ইরানের পতনের আগেই ভেঙে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র?

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ইরানের পতনের আগেই ভেঙে পড়বে যুক্তরাষ্ট্র?

ফন্ট সাইজ:

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আবারও নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তবে এবারও তার পদ্ধতিটি পরিচিত- বড় বড় হুমকি আর সর্বোচ্চ মাত্রার চাপের ঘোষণা। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চড়া হয়ে উঠলে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান ধরে রাখবেন, নাকি আগের মতোই পিছু হটবেন?

বুধবার ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের বিরুদ্ধে “যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেয়া সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান” শুরু করা হবে।
ইরানকে বোমা হামলার মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে ব্যর্থ হওয়ার পর এবং নানা প্রণোদনা দিয়ে পারমাণবিক আলোচনায় ফেরাতে না পারার পর ট্রাম্পের নতুন এই কৌশলকে অনেকটা মুখরক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের কৌশলে এত বেশি পরিবর্তন ও অবস্থান বদল এসেছে যে তার হিসাব রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

ইরানের সঙ্গে সব আলোচনা বন্ধ

ট্রাম্প এখন ইরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছেন। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার দল রাজনৈতিক মিত্রদের জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছেন।

ট্রাম্পের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেশটির সরকারকে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হবে।
বুধবার যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, এই মুহূর্তে আমার মনে হয় পরিস্থিতি খুবই ভালো। অথচ কয়েক দিন পরপরই তিনি যে যুদ্ধকে ‘জিতে গেছি’ বলে ঘোষণা করেছিলেন, সেই সংঘাত এখন ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করেছে।

পরবর্তী এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে ট্রাম্প আরও বলেন, যেসব দেশ ইরানকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা বেঁচে থাকার সুযোগ দেবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি তেল পাচার, অর্থ স্থানান্তর, বিনিময় ব্যবস্থা, মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা বন্ধ করার হুঁশিয়ারি দেন।

ইরান কি সত্যিই চাপে নতি স্বীকার করবে?

তবে অনেক বিশ্লেষকই সন্দিহান- তেহরানের বিপ্লবী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সামনে নতি স্বীকার করবে কি না। কারণ, ইরান এর আগেও বিশ্বের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কয়েক দশক মোকাবিলা করেছে। দেশটির সরকার নিজ জনগণের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেও টিকে থাকার নজির দেখিয়েছে।

ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় কাজ করা এবং একসময় গবেষণা ও বিশ্লেষণ বিভাগের ইরান শাখার প্রধান থাকা ড্যানিয়েল সিত্রিনোভিচ বলেন, যারা মনে করছেন অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরান ভেঙে পড়বে, তারা ভুল করছেন।

মঙ্গলবার সিএনএন ইন্টারন্যাশনালকে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার কৌশল পরিবর্তন করছে- এমন কোনো লক্ষণ নেই।
তার মতে, অর্থনৈতিক চাপ ইরানকে ভয়াবহ মূল্য দিতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু “শেষ পর্যন্ত এই চাপের কারণে ইরানের হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে বলে আমি মনে করি না।”

ট্রাম্পকে আগে নিজের কৌশল বদলাতে হবে

ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে হলে শুধু তেহরানের হিসাব বদলালেই হবে না, ট্রাম্পকেও নিজের আচরণ বদলাতে হবে।

ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস করতে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছরও লেগে যেতে পারে। আর এর জন্য প্রয়োজন এমন কৌশলগত ধৈর্য, যা ট্রাম্প সাধারণত দেখান না।
ইরান যদি ধরে নেয় যে নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তব ফল দেয়ার আগেই ট্রাম্প এতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, তাহলে তেহরানের পক্ষে সেই ঝুঁকি নেয়া অযৌক্তিক হবে না। ট্রাম্পের নতুন কৌশল সফল করতে কূটনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

হোয়াইট হাউস ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ কার্যকর করতে সামরিক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। এরই প্রতীক হিসেবে ট্রাম্প সম্প্রতি এমন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট দেন, যেখানে তিনি বিভ্রান্তিকরভাবে হরমুজ প্রণালিকে নতুন মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেন।
কিন্তু ইরানকে সত্যিকার অর্থে বিচ্ছিন্ন করতে হলে উপসাগরীয় অঞ্চল, ইউরোপ ও এশিয়াজুড়ে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

ইরানের ওপর বাস্তব চাপ তৈরির কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে বলে মনে করেন হাডসন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো লুডোভিক হুড। তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) আয়ের উৎসের ওপর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানো এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি বাগদাদ ও বৈরুতের সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদার করে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব চ্যালেঞ্জ করার পরামর্শ দেন।
একই সঙ্গে ইরানের তেল কেনার অন্যতম বড় দেশ চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর জন্য মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

হুডের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ইরানে মূল্যস্ফীতি ও পুঁজি পাচার বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে ব্যাংকিং সংকট তৈরি হয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কেও পড়বে চাপ

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর গোপন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও বিকল্প বাণিজ্যপথ বন্ধ করতে মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে পারে, তাহলে অবরোধ আরও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ট্রাম্প প্রশাসনের শক্তির জায়গা নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরান নিয়ে ওয়াশিংটনের কূটনীতি, যেখানে ট্রাম্পের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, অনেক সময়ই সরল ও বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন বলে সমালোচিত হয়েছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধ শুরু করে মিত্রদেরও ক্ষুব্ধ করেছেন, যা তাদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এরপরও মিত্ররা যুদ্ধে যোগ না দেয়ায় তিনি তাদের সমালোচনা করেছেন। এ সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার উদ্যোগে ওমানের অবস্থানের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন।

ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করতে ট্রাম্পকে কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর মধ্যে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে ইরানের অবৈধ তেল বিক্রির অর্থ লেনদেনে জড়িত চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া।

কিন্তু সমস্যা হলো, সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানোর কথা রয়েছে ট্রাম্পের। এটি তার বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজন। তাই তার আগেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার মতো পদক্ষেপ ট্রাম্প নেবেন- এমনটা হলে সেটি বড় ধরনের বিস্ময় হবে।

ট্রাম্প কি এবারও পিছু হটবেন?

ট্রাম্প অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকলেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে- ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবে। তেহরান জানে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের মতো বাকি। ফলে মার্কিন রাজনীতিতে ট্রাম্প এখন তুলনামূলকভাবে স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছেন। ইরান হয়তো ১৯৮০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে জিমি কার্টারের জিম্মি সংকটের মতোই ট্রাম্পকেও রাজনৈতিকভাবে অপমানিত করার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

ফলে শরৎকালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প যাতে যুদ্ধের পরিস্থিতি শান্ত করতে না পারেন, তার রাজনৈতিক কারণও ইরানের রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ধীর করার মাধ্যমে যুদ্ধ থেকে অর্জিত কৌশলগত সুবিধা ধরে রাখতে ইরান সংঘাত আরও বাড়াতে পারে।

জাহাজে নতুন করে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়তে পারে। এতে মার্কিন ভোটারদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং যুদ্ধ নিয়ে তাদের অসন্তোষও তীব্র হতে পারে।
ট্রাম্প যদি পাল্টা হামলা চালান, সংকট আরও গভীর হবে। আর যদি তিনি সংযত থাকেন, তাহলে তাকে দুর্বল দেখাতে পারে ইরান। ফলে সরাসরি যুদ্ধ হোক কিংবা অর্থনৈতিক যুদ্ধ- দুই ক্ষেত্রেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেমস ওয়াকিনশ বলেন, আমি ইরানের সঙ্গে এমন অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধে আগ্রহী নই, যেখানে আমাদের দিক থেকে মূল্য দিতে হবে মার্কিন জনগণকে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হুমকি সত্ত্বেও ইরান সংকটের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

আর ট্রাম্পের সামনে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে- যুদ্ধের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা কি ইরানি সরকারের আগে মার্কিন জনগণেরই শেষ হয়ে যাবে?