রংপুরে হিমাগার ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতি

ফন্ট সাইজ:

হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে রংপুরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একে অপরের মুখোমুখি আলুচাচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি এবং হিমাগার মালিকরা। পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ সমাবেশ ও সংবাদ সম্মেলন কর্মসূচিতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দাবি আদায়ের আন্দোলনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে, তার দায়ভার প্রশাসনের উপর বর্তাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি ও হিমাগার মালিকরা। এদিকে হিমাগারে হামলা, ভাঙচুরের শংকা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে হিমাগার মালিকরা। আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি জানায়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কর্তৃক হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণে সুপারিশ কমিটির পাঠানো সুপারিশ চলতি বছরের ১৫ই জুলাই স্বাক্ষরিত হয়ে ২০শে জুলাই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়।

সুপারিশ কমিটি রংপুরের ৬টি হিমাগার সরজমিন তদন্ত করে আলু সংরক্ষণে কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৩ টাকা ৯৭ পয়সা থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ২ টাকা ৯৮ পয়সা পর্যন্ত হিমাগার মালিকরা খরচ দেখিয়েছেন। সুপারিশ কমিটির সভায় আলু সংরক্ষণের কেজিপ্রতি খরচের কথা জানালেও হিমাগার মালিকরা হিমাগারের জমির মূল্য, স্থাপনা খরচ, ব্যাংক ঋণ ও সুদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করতে সময় চেয়ে সুপারিশ কমিটির সভায় রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেনি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর হিমাগার মালিকদের স্বাক্ষর ছাড়াই সুপারিশ অধিদপ্তরে পাঠিয়ে দেয়। ফলে এখন পর্যন্ত হিমাগার ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত ঝুলে আছে। এর প্রেক্ষিতে আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি ১৬ আগস্টের মধ্যে আলু সংরক্ষণে হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা না হলে ৫ টাকা কেজি দরে ভাড়া পরিশোধ করে হিমাগার থেকে সব আলু বের করে নেয়ার হুমকি দেয়। বিষয়টি সমাধানে আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতিকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়ে নেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।

মঙ্গলবার দুপুরে মাহিগঞ্জে আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক তহিদুল ইসলাম জানান, আলুচাষিরা ১৬ আগস্টের মধ্যে আলু সংরক্ষণে হিমাগারের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে আল্টিমেটাম দিলে হিমাগার মালিকরা মিথ্যা, বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে সরকারকে বিব্রত করছে। দ্রুত আলু সংরক্ষণে যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ না হলে ২৩ আগস্ট থেকে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে। এদিকে ভাঙচুর চালিয়ে হিমাগার থেকে জোরপূর্বক সংরক্ষিত আলু বের করে নেয়ার হুমকির প্রতিবাদে সভা ও সংবাদ সম্মেলন করেছে রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। গত রোববার রাতে আরসিসিআই মিলনায়তনে সংগঠনের পরিচালক শরিফুল ইসলাম বাবু জানান, ২০২৫ সালে সরকার নির্ধারিত ৬ টাকা ৭৫ পয়সা কেজি প্রতি আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মকর্তা, হিমাগার মালিকসহ আর্থিক বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে হিমাগারে আলু সংরক্ষণে কেজিপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ না করে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের নামে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল জোরপূর্বক ভাড়া কমানোর দাবিতে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করছে।

হিমাগার পরিচালনায় শ্রমিক খরচ, স্টাফদের বেতন-ভাতা, বর্ধিতহারে বিদ্যুৎ বিল, আমোনিয়া গ্যাসের বর্ধিত মূল্যসহ আর্থিক বিষয়ক বিশ্লেষণ না করে হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া নির্ধারণ করলে তা মুক্তবাজার অর্থনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গে তেমন কোন শিল্প-কারখানা নেই। শুধুমাত্র হিমাগার শিল্প স্থাপিত হয়েছে কৃষকদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণের জন্য। বর্তমানে হিমাগার পরিচালনায় আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয়বৃদ্ধি হয়েছে। সেই ব্যয় বিবেচনায় না নিয়ে আলুচাষি ও ব্যবসায়ীর নামে স্বার্থান্বেষী একটি মহল হিমাগার ভাড়া কমানোর নামে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরী করছে।

তারা মব তৈরী করে হিমাগার মালিকদের ক্ষতিগ্রস্থ করার চেষ্টা করছে। রংপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি মঞ্জুর আহমেদ আজাদের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সহ-সভাপতি জুলফিকার আজিজ খান, পরিচালক পার্থ বোস, রংপুর মেট্রোপলিটন চেম্বারের পরিচালক রুবায়েত হোসেন খান, সাব্বির আহমেদ, জেলা মটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়াসিম বারী রাজ, রংপুর মহানগর দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবীর হোসেন আশরাফী, রংপুর মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য সুলতান আলম বুলবুল, রংপুর উইমেন চেম্বারের সভাপতি শাহনাজ পারভীনসহ ৮টি ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। এ ব্যাপারে রংপুর সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা শাকিল আকতার বলেন, রংপুর জেলার প্রতিবেদন সবার আগে ঢাকায় গিয়েছে। সব জেলার প্রতিবেদন ঢাকায় যাওয়ার পর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও কৃষি মন্ত্রণালয় হিমাগারে আলু সংরক্ষণের যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করবে। আমাদের প্রয়োজন টেকসই সমাধান। তাই কোন বিষয় তড়িঘড়ি করে সমাধানের চেষ্টা করলে তা ভালো ফল বয়ে আনবে না। তবে আশা করছি দ্রুতই বিষয়টি সমাধান হবে।