢাকা ‘ক্ষুব্ধ’ হয়। বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার অনুরোধ জানানোর পরও সেটি অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ঢাকা আরও কঠোর অবস্থান নেয়। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের দাবিও তোলে। অথচ এসব বিষয় এমনিতেই দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হওয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে নয়াদিল্লি তার অবস্থান বজায় রেখে জানায়, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে এবং ভারত সরকার এতে সমর্থন বা অংশগ্রহণ কোনোটিই করেনি। কিন্তু এই কূটনৈতিক ব্যাখ্যা বাংলাদেশে খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ওই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা আইনি মামলার মুখোমুখি থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আওয়ামী লীগ দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল এবং এখনো দলটির মাঠপর্যায়ে শক্ত ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু দলীয় প্রধানসহ বিপুলসংখ্যক নেতা অনুপস্থিত, যাদের অনেকেই কারাগারে রয়েছেন। ফলে নেতৃত্বহীন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন বলেই মনে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার বারবার দেশে ফেরার কথা বলা বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক পরিকল্পনার চেয়ে বরং দুর্বল হয়ে পড়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙা করার একটি প্রচেষ্টা বলেই বেশি মনে হচ্ছে।

হাসিনার ফেরা: উভয় সঙ্কট
বিএনপি সরকারও এক ধরনের কঠিন দ্বিধার মুখে পড়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের উপস্থিতি থাকলে জামায়াতের মতো ডানপন্থী শক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে মধ্যপন্থী শক্তিগুলো আরও সুসংহত হতে পারে। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বিষয়ে জামায়াত-এনসিপির বিরোধী জোটের কঠোর অবস্থান সমঝোতার সম্ভাবনাকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। শেখ হাসিনা কার্যত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন। ফলে সংগঠনটি এখন হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্তগুলো সহজে ভুলে যাবে এমন সম্ভাবনা কম। এনসিপির নেতাদের অনেকেই হাসিনার শাসনামলে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাই হাসিনা আবার রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এলে তাদের কী পরিণতি হতে পারে, সে বিষয়ে তাদের কোনো বিভ্রম নেই। যদিও এমন ধারণা রয়েছে যে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যস্থতায় গোপন আলোচনার মাধ্যমে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি করানো সম্ভব হতে পারে, তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শেখ হাসিনা ও তার দলের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রাস্তায় ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। এটিও ঢাকার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে বিএনপিও এখন নমনীয় অবস্থান নেবে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।

সাম্প্রতিক একটি জরিপে যদিও দেখা গেছে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বর্তমান সরকারের ওপর আস্থা রাখছেন। তবু শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ জনমত এখনো গভীর বিভাজনের বিষয়। শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, তা আগামী কয়েক মাসের বিভিন্ন আইনি, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো সহজ সমাধান নেই।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গভীরতা ও বৈশিষ্ট্য শুধু বাণিজ্যের পরিসংখ্যান কিংবা অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়েছে অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের ওপর- যা শুধু কঠোর অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের অনেক ঊর্ধ্বে। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য ও সময়ে সময়ে বিরোধ থাকা অস্বাভাবিক নয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এমন মতবিরোধ থাকাটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘমেয়াদে ভারত ও বাংলাদেশ পরস্পর থেকে দূরে এবং একে অপরের প্রতি উদাসীন অবস্থায় থাকবে- এমন কোনো পরিস্থিতি কল্পনা করা কঠিন।
তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে দুই পক্ষের আচরণে ইতিবাচক মনোভাব দেখা গিয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুতই পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। দুই দেশের একে অপরকে নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সীমান্তজুড়ে ‘পুশব্যাক’ ও ‘পুশ-ইন’-এর নীতি অব্যাহত থাকে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ, তুরস্কের সঙ্গে বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তুলেছে।

কোনো পক্ষই সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারবে না
বাস্তবতা হলো, শেখ হাসিনার আমলের মতো উষ্ণ সম্পর্ক এখন আর দুই প্রতিবেশীর মধ্যে নেই। কিন্তু কোনো পক্ষেরই পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করে দূরে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ভৌগোলিক বাস্তবতার অসমতা উপেক্ষা করা অসম্ভব। এই বাস্তবতা নিশ্চিত করে যে, বাংলাদেশের জন্য ভারত সবসময়ই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে। একইভাবে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী কেন্দ্রিক কৌশলের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শর্তগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে, সেগুলো দিল্লিতে অপমানজনক বা অসম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অন্যদিকে ঢাকা এমন কোনো অবস্থানে যেতে চায় না, যাতে মনে হয় একটি দুর্বল প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে ভয় পেয়ে তারা কোনো অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতিই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি জটিল অচলাবস্থার মধ্যে ফেলেছে। এই অচলাবস্থা ভাঙতেই হবে। কারণ বিকল্প পরিস্থিতি মোটেও সুখকর নয়।
বিএনপিকে দুর্বল বা আপসকামী হিসেবে দেখালে তা কট্টরপন্থী ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে আরও উৎসাহিত করতে পারে।

একই সঙ্গে এটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই যে বিভিন্ন বহিরাগত শক্তি, বিশেষ করে চীন, দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পররাষ্ট্রনীতির হিসাব-নিকাশে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৭০টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা বা সহযোগিতার কাঠামো রয়েছে। সম্প্রতি ভারতের একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরকে হয়তো ‘স্বাভাবিক নিয়মে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার’ উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা এখনো অব্যাহত থাকার বিষয়টিও স্পষ্ট করে।

কিন্তু অর্থবহ ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আবার এগিয়ে নিতে হলে দিল্লি ও ঢাকাকে দ্রুত একটি সমঝোতামূলক সহাবস্থানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে একটি বৈঠক আয়োজন করা এখন জরুরি এবং সেটি যত দ্রুত সম্ভব হওয়াই উভয় দেশের স্বার্থে।

(লেখক হরিয়ানায় ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিতে জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের একজন প্রফেসর। তার এ লেখাটি ডেকান হেরাল্ড থেকে অনূদিত)