শীতলতা কমাতে দিল্লি-ঢাকার তৎপরতা

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণ

শীতলতা কমাতে দিল্লি-ঢাকার তৎপরতা

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান অব্যাহত রাখা, তার সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং এসব বক্তব্যের কারণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব- এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছে। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টিও জড়িয়ে গেছে বলে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানতে পেরেছে। তারেক রহমানের ভারত সফর ২১শে আগস্ট নির্ধারিত ছিল। এখন বিষয়টি কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে। সম্পর্কের টানাপড়েন আবারও সামনে আসার পর ভারত ও বাংলাদেশের কূটনীতিক এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছেন। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই দুই দেশের সম্পর্কে আবারও এই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

তবে কিছুদিন ধরেই সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। সর্বশেষ উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে। ওই দিন তার সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তি ছিল। সহিংস বিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর প্রথমবারের মতো তিনি একটি সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। অনলাইনে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভারতের একটি অজ্ঞাত স্থান থেকে অডিওর মাধ্যমে যুক্ত হন। এতে তিনি বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের আদালতে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে।

এর আগে গত ডিসেম্বরে ভারতের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়া হয়। তারেক রহমানের মা ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দাফন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ভারত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে পাঠিয়েছিল। ভারতের ওই উদ্যোগের পর তারেক রহমান বিএনপি’র নেতাদের নির্বাচনী প্রচারে ভারতকে আক্রমণের লক্ষ্য না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তিনিও নিজের বক্তব্যে সংযত ছিলেন এবং নির্বাচনী প্রচারের সময় কখনো ভারতকে আক্রমণ করেননি।

ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনে তারেক রহমান বিজয়ী হওয়ার পর তাকে অভিনন্দন জানানো প্রথম দিকের নেতাদের একজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্কের একটি পরিবেশ তৈরি হয়। তবে এপ্রিলের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে ভারতের বক্তব্য যথেষ্ট কড়া হয়ে ওঠে। বিজেপি জয়ের পর ভারতের ভূখণ্ডে অবৈধ অভিবাসীদের আটক করে ঠেলে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও ঢাকার কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি বলে সূত্র জানিয়েছে।
আসলে জুনের শুরুতেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দিল্লি ও ঢাকা আলোচনা করছিল। কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের আটক ও ফেরত পাঠানোর খবর প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এরপর তারেক রহমান তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যান। এই সফরকে দিল্লির প্রতি একটি বার্তা হিসেবেই দেখা হয়।
জুলাইয়ে দুই দেশ আবারও সম্পর্কের সুতো ধরে এগোনোর চেষ্টা করে।

১লা থেকে ১০ই আগস্টের মধ্যে তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের সম্ভাব্য তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছিল। তবে সেই সফর আর হয়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভারতের সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনকে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে ভারত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে এবং বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায়।
এরপর ভারত তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২১শে আগস্ট প্রস্তাব করে। কিন্তু এই তারিখ প্রস্তাবের পরপরই ঢাকা জানতে পারে, শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে দ্য ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’তে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সেখানে শেখ হাসিনার আগে থেকে রেকর্ড করা বক্তব্য প্রচার করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ছেড়ে পালানোর পর আগস্টেই প্রথমবার শেখ হাসিনা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন। এরপর ঢাকা তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে এবং বিষয়টি ভারত সরকারের কাছে উত্থাপন করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এর আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে ফোন করে প্রতিবাদ জানান তিনি। দোভাল তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন বলে জানা যায়। বলা হয়, ওই অনুষ্ঠানটি ছিল দিল্লিতে অবস্থানরত বিদেশি গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি মতবিনিময় মাত্র। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি উত্থাপন করেন। তবে ৫ই আগস্টের ওই মতবিনিময়ে বিদেশি সাংবাদিকদের পাশাপাশি ভারতীয় সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন। এতে ঢাকার প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হয়। দিল্লির বক্তব্য ছিল, ওই অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের ‘কোনো ভূমিকা ছিল না’ এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যকে তারা ‘সমর্থনও করেনি’। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতির ক্ষতি হয়ে গেছে। বিশেষ করে ৫ই আগস্টই শেখ হাসিনাকে একটি মঞ্চ দেয়া হয়। এদিন ঢাকায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভকারীদের স্মরণে একটি স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করা হয়। ভারতের ওই বিষয়টি বাংলাদেশের কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

এরপর তারেক রহমান ও দীনেশ ত্রিবেদীর প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে তারেক রহমান স্পষ্ট করে জানান যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ তার সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বা মূল দাবি। জানা গেছে, ঢাকা স্পষ্ট করে বলেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে সে বিষয়ে দিল্লি যদি সুস্পষ্ট ও যুক্তিসংগত উত্তর না দেয়, তাহলে তারেক রহমানের পক্ষে ভারত সফর করা কঠিন হবে। বাংলাদেশের একজন কর্মকর্তা বলেন, হাসিনা ইস্যুতে ভারত সরকারের অবস্থান কী, তা আমরা বোঝার চেষ্টা করছি। ভারত কি তাকে ঢাকায় ফিরে এসে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দিতে প্রস্তুত?

প্রায় একই সময়ে অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি পদক্ষেপে ভারতের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (র)-এর প্রধান পরাগ জৈন বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জানা গেছে, বৈঠকে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা তাকে বোঝান যে- শেখ হাসিনাকে নিয়ে ঢাকার উদ্বেগের বিষয়টি দিল্লিকে সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এর আগে চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পরিস্থিতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন। সূত্রের মতে, দুই বিষয়কে সরাসরি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত না করলেও ভারতীয় কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে- দিল্লি যদি চায় বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড থেকে ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের অনুমতি না দিক, তাহলে ভারতকেও একইভাবে সহযোগিতামূলক আচরণ করতে হবে।

দিল্লির দৃষ্টিভঙ্গি হলো, শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক পলাতক এবং রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী। তাকে বাংলাদেশের এমন উগ্রপন্থিদের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না, যারা ভারতের স্বার্থের জন্য নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করতে পারে। ভারতের একজন কর্মকর্তা বলেন, তিনি যদি নিজের ইচ্ছায় ফিরে যান, তাহলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানানো ছাড়া আমাদের আর তেমন কিছু করার থাকবে না। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ধারণা, শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে দিল্লি ঢাকার প্রতিক্রিয়াকে ‘অবমূল্যায়ন করেছে’। বিশেষ করে তার সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে, যখন ২০২৪ সালের ঘটনার ক্ষত এখনও তাজা, তখন তার বক্তব্য আরও বেশি ক্ষোভ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ভারতীয় কর্মকর্তাদের ধারণা, একটি সংবাদ সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশ ‘অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে’।

তবে দিল্লি ও ঢাকা- উভয়েরই নিজ নিজ দেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য একে অপরকে প্রয়োজন। তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার প্রথম মাসেই একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। জ্বালানি সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। তীব্র ডিজেল সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি তার সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন। অন্যদিকে দিল্লির প্রয়োজন তারেক রহমানের সরকারের সহযোগিতা, যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতবিরোধী শক্তিগুলো সীমান্তের নিরাপত্তা ও ভারতের স্বার্থের জন্য হুমকি তৈরি করতে না পারে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতেও বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন দিল্লির।

স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে দুই দেশের সামনে বেশ কয়েকটি অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চলতি বছর গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন এবং প্রায় দেড় দশক ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর। ফলে দুই দেশই এখন একটি কূটনৈতিক সমাধান বের করার চেষ্টা করছে। তারেক রহমানের ২১শে আগস্টের ভারত সফর এখনও আলোচনার টেবিলে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছানোর জন্য হাতে থাকা সময়কে খুবই কম বলে মনে হচ্ছে।

সূত্রের মতে, দিল্লিকে এখন এমন একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করতে হবে, যাতে দীর্ঘদিনের মিত্র ও বন্ধু শেখ হাসিনাকে সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে বৃটেনসহ সব দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দিল্লি সচেতনভাবেই শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় সূত্র বলেন, কিন্তু এর কারণে ঢাকার সরকারের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে না। এখানে সতর্ক ভারসাম্য প্রয়োজন এবং আমরা একটি সমাধান নিয়ে আশাবাদী।

(অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ)