রোহিঙ্গা সংখ্যা ও পরিচিতি নিয়ে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর মিথ্যাচার

গণহত্যার অষ্টম বর্ষ

রোহিঙ্গা সংখ্যা ও পরিচিতি নিয়ে মিয়ানমারের নিষ্ঠুর মিথ্যাচার

ফন্ট সাইজ:

১৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মিয়ানমার ঘোষণা দেয় তারা ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘোষণাকে "বিভ্রান্তিকর" আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। আপাত দৃষ্টিতে মিয়ানমারের এই ঘোষণা ইতিবাচক মনে হলেও আসলে তা নিষ্ঠুর মিথ্যাচারের অংশ। ২৫ আগস্ট যখন রোহিঙ্গা গণহত্যার অষ্টম বর্ষ পূর্তি হবে, তখন সাজানো হিসাব-নিকাশের আলোকে মিয়ানমারের এই ঘোষণা যেন আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রতারণার ইঙ্গিত, যা তাদের গণহত্যার ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা বিষয়ক আরেক ষড়যন্ত্রেরই অংশ।

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পূর্ণমাত্রায় গণহত্যামূলক নির্যাতন শুরু হয় ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট। এই তারিখটিকে গণহত্যার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি' (ARSA) মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ৩০টি পুলিশ চৌকি ও একটি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায় মর্মে অভিযোগ উত্থাপন করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী 'ক্লিয়ারেন্স অপারেশন' নামে ব্যাপক ও নৃশংস অভিযান শুরু করে, যা আসলে ছিল এক লুক্কায়িত গণহত্যা।

গণহত্যার সূচনায় সামরিক বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক, সহিংস ও অমানবিক। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ইউএস হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম এবং ফরটিফাই রাইটস-এর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক লিঞ্চিং-এ অংশগ্রহণকারীরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের গুলি করে হত্যা করে, গলা কেটে হত্যা করে, জীবন্ত পুড়িয়ে মারে এবং ব্যাপক ধর্ষণ ও গণধর্ষণ চালায়।

ব্যাপক প্রাণহানির কারণে আরাকান রাজ্যে (বর্তমানে নাম বদল করে রাখা হয়েছে রাখাইন) সৃষ্ট উদ্বাস্তু সঙ্কট আঞ্চলিক বির্পযয় তৈরি করে। চিকিৎসা সহায়তাকারী সংস্থা মেডেসিন সান ফ্রন্টিয়ার্স (MSF) তাদের জরিপে জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই সহিংসতায় কমপক্ষে ৬,৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এই নির্যাতনের ফলে প্রথম ধাক্কায় প্রায় ৭.৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়, যা জাতিসংঘের মতে 'জাতিগত নিধন' (ethnic cleansing) এবং 'গণহত্যার সম্ভাব্য উপাদান'-এর শামিল। পরবর্তীতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও বিদ্রোহী আরাকান আর্মির অত্যাচারে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু স্রোত অব্যাহত থাকে।

গণহত্যা ও বাস্তুহীন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও জন্মগত ভূমি অধিকার কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি মিয়ানমার রোহিঙ্গা শরণার্থী সংখ্যা নিয়ে তৈরি করেছে উদ্দেশ্যমূলক বিভ্রান্তি। মিয়ানমার বলছে, বাংলাদেশের দেওয়া ৮,২৮,৮২৪ জনের তালিকা থেকে তারা যাচাই করেছে ৩,০৮,৭৯৭ জনকে। অর্থাৎ, তারা মেনে নিয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার রোহিঙ্গা ‘প্রাক্তন রাখাইন বাসিন্দা’। বাকি ৪,২৪১ জনকে তারা ‘সন্ত্রাসী’ বলছে, আর ১,১৩,৫০৭ জনকে ‘যাচাই করা সম্ভব হয়নি’ বলে দাবি করছে।

কিন্তু আমার নিজের সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও আহরিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচআর (UNHCR)-এর হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা রয়েছে ১২ লাখের বেশি। অথচ ২০১৭ সালের আগে ছিল প্রায় ৩-৩.৫ লাখ। ২০১৭ সালে নতুন আসে ৭.৫ লাখ। ইন্টারিম সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ২০২৫ সালে জানান, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ১.৫ লাখ নতুন রোহিঙ্গা ঢুকেছে। তার সঙ্গে প্রতি বছর গড়ে ৩০,০০০ হাজার জন্মহার যোগ করলে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৪-১৫ লাখ।

তাহলে হিসাবটা কী দাঁড়ায়, তা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখা যেতে পারে। ২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ৩.০-৩.৫ লাখ, ২০১৭ সালের গণহত্যায় নতুন আসা ৭.৫ লাখ, ২০২৪-২০২৫ সালে নতুন আসা ১.৫ লাখ, বিগত ৮ বছরে জন্ম (বার্ষিক ৩০,০০০) ২.৪ লাখ, বিদেশে পাড়ি দেওয়া বা মৃত্যু (আনুমানিক) -০.৫ থেকে -১.০ লাখ তথা সব মিলিয়ে বর্তমান আনুমানিক ১৪-১৫ লাখ।

মিয়ানমার যখন মাত্র ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি, তখন বাকি ১০-১১ লাখ রোহিঙ্গার কী হবে? তা;রে রোহিঙ্গা পরিচয় ও প্রত্যাবাসনের বিষয়টিই বা সম্পন্ন হবে? এই ঘোষণা কি এই বার্তা দেয় না যে, মিয়ানমার বাকি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে? এটি কোনো সমাধান নয়—এটি একটি অপঘাতী পরিকল্পনার সূচনা।

সংখ্যার পাশাপাশি দ্বিতীয় যে ষড়যন্ত্র মিয়ানমারের তরফে করা হচ্ছে, তা হলো পরিচয় বদলে দেওয়ার কৌশল। মিয়ানমার বলছে, রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে 'রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত' হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কে সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যে নিজেই গণহত্যার মূল অভিযুক্ত, তা রাখাইন বা সাবেক আরাকান থেকে বিতারিত। বিদ্রোহী আরাকান আর্মি, রাখাইনের বড় অংশ দখল করে আছে এবং তারাও রোহিঙ্গা নিধনে লিপ্ত রয়েছে।

রাখাইন বা আরাকানের দখল-কর্তৃত্বের অনিশ্চয়তায় নিরাপত্তার সমস্যা সৃষ্টিকারী মিয়ানমার এখন রোহিঙ্গাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিহিত করার কৌশল নিয়েছে এবং তাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করছে। অথচ রোহিঙ্গারা এই ভূখণ্ডে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছে। ১৯৮২ সালের বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন তাদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। মিয়ানমার যদি প্রথমে নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা না দেয়, তবে এই প্রত্যাবাসন কখনোই 'স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ' হবে না। বাংলাদেশ বারবার এই শর্তগুলো তুলে ধরেছে, কিন্তু মিয়ানমার তা এড়িয়ে চলছে।

গণহত্যার অষ্টম বর্ষপূর্তিতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার ডাক দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিজে) মামলা চলছে। কিন্তু বাস্তবে, ২০২৬ সালের যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনায় (জেআরপি) বাজেট ২৬ শতাংশ কমেছে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয় ১৫.৬ লাখ মানুষের জন্য বরাদ্দ ৭১০ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২৫০ মিলিয়ন ডলার কম। মানে, যেখানে খাদ্য সহায়তা কমছে, সেখানে মিয়ানমার বসে আছে—আর বাংলাদেশ ক্রমাগত বাড়তি বোঝা বইছে।

দুঃখজনক সত্য হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে দুর্বল অবস্থান নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার শর্তগুলো পরিষ্কার না হলে, আন্তর্জাতিক চাপ ছাড়া এই প্রত্যাবাসন কখনোই সফল হবে না।

শরণার্থী বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি স্পষ্ট বলতে চাই—২০২৬ সালের মিয়ানমারের ঘোষণা কোনো সমাধান নয়, এটি একটি কৌশলী ও ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ। মিয়ানমার ২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন চুক্তি করেও কোনো রোহিঙ্গা ফেরত নেয়নি। তারা চায়, বাংলাদেশে থাকা ১৪-১৫ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ৩ লাখকে 'আমলে নেওয়া' হোক, আর বাকিরা বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হোক, যা বাংলাদেশ এবং আঞ্চলিক পরিসরে একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট‘ নীতি ও বহুপক্ষী পদক্ষেপ নেওয়ার পথে চলছে, তা ইতিবাচক। তবে, বাংলাদেশ আরো কিছু বিষয় স্পষ্ট করতে হবে। যেমন, সমস্ত রোহিঙ্গার জন্য তাদের জন্মগত মিয়ানমারের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা—যাতে তারা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে পারে। সম্পূর্ণ তালিকার যাচাই—মিয়ানমার যেন বাংলাদেশের দেওয়া ৮.২৮ লাখ নামের সবাইকে যাচাই করে, কোনো 'সন্ত্রাসী' বা 'অযাচাইযোগ্য' তকমা না দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক—প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যেন জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থার তত্ত্বাবধানে হয়। রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা—যাতে ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গারা পুনরায় বাস্তুচ্যুত না হয়। ক্ষতিপূরণ ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া—যাতে গণহত্যার শিকাররা ন্যায়বিচার পায়।

আমরা মনে করি মিয়ানমারের ঘোষণা যেন আন্তর্জাতিক প্রতারণার নতুন অধ্যায় না হয়। গণহত্যার কলংক চেপে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ও পরিচিতি যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে মিয়ানমার। গণহত্যার অষ্টম বর্ষপূর্তিতে রোহিঙ্গাদের জন্য শুধু করুণার বাণী নয়—প্রয়োজন কঠোর ন্যায়বিচার, বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা, এবং তাদের মর্যাদার প্রতি অটল শ্রদ্ধা জানাতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানানোর বিষয়েও যেন সরকার পিছ পা না হয়। ফলে এমতাবস্থায় বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও জোরালো ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো এবং রোহিঙ্গাদের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান রাখা। কারণ, শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলেও তা কখনো বাতিল হয় না—আমাদের সেই প্রত্যাশায় বিশ্বাস রাখতে হবে। পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে, গণহত্যার মাধ্যমে রাখাইন বা আরাকান প্রদেশ খালি করে মিয়ানমার যেন সেখানকার ভূমিপুত্র রোহিঙ্গাদের বদলে অন্য কোনও জনগোষ্ঠী বসাতে না পারে। এবং বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা কমাতে না পারে বা তাদেরকে (শরণার্থী রোহিঙ্গাদের) ‘বাংলাদেশি’ বলে অভিহিত করার কৌশল কাজে লাগাতে না পারে।

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও পরিচিতি বদলে দেওয়ার রাজনীতিক-সামরিক কৌশলে মিয়ানমার যদি তার দেশের নাগরিকদের নিজের দেশের বাইরে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তাঞ্চলে ঠেলে দিতে সচেষ্ট হয়, তাহলে সেই অপচেষ্টা যে কোনও মূল্যে রুখতে হবে। নইলে শুধু বাংলাদেশই নয়, সমগ্র অঞ্চলে অশান্তির আগুন জ্বলে চরম অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হবে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।