আমি একজন চিকিৎসক হিসেবে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচানোর শপথ নিয়ে হাসপাতালের দরজায় প্রবেশ করি। প্রতিটি রোগীকে নিজের সর্বোচ্চ জ্ঞান, দক্ষতা ও বিবেক দিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আজ একটি প্রশ্ন আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়-জীবন বাঁচাতে গিয়ে একজন চিকিৎসক কি নিজের জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও পাবেন না?
অতি সম্প্রতি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া হামলার দৃশ্য শুধু একজন চিকিৎসকের রক্তাক্ত শরীরের ছবি নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার প্রতিচ্ছবি।
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন রোগীকে দীর্ঘদিন যথাযথ চিকিৎসা না করিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হলো। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন, কিন্তু কোনো শয্যা খালি নেই।
আমি প্রশ্ন করতে চাই-
আইসিইউতে শয্যা না থাকা কি চিকিৎসকের অপরাধ? একজন চিকিৎসক কি হাসপাতালের বাজেট নির্ধারণ করেন? একজন চিকিৎসক কি আইসিইউ নির্মাণ করেন? একজন চিকিৎসক কি জনবল নিয়োগ দেন?
উত্তর একটাই-না।
আমরা চিকিৎসকরা শুধু আমাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিবেক দিয়ে একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করি। কিন্তু যখন সেই চেষ্টাও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কাছে বাধাগ্রস্ত হয়, তখন ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে যাই আমরা।
আজ যে চিকিৎসকের শরীরে আঘাতের দাগ, কাল সেটি আপনার চিকিৎসকের শরীরেও হতে পারে। আজ যে হাসপাতালের কাচ ভাঙা হয়েছে, আগামীকাল সেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হয়তো আপনার বাবা, মা, সন্তান কিংবা প্রিয়জন চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকবেন।
দুঃখের বিষয়, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে বারবার একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। হামলা, ভাঙচুর, চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, তারপর কয়েক দিনের আলোচনা-এরপর আবার নীরবতা।
এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ বিচারহীনতা নতুন অপরাধের জন্ম দেয়। আমি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখতে চাই। যখন দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বড় ব্যবসায়ী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অসুস্থ হন, তখন তাঁরা কার কাছে ছুটে যান?
যখন তাঁদের পরিবারের কেউ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্যান্সার বা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হন, তখন দিন-রাত কারা তাঁদের জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করেন? যখন নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন, তখন কেন বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাঁদের চিকিৎসক বানাতে চান? কারণ তাঁরা জানেন-একজন দক্ষ চিকিৎসকের মূল্য কত।
তাহলে সেই চিকিৎসক যখন হাসপাতালের ভেতর নিরাপত্তাহীনতায় কাজ করেন, তখন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে আমরা কেন এত উদাসীন? আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাদের নিজেদের ঘরেও।
বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন কি সত্যিই চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে যথেষ্ট শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে?
প্রতিবার কোনো চিকিৎসক আক্রান্ত হলে আমরা বিবৃতি দেখি, মানববন্ধন দেখি, প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখি, কিন্তু কয়েক দিন পর সবকিছু আবার স্তব্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকের শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যায়, ভাঙা হাসপাতাল মেরামত হয়, কিন্তু চিকিৎসকদের নিরাপত্তাহীনতা থেকে যায় আগের মতোই।
শুধু নিন্দা, বিবৃতি কিংবা প্রতীকী কর্মসূচি দিয়ে আর চলবে না, সময় এসেছে ধারাবাহিক, সুসংগঠিত এবং ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেওয়ার।
আমরা চাই না আমাদের সংগঠনগুলো কেবল নিজ নিজ দলীয় কর্মসুচির সময় সক্রিয় হোক। আমরা চাই, চিকিৎসকের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনার পর তারা আইনি সহায়তা, বিচার প্রক্রিয়ার তদারকি, সরকারের সঙ্গে নীতিগত আলোচনায় নেতৃত্ব এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অবিচল অবস্থান গ্রহণ করুক। একজন চিকিৎসকের ওপর হামলা মানে শুধু একজন সদস্যের ওপর হামলা নয়-এটি সমগ্র চিকিৎসক সমাজের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত। আজ সময় এসেছে পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে দলীয় গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বাস্তব নেতৃত্বের পরিচয় দেওয়ার।
প্রয়োজন হলে দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আইনি লড়াই, নীতিগত চাপ এবং সাংগঠনিক আন্দোলন-সবকিছুই ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষী-একটি পেশাজীবী সংগঠনের শক্তি তার নির্বাচনী পোস্টারে নয়; তার শক্তি প্রমাণিত হয় সংকটের সময় সদস্যদের পাশে অটলভাবে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে। আজ চিকিৎসক সমাজ সেই দৃঢ় নেতৃত্বের অপেক্ষায়।
আমাদের দাবি:
* চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলার প্রতিটি ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
* হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করতে হবে।
* হাসপাতাল ভাঙচুর ও চিকিৎসাসেবা ব্যাহত করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
* চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও পেশাজীবী সংগঠন-সবার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা করুণা চাই না। আমরা শুধু চাই-একজন চিকিৎসক যেন হাসপাতালের ভেতরে নিরাপদে কাজ করতে পারেন।
কারণ-
যে দেশে চিকিৎসক নিরাপদ নন, সে দেশে কোনো রোগীও নিরাপদ নন। আজ সময় এসেছে নীরবতা ভাঙার।
চিকিৎসকের গায়ে হাত মানেই একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা এবং প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ চিকিৎসার অধিকারের ওপর আঘাত। আর একটি হামলা নয়। আর একটি রক্তাক্ত হাসপাতাল নয়। আর কোনো বিচারহীনতা নয়। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। হাসপাতালকে নিরাপদ করুন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে রক্ষা করুন।
সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন ।
লেখখ: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল ও ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।
