সিডনিতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় কমিউনিটির পাশে সিলেটের দবির উদ্দিন

৭৩ বছর বয়সেও থামেনি মানবসেবা

সিডনিতে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় কমিউনিটির পাশে সিলেটের দবির উদ্দিন

ফন্ট সাইজ:

বয়স ৭৩। জীবনের দীর্ঘ সময় কেটে গেছে প্রবাসে। প্রায় চার দশক ধরে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাস করছেন বাংলাদেশের সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ দবির উদ্দিন। বয়স বাড়লেও থেমে যায়নি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা। কমিউনিটি সার্ভিস, জাস্টিস অব দ্য পিস (জেপি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন তিনি।

দবির উদ্দিনের কাছে পেশা মানে শুধু জীবিকা নয়—মানুষের উপকারে আসার একটি সুযোগ। তার ভাষায়, মানুষের জন্য কিছু করতে পারা এবং তাদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারাই প্রকৃত সফলতা।

বাংলাদেশে থাকতেই হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা বিষয়ে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার। শিক্ষাজীবনে ১৯৭২ সালে বিশ্বনাথ হাইস্কুল থেকে এসএসসি, ১৯৭৪ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে হোমিওপ্যাথি বিষয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। ২০০১ সালে অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব ন্যাচারাল থেরাপিস থেকে হোমিওপ্যাথিতে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।

মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় পাওয়া

দবির উদ্দিন জানান, হোমিওপ্যাথিকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল মানুষের সেবা করার ইচ্ছা। রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে তার পাশে থাকার সুযোগ তাকে এই পেশায় আসতে উৎসাহিত করেছে। তিনি বলেন, মানুষের পাশে থেকে তাদের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করে সমাজের জন্য কিছু করার সুযোগই আমাকে হোমিওপ্যাথিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত করেছে। তবে এই পথ সবসময় সহজ ছিল না।

তার মতে, একজন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রোগীর আস্থা অর্জন করা। পাশাপাশি প্রত্যেক রোগীর সমস্যা ধৈর্য ও যত্নের সঙ্গে বোঝা এবং চিকিৎসা বিষয়ে নিজের জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়মিত বাড়িয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সুস্থতায় ভূমিকা রাখার সুযোগই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশির পাশাপাশি অন্য কমিউনিটির মানুষও আসেন

সিডনির লাকেম্বায় তার কাছে শুধু বাংলাদেশি নয়, পাকিস্তান, নেপাল ও ভারতীয় কমিউনিটির মানুষও পরামর্শ ও সেবা নিতে আসেন বলে জানান দবির উদ্দিন। প্রবাসে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারাকে তিনি বড় সুবিধা হিসেবে দেখেন। তার মতে, একজন রোগীর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বোঝা গেলে তার সঙ্গে আস্থা ও যোগাযোগ তৈরি করা সহজ হয়।

বাংলাদেশি রোগীদের মধ্যে শরীরে আঁচিল, হজমের সমস্যা, অ্যালার্জি ও বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি ব্যথার মতো সমস্যা দেখতে পান বলে তিনি জানান। তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বয়স, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের কারণে রোগীর সমস্যা ভিন্ন হতে পারে। তাই প্রত্যেক রোগীকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

‘৭৩ বছর বয়সেও কোনো ওষুধ খেতে হয় না’

নিজের জীবনযাপন নিয়েও বেশ সচেতন দবির উদ্দিন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টা করেন বলেই এখনো নিয়মিত কোনো ওষুধ গ্রহণ করতে হয় না। খাদ্যতালিকা মেনে চলা, সময়মতো ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, সবাইকে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ও সুস্থতার জন্য ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ, সুষম খাদ্য, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

রোগীকে আগে বোঝেন, পরে চিকিৎসার পরিকল্পনা

দবির উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রোগীর সমস্যা, উপসর্গ, আগের চিকিৎসার ইতিহাস এবং সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। এরপর রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসা পরিকল্পনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও তিনি রোগীদের বলেন বলে জানান।

হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে তার বক্তব্য, এ পদ্ধতিতে রোগীকে শুধু একটি রোগের ভিত্তিতে নয়, বরং সামগ্রিক শারীরিক ও মানসিক অবস্থার আলোকে দেখার প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তাঁর মতে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক যত্ন ও রোগীর প্রতি মনোযোগ এই পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সমালোচনাকেও দেখেন শেখার সুযোগ হিসেবে

হোমিওপ্যাথি নিয়ে মানুষের প্রশ্ন ও সমালোচনা রয়েছে—এ বিষয়টি স্বীকার করেন দবির উদ্দিন। তাঁর মতে, যেকোনো চিকিৎসাপদ্ধতিকে যুক্তি, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে মূল্যায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে নয়, বরং আরও শেখা ও নিজেকে উন্নত করার সুযোগ হিসেবে দেখি। রোগীর কাছে চিকিৎসা সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য তুলে দেওয়া এবং প্রয়োজনে অন্য চিকিৎসাব্যবস্থার সহায়তা নেওয়াকে তিনি একজন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর দায়িত্ব বলে মনে করেন।

কমিউনিটি সার্ভিসই মূল লক্ষ্য

দীর্ঘ প্রবাসজীবনে নানা দায়িত্ব পালন করলেও দবির উদ্দিনের কাছে কমিউনিটি সার্ভিসের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের পাশে থাকার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। তিনি বলেন, ‘আমাদের কমিউনিটি সার্ভিস চালিয়ে যাওয়াই মূল লক্ষ্য। লাকেম্বায় বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কমিউনিটির মানুষও তাঁর কাছে আসেন। ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক বাস্তবতা বোঝার কারণে প্রবাসী মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারেন বলে মনে করেন তিনি।

সফলতার সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন বয়স

৭৩ বছরের দবির উদ্দিন এখনো কাজ করে চলেছেন। বয়স তার কাছে থেমে যাওয়ার কারণ নয়, বরং মানুষের জন্য আরও কিছু করার সময়। তার কাছে সফলতা মানে অর্থ, পদ-পদবি কিংবা পেশাগত পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীর আস্থা ও সন্তুষ্টি অর্জন করে সৎভাবে মানুষের পাশে থাকতে পারলে সেটিকেই আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য মনে করেন তিনি।

চার দশকের প্রবাসজীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাই দবির উদ্দিনের গল্পটি শুধু একজন হোমিওপ্যাথি সেবাদাতার গল্প নয়, এটি মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাকে বয়সের ঊর্ধ্বে রাখার গল্প। সিডনির লাকেম্বায় নিজের কমিউনিটির মানুষের পাশে থাকার যে পথ তিনি বেছে নিয়েছেন, সেটিই তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।