আন্তর্জাতিক মানের ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করতে এখনই সময় জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার

আন্তর্জাতিক মানের ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করতে এখনই সময় জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চিকিৎসাসেবার পরিধি ও অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে রোগ নির্ণয়ের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগও ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত, এমপি দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে এক বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, দেশে প্রায় ১০ হাজার ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ৭-৮টি। এই তথ্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার প্রতিফলন।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বহুল স্বীকৃত সত্য হলো-“সঠিক রোগ নির্ণয়ই সঠিক চিকিৎসার ভিত্তি।” রোগ নির্ণয়ে সামান্য ত্রুটিও একজন রোগীর জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। ভুল পরীক্ষার ফলের কারণে ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার, চিকিৎসায় বিলম্ব, অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাই একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে তার রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার নির্ভুলতা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
সংখ্যায় নয়, গুণগত মানেই হোক অগ্রগতি
গত দুই দশকে বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এবং গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য রোগ নির্ণয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক।
তবে প্রশ্ন হলো-এই বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কতগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হচ্ছে?
বাস্তবতা হলো, অনেক প্রতিষ্ঠান আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করলেও এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গুণগত মান ব্যবস্থাপনা (কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিয়মিত যন্ত্রের মান যাচাই (ক্যালিব্রেশন), বৈজ্ঞানিক মান নিশ্চিতকরণ, দক্ষ মানবসম্পদ, অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন স্বীকৃতি (অ্যাক্রেডিটেশন)-এর ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। ফলে একই পরীক্ষার ফল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন হতে পারে, যা রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই উদ্বেগজনক।

আন্তর্জাতিক মান বলতে কী বোঝায়?
অনেকের ধারণা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দৃষ্টিনন্দন ভবন কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশই একটি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক মানের করে তোলে। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক মানের মূল ভিত্তি হলো নির্ভুলতা, নির্ভরযোগ্যতা, রোগীর নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা এবং ধারাবাহিক গুণগত মান নিশ্চিত করা।
বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসা পরীক্ষাগারের জন্য আইএসও ১৫১৮৯:২০২২-কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই মানদণ্ড শুধু পরীক্ষার ফল নয়; বরং পুরো পরীক্ষাগারের ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং গুণগত মানকে মূল্যায়ন করে।
একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগারে নিশ্চিত করতে হবে—
* আইএসও ১৫১৮৯:২০২২ অনুযায়ী পরিচালিত গুণগত মান ব্যবস্থাপনা।
* প্রতিটি পরীক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রণীত মানসম্মত কার্যপদ্ধতি।
* দক্ষ ও প্রশিক্ষিত প্যাথোলজিস্ট, বায়োকেমিস্ট, অণুজীববিজ্ঞানী এবং মেডিকেল টেকনোলজিস্ট।
* যন্ত্রপাতির নিয়মিত মান যাচাই, কার্যকারিতা যাচাই এবং প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ।
* প্রতিদিনের অভ্যন্তরীণ মান নিয়ন্ত্রণ।
* নিয়মিত বহিরাগত মান মূল্যায়ন বা দক্ষতা যাচাই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ।
* রোগী শনাক্তকরণ থেকে রিপোর্ট প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ।
* আধুনিক পরীক্ষাগার তথ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা।
* তথ্যের গোপনীয়তা ও সাইবার নিরাপত্তা।
* নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন।
* বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড (বিএবি) অথবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থার স্বীকৃতি।
কেন জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি?
বর্তমানে দেশের অধিকাংশ রোগ নির্ণয় কেন্দ্র একই ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয় না। এর ফলে পরীক্ষার ফলাফলে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়, যা চিকিৎসা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
একটি শক্তিশালী জাতীয় মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে-
* পরীক্ষার ফলের নির্ভুলতা বৃদ্ধি পাবে।
* ভুল রোগ নির্ণয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
* অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যব্যয় হ্রাস পাবে।
* রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
* চিকিৎসকদের সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হবে।
* আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
* চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা কমবে।
* স্বাস্থ্যখাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
এখন কী করা প্রয়োজন?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, চিকিৎসক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে-
* পর্যায়ক্রমে সকল বড় রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে আইএসও ১৫১৮৯:২০২২ বাস্তবায়ন।
* বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অধিক সংখ্যক পরীক্ষাগারকে স্বীকৃতির আওতায় আনা।
* প্রতিটি পরীক্ষাগারে বাধ্যতামূলক অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা।
* দক্ষ জনবল তৈরি এবং ধারাবাহিক পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
* সকল যন্ত্রপাতির নিয়মিত মান যাচাই ও কার্যকারিতা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা।
* পরীক্ষাগার তথ্য ব্যবস্থাপনা, বারকোডভিত্তিক নমুনা অনুসরণ এবং ডিজিটাল মান পর্যবেক্ষণ চালু করা।
* লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সঙ্গে গুণগত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
* নিয়মিত সরকারি পরিদর্শন, স্বাধীন মূল্যায়ন এবং মানদণ্ড লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
রোগীরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন
গুণগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রোগীর সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অধিকার রয়েছে জানার-
* যে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করানো হচ্ছে সেটি বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড বা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কি না।
* সেখানে মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয় কি না।
* পরীক্ষার ফল কীভাবে যাচাই করা হয়।
* প্রয়োজনে পুনঃপরীক্ষা বা দ্বিতীয় মতামতের সুযোগ রয়েছে কি না।
সচেতন রোগীই একটি জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম শক্তি।
এখনই সময় পরিবর্তনের
মাননীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করতে হলে শুধু নতুন রোগ নির্ণয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের গুণগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় রোগ নির্ণয় গুণগত নিশ্চয়তা কর্মসূচি, আইএসও ১৫১৮৯-ভিত্তিক বাধ্যতামূলক মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নিয়মিত স্বীকৃতি প্রদান, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা সম্ভব।
উপসংহার
বাংলাদেশ উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও অর্থবহ করতে হলে হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, নির্ভুল এবং নিরাপদ রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজকের বাস্তবতা আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়; বরং প্রতিটি পরীক্ষার নির্ভুলতা, প্রতিটি প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রতিটি রোগীর নিরাপত্তাই হওয়া উচিত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রোগ নির্ণয় কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার। সরকার, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ড, চিকিৎসক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাজীবী সংগঠন, রোগ নির্ণয় প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই বাংলাদেশ একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, নির্ভরযোগ্য ও জবাবদিহিমূলক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
কারণ, একটি নির্ভুল পরীক্ষার প্রতিবেদন শুধু একটি কাগজ নয়-এটি একজন মানুষের জীবন রক্ষার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।