প্রকৌশলীকে ওএসডি’র ১৮ দিনের মাথায় ফেরা, রহস্য

প্রকৌশলীকে ওএসডি’র ১৮ দিনের মাথায় ফেরা, রহস্য

ফন্ট সাইজ:

একজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে ওএসডি থেকে ১৮ দিনের মাথায় স্বপদে ফিরিয়ে আনা নিয়ে ব্যাপক রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) এ নিয়ে নানা আলোচনায় ডাল-পালা ছড়িয়েছে। গত ২৩শে জুলাই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. শাহজাহান আলীকে ওএসডি করা হলেও ১২ই আগস্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-৩ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে পুনরায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে তাকে বহাল করা হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে ওএসডি থেকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনার ঘটনায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত পতিত সরকারের আমল থেকেই শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি) ঘিরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে এসেছে। অধিদপ্তরের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। যাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দুর্নীতির সিন্ডিকেট।

সূত্র জানায়, শাহজাহান আলীকে নিয়ে এর আগেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে বদলি-পদায়ন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল ছাড় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব ছিল। নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা দেয়া, বিল ছাড়ে কমিশন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-পদায়নেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, হাওর অঞ্চলে ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫টি বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন শাহজাহান আলী। নির্মাণাধীন কয়েকটি ভবনে ফাটল, জানালার লিন্টেল বাঁকা হওয়া ও ছাদে ত্রুটির অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকার মধ্যেই তাকে পুনরায় স্বপদে ফিরিয়ে আনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১০ই ডিসেম্বর যে পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল, শাহজাহান আলী তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে ইইডি সদর দপ্তরে পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইইডি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইল আটকে রেখে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। তারা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে এবং সেগুলোর কয়েকটিতে শাহজাহান আলীর নামও উঠে এসেছে। সূত্রমতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে শাহজাহান আলীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। জামালপুরে মির্জা আজমের প্রতিনিধিকে কাজ পাইয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেন শুধু জামালপুরে। এই প্রকৌশলীর নিজ জেলাও এটি।

তার বিরুদ্ধে তদন্তে বেরিয়ে আসে-চূড়ান্ত বিল প্রদানের আগে বাধ্যতামূলক ৫ শতাংশ ঘুষ, উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের এলাকায় দায়িত্ব বণ্টনে ১ শতাংশ ‘উৎকোচ’ এবং কিছু স্বজনপ্রীতি-ঘনিষ্ঠ কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানের নামে দরপত্র ‘কিনে’ বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছে ৫ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে বিক্রি করার মতো গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে আসবাবপত্র সরবরাহ প্রকল্পে আহ্বান করা ৩৯টি দরপত্র স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা চাঁদপুরের কচুয়ায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেড় কোটি টাকার টেন্ডারে কমিশনের জন্য ২০ দিনের অধিক সময় ফাইল আটকে রাখেন। পরে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তা ছাড় পায়।

শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনের অভিযোগও নতুন নয়। বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে তিনি রংপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেছেন, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন এবং নিজ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করেছেন। এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর তিনি দ্রুত বদলি নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। রংপুর বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে হঠাৎ করেই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল ঢাকায় বদলি হয়ে আসেন। চাকরিতে যোগদান করেন ১০ই আগস্ট ২০১১ সালে। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে তার পদোন্নতির ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। মেধা তালিকায় তার অবস্থান ২য় হলেও কৌশলে প্রথম জনকে বরিশালে পাঠানো হয়। নিজে পোস্টিং নেন প্রধান কার্যালয়ে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সব তার দখলে থাকে।