২০২১ সালের ১৫ আগস্ট দ্বিতীয়বারের মতো আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসে তালেবান। কাবুল পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দুই দশকের মার্কিন উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে গোষ্ঠীটি। রাজধানী কাবুলের সাবেক মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণের সামনে সাঁজোয়া যান, তালেবানের নিজস্ব সাদা-কালো পতাকা ও ব্যানার নিয়ে ব্যাপক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে একে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে উদযাপন করেছে তারা। তালেবানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজউদ্দিন হক্কানি এক ভিডিও বার্তায় একে ‘সাহস ও খোদায়ী সাহায্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাদের এই কথিত বিজয়ের পেছনের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গত পাঁচ বছরে দেশটি নিমজ্জিত হয়েছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক ও মানবাধিকার বিপর্যয়ে। নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে নির্বাসনে পাঠানো, লাখ লাখ শিশুর তীব্র অপুষ্টি, অর্থনীতিতে ধস এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে প্রায় গোটা আফগান জনগোষ্ঠী আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে দিশেহারা।
সহিংসতা হ্রাস, মাদক নির্মূল ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোয় অগ্রগতি
বহুমুখী সংকটের মধ্যেও গত পাঁচ বছরে কিছু ক্ষেত্রে দৃশ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও অগ্রগতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তালেবান প্রশাসন। দুই দশকের দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দেশজুড়ে বোমা হামলা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে এনেছে তারা। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য দূরপাল্লার সড়ক যোগাযোগ ও অবাধ যাতায়াত তুলনামূলক নিরাপদ হয়েছে। প্রশাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে মাদক নির্মূলে। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ নেতার জারি করা এক আদেশে আফিম বা পপি চাষ নিষিদ্ধ করার পর দেশটিতে মাদক উৎপাদন প্রায় ৯৫ ভাগ কমে গেছে। এটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মাদকবিরোধী সাফল্য বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করে কর আদায়ের পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে তারা। একই সাথে চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সাথে খনিজ সম্পদ, গ্যাস পাইপলাইন, সৌর বিদ্যুৎ ও সড়ক অবকাঠামো নির্মাণে বিভিন্ন অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য সচল রাখার উদ্যোগ নিয়েছে কাবুল।
নারীদের জীবনে চরম বৈষম্য, নিপীড়ন ও বন্দিদশা
পাঁচ বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণের পর তালেবান নেতারা কিছুটা উদার দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে একের পর এক জারি করা হয়েছে চরম দমনমূলক আইন। সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে দেশটির নারী ও কন্যাশিশুদের ওপর। বর্তমানে আফগানিস্তান বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের সব ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, এর ফলে অন্তত ২৫ লাখ কিশোরী তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ হারিয়েছে। এছাড়া নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া, সরকারি ও বেসরকারি বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা, এমনকি পার্ক, জিম ও বিউটি পার্লারে যাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পুরুষ অভিভাবক ছাড়া নারীদের দূরে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা এবং প্রকাশ্যে কণ্ঠস্বর শোনা যাওয়ার ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএন উইমেন)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশটির প্রায় অর্ধেক নারী এখন মাসে মাত্র এক বা দুইবার ঘরের বাইরে বের হতে পারেন। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ নারী মারাত্মক মানসিক সংকটে ভুগছেন। এছাড়া নতুন বিবাহ নীতিমালার কারণে কার্যত বাল্যবিয়ে বেড়ে গেছে এবং পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের আইনি সুরক্ষা সংকুচিত হয়েছে, যাকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো চরম লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন আখ্যা দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তহবিল সংকট, স্বাস্থ্য বিপর্যয় ও চরম খাদ্য সংকট
২০২১ সালের আগে আফগানিস্তানের জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ আসত আন্তর্জাতিক সাহায্য থেকে। তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর সেই অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা কয়েকশ কোটি ডলারের জাতীয় রিজার্ভ জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে দেওয়া জরুরি মানবিক সহায়তাও দাতা দেশগুলোর বাজেট কাটের কারণে নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও সেভ দ্য চিলড্রেনের তথ্যমতে, দেশটির সাড়ে চার কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ বা অর্ধেকেরও বেশি নাগরিক এখন বেঁচে থাকার জন্য বিদেশি ত্রাণের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। চলতি বছরে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ আফগান তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। মারাত্মক অপুষ্টতায় ভুগছে ৩৭ লাখেরও বেশি শিশু। এছাড়া অর্থাভাবে দেশজুড়ে বন্ধ হয়ে গেছে চার শতাধিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ক্লিনিক। চরম দারিদ্র্যের কারণে পরিবারগুলো অর্থ বা দেনা পরিশোধের বিনিময়ে নিজেদের অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা
এই সংকটের ওপর মারাত্মক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন নীতি। ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তান ও ইরান থেকে প্রায় ৬০ লাখ অনিবন্ধিত আফগান শরণার্থীকে সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে আরও প্রায় ২৭ লাখ মানুষ ফিরে আসার ঝুঁকিতে রয়েছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত, কর্মসংস্থানহীন এবং সহায়তাহীন একটি অর্থনীতিতে এই লাখ লাখ মানুষের পুনর্বাসন এক নতুন সামাজিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তালেবান প্রশাসন এখনও প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পার হলেও রাশিয়া ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশ তালেবানকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি। জাতিসংঘে আফগানিস্তানের স্থায়ী আসনটিও এখনও স্থগিত রয়েছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি যখন অন্যান্য যুদ্ধের দিকে, তখন আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ মৌলিক অধিকার ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
(প্রতিবেদন রয়টার্স, বিবিসি, সিএনএন, আল জাজিরা, ইকোনমিস্ট ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অবলম্বনে।)
