সরকারের প্রথম ছয় মাসের কার্যক্রমকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
মঙ্গলবার সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, কোনও সরকারকে মূল্যায়নের জন্য ছয় মাস যথেষ্ট সময় নয়। তারপরও ব্যবসা পরিচালনা সহজ করা, বেসরকারি খাতকে সহায়তা এবং অর্থনীতির গতিধারা ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম এক মূল্যায়নে বলেন, বেসরকারি খাতকে সহায়তার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেয়া বেশ কিছু উদ্যোগ ইতিবাচক। বিশেষ করে রুগ্ণ, আংশিক বন্ধ ও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলোকে পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালু করতে প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়ার উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান।
তিনি বলেন, শিল্প ও ব্যবসার ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত জটিলতা সহজ করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। এতে ব্যবসার পরিবেশ কিছুটা সহজ হবে এবং উদ্যোক্তারা নতুন করে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবেন।
বিকেএমইএর সভাপতি বলেন, আংশিক রপ্তানিমুখী এবং বন্ড সুবিধাবিহীন রপ্তানিকারকদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি রপ্তানি খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সিদ্ধান্তের ফলে বন্ড সুবিধার বাইরে থাকা অনেক রফতানিকারক সহজে কাঁচামাল আমদানি করতে পারবেন। একই সঙ্গে তাদের উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে জটিলতা কমবে।
করনীতিতে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
শিল্পের বড় সংকট গ্যাস-বিদ্যুৎ
তবে সরকারের সামনে শিল্প খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে চিহ্নিত করেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির মতে, দীর্ঘদিনের এই সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার আগের সরকারের কাছ থেকে এসব সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রী ইতিমধ্যে স্বল্পমেয়াদে বেশ কিছু তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিয়েছেন। ব্যবসায়ী সংগঠন ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সংকটের বাস্তব চিত্র এবং সম্ভাব্য সমাধান সম্পর্কে তাদের পরামর্শও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শুধু তাৎক্ষণিক সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠার বিষয়েও সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন।
এলএনজি আমদানিতে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ
গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন ও নতুন সরবরাহ সক্ষমতা তৈরির বিকল্প নেই বলে মনে করছে বিকেএমইএ। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অর্থমন্ত্রীও সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে ব্যাখ্যা করেছেন যে এলএনজি সংকট সমাধানের কোনো ‘শর্টকাট’ নেই। নতুন একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনে প্রায় দুই বছর সময় প্রয়োজন।
সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে গ্যাস সংকট অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হবে।
বিকেএমইএ বলছে, শিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। কারণ জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু শিল্পপ্রতিষ্ঠানই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে রফতানি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
ব্যাংকিং খাতে সংস্কার হলেও সমস্যা রয়ে গেছে
ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া উদ্যোগগুলোকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বিকেএমইএ। তবে সংগঠনটির মতে, নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ব্যাংকিং খাতের আস্থার সংকট দূর করতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে সংগঠনটি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ
সরকারের প্রথম ছয় মাসের মূল্যায়নে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়টিও তুলে ধরেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির মতে, এ সময়ে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হয়েছে, যা ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশের জন্য উদ্বেগের বিষয়। ব্যবসায়ীদের মতে, শিল্প ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হলে জ্বালানি ও অর্থায়নের পাশাপাশি স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন, সে বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকা প্রয়োজন।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রত্যাশা
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম ছয় মাসকে ইতিবাচকভাবেই দেখছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির মতে, মাত্র ছয় মাসে কোনও সরকারের সামগ্রিক সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে এই সময়ে বেসরকারি খাতকে সহায়তা, ব্যবসা সহজীকরণ, রপ্তানি কার্যক্রমে নীতিগত সুবিধা এবং অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সামগ্রিকভাবে আমরা দেখছি, সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। আমরা আশা করি, তারা দীর্ঘমেয়াদে এসব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবে। বিকেএমইএর প্রত্যাশা, সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্প ও ব্যবসা খাতে আস্থা বাড়বে, উৎপাদন ও বিনিয়োগে গতি ফিরবে এবং অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাবে।
সরকারের প্রথম ছয় মাসের উদ্যোগকে ইতিবাচক: বিকেএমইএ
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অর্থ বাণিজ্য
১ ঘন্টা আগে
১৮ আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৯ঃ০২ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
