অস্ট্রেলিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার ও নিউ সাউথ ওয়েলস (এনএসডব্লিউ) সরকার। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ ও এনএসডব্লিউ প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স যৌথভাবে নতুন বন্দুক ফেরত (বাই-ব্যাক) কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ২ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু নিউ সাউথ ওয়েলসেই প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র প্রচলন থেকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ১৯৯৬ সালের পোর্ট আর্থার হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক বন্দুক ফেরত কর্মসূচির পর এটিই অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় উদ্যোগ। নতুন কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত আগ্নেয়াস্ত্র স্বেচ্ছায় জমা দিলে অস্ত্রের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। আর ২০২৭ সালের শুরুতে উচ্চমূল্যের কিছু আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত বাড়ানো হবে। সিডনির বন্ডি বিচে ভয়াবহ হামলার পর বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার ধারাবাহিকতায় এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নতুন আইনে সাধারণ লাইসেন্সধারীরা সর্বোচ্চ চারটি এবং বিশেষ পেশাগত প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিরা সর্বোচ্চ ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র রাখতে পারবেন। এর বেশি অস্ত্র সরকারের কাছে ফেরত দিতে হবে।
নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস নয়
এনএসডাব্লিউ প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স বলেছেন, এই কর্মসূচি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে, যা ফেডারেল ও রাজ্য সরকার ৫০:৫০ অনুপাতে বহন করবে। এটি ব্যয়বহুল হলেও মানুষের নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত মূল্য। তিনি জানান, নিউ সাউথ ওয়েলসে প্রায় ১২ লাখ নিবন্ধিত বন্দুকের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশকে এই সংস্কারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচনী ইস্যু করার হুঁশিয়ারি
কর্মসূচি নিয়ে বিরোধিতা বাড়তে থাকায় রাজনৈতিক উত্তাপও বাড়ছে। এনএসডাব্লিউ প্রিমিয়ার ক্রিস মিন্স হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, লিবারেল পার্টি ও ওয়ান নেশন যদি এই সংস্কারের বিরোধিতা অব্যাহত রাখে, তাহলে আগামী রাজ্য নির্বাচনে বিষয়টি নিয়ে লড়তে প্রস্তুত তার সরকার। ক্রিস মিন্স আরও বলেন, বিষয়টি নিউ সাউথ ওয়েলসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়ান নেশন ক্ষমতায় গেলে নতুন বন্দুক আইন বাতিল করার যে অবস্থান নিয়েছে, তার জবাব ভোটের মাঠেই দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
রাস্তা থেকে বন্দুক সরিয়ে নেওয়া
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ এই উদ্যোগকে অস্ট্রেলিয়ার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে বলেন, আমরা রাস্তা থেকে বন্দুক সরিয়ে ফেলতে এবং অস্ট্রেলীয়দের নিরাপদ রাখতে সম্ভাব্য সবকিছু করছি। সরকারের জাতীয় বন্দুক ফেরত কেনার পরিকল্পনা অতিরিক্ত, নতুন করে নিষিদ্ধ এবং অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র কমিউনিটি থেকে সরিয়ে নেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সব রাজ্য ও অঞ্চলে বন্দুক নিয়ন্ত্রণে একটি অভিন্ন কাঠামো থাকা জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে বন্দুক নিয়ন্ত্রণে রাজ্য ও অঞ্চলগুলোর সঙ্গে কাজ করতে ফেডারেল সরকার প্রস্তুত বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধীদের আপত্তি
তবে বিরোধীরা এই উদ্যোগকে কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখছে না। নিউ সাউথ ওয়েলসের লিবারেল নেত্রী কেলি স্লোনের দাবি, এই কর্মসূচি আইন মেনে চলা কৃষক, শিকারি ও বৈধ বন্দুক মালিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, কিন্তু সংগঠিত অপরাধী বা সম্ভাব্য সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা দেবে না। তার মতে, প্রকৃত হুমকি সংগঠিত অপরাধ ও সন্ত্রাসবাদ, তাই বৈধ অস্ত্রধারীদের লক্ষ্য করে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করা ভুল অগ্রাধিকার।
সব রাজ্য কি যোগ দেবে?
ফেডারেল সরকার জাতীয় পর্যায়ে একই ধরনের কর্মসূচি চালু করতে চাইলেও এখনো সব রাজ্য এতে সম্মতি দেয়নি। ভিক্টোরিয়া সরকার পুলিশের পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছে। রাজ্যটির শ্রমমন্ত্রী জন কেরি জানিয়েছেন, সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ৮৩ হাজার বন্দুক ফেরত নেওয়া হয়েছে এবং জাতীয়ভাবে অভিন্ন নীতিমালা সময়ের দাবি।
বন্ডির পর বদলে যাচ্ছে বন্দুকনীতি
সিডনির বন্ডি বিচে হামলার পর নিউ সাউথ ওয়েলস ইতোমধ্যে লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে দুই বছর করেছে। অস্ত্রের সংখ্যা সীমিত করা, লাইসেন্সধারীদের ওপর নজরদারি ও যাচাই আরও কঠোর করার পাশাপাশি এবার শুরু হচ্ছে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্দুক ফেরত কর্মসূচি। সরকারের আশা, অতিরিক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ আগ্নেয়াস্ত্র কমিউনিটি থেকে সরিয়ে জননিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। তবে এই কর্মসূচি জননিরাপত্তার নতুন ঢাল হবে, নাকি বৈধ বন্দুক মালিকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ, তা নিয়েই এখন অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় অস্ত্র ফেরত কর্মসূচি
ফেরত দিতে হবে বন্দুক, মিলবে ১০ হাজার ডলার
আলমগীর হোসেন রুহেল, সিডনি (অস্ট্রেলিয়া) থেকে
প্রবাস
১ ঘন্টা আগে
১৮ আগস্ট (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৪ঃ৫৬ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
