৬ মাসে সরকারের অর্জন নেই, ব্যর্থতা স্পষ্ট: জামায়াত

৬ মাসে সরকারের অর্জন নেই, ব্যর্থতা স্পষ্ট: জামায়াত

ফন্ট সাইজ:

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দৃশ্যমান কোনো সাফল্য আসেনি, বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গ্যাস-জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাত, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও পররাষ্ট্রনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারের কর্মকাণ্ডে হতাশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি। আজ বিকালে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মূল্যায়ন’ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

লিখিত বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর সরকারের কর্মকাণ্ডকে শুধু প্রতিশ্রুতির ভাষায় নয়, বাস্তব ফলাফল, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জনগণের প্রতি জবাবদিহির মানদণ্ডে মূল্যায়নের সময় এসেছে। দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে জামায়াত সেই মূল্যায়ন জাতির সামনে তুলে ধরছে।

জামায়াতের মূল্যায়নে প্রথমেই উঠে এসেছে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে জনগণ সুস্পষ্ট রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত গেজেট অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০টি এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যবধান আড়াই কোটিরও বেশি।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছিল। পরিষদকে প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের কাঠামো কার্যকর হয়নি। সরকার পরবর্তীতে সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের বিকল্প পদ্ধতির দিকে এগিয়েছে।

গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে সাময়িক সমস্যা নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। এর প্রভাব শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন খাতে পড়ছে বলেও উল্লেখ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম উৎপাদন হচ্ছে। প্রায় ২০টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ২০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে।

কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, মার্চে বাংলাদেশকে দুটি স্পট এলএনজি কার্গো কিনতে হয়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলার ও ২৩.০৮ ডলার দরে। পরবর্তীতে কাতারএনার্জি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ২০২৬ সালের এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও ইউজিসি চেয়ারম্যান নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, সরকারি ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তথ্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ তৈরি করছে। গোলাম পরওয়ার জানান, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে মার্চ-এপ্রিল সময়ে ৬০৫টি হত্যা, ২৯৪টি ছিনতাই, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনায় ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হওয়ার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

সরকার ‘বাংলাদেশ ফাস্ট’কে পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হিসেবে ঘোষণা করলেও ছয় মাসে এটিকে সুস্পষ্ট ও সমন্বিত কার্যকর কাঠামোয় রূপ দেয়া সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বলতে হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য আরও ‘ কনডুসিভ ইনভাইরনমেন্ট’ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুন ২০২৬-এ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ। অথচ জুন ২০২৫-এ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতের সংকট দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
গুম প্রতিরোধে সরকারের প্রস্তাবিত ‘প্রিভেনশন এন্ড রিমিডি অফ এনফোর্সড ডিজএপারেন্স এ্যাক্ট,২০২৬’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১৭ জুন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বিজিডি ৩/২০২৬ যোগাযোগের মাধ্যমে খসড়াটির কয়েকটি বিধান নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ জানিয়েছেন। টিআইবিও মাত্র এক দিনের সময় দিয়ে অংশীজনের মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে।

সরকারের প্রতি জামায়াতের ৮ দফা আহ্বান জানায় জামায়াতে ইসলামী। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ প্রকাশ।; গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত এনার্জি সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন।; প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা।; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি নিশ্চিত করা।; পররাষ্ট্রনীতিতে পূর্ণাঙ্গ ফরেন পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক প্রকাশ।; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেয়া।; ব্যাংকিং খাতে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফিরিয়ে আনা।; গুম প্রতিরোধ আইনে গোপন আটক বা অস্বীকৃত হেফাজতের সুযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ করা।

সরকারের দুটি সফলতার দিক তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে রিজার্ভের কিছুটা স্থিতিশীলতায় রয়েছে। এর পেছনে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই দাবি করে তিনি বলেন, প্রবাসে কর্মরত রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের পাঠানো অর্থের কারণে রিজার্ভে কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হিসেবে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবের কারণে বিদ্যমান জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকার ১০ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছেন। ৩০ দিনের মধ্যে ওই কমিটি সমস্যার কারণ ও সমাধানের পথ বের করেছিল। এটিকে বিরোধী দলের প্রস্তাবের কারণে সরকারের নেয়া একটি উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড.এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, রফিকুল ইসলাম খাম এমপি, মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম, প্রচার মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার প্রমুখ।