বল এখনো ভারতের কোর্টে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ত্বরিত দিল্লি ছুটে যান ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ঢাকার বার্তা পৌঁছে দেয়া। ঢাকা ছাড়ার পরের দিন ১১ই আগস্ট সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাৎ হয়। নরেন্দ্র মোদির বার্তা নিয়ে ত্রিবেদী শুক্রবার বিকালে ঢাকায় ফিরে এসেছেন। সূত্রের খবর, ফিরতি বার্তা নিয়ে আজ দিনের যেকোনো সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ত্রিবেদী। তাদের এই সাক্ষাতের পরই জানা যাবে তারেক রহমান ভারত সফরে যাচ্ছেন, কি যাচ্ছেন না। যদি নয়াদিল্লির তরফে ইতিবাচক বার্তা আসে তাহলে এ মাসেই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা বেশি। তবে দিল্লির মনোভাব মনঃপূত না হলে ঢাকা বিকল্প সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর হিমশীতল হয়ে পড়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার গঠনের আবহে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে ভারতকে বিশেষ মনোযোগী হতে দেখা যায়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত এপ্রিলে ঢাকায় নতুন দূত প্রেরণের ঘোষণা দেয় দিল্লি। এক্ষেত্রে রাজনীতিক কাম কূটনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীর নাম চূড়ান্ত করে ভারত সরকার। তিনি গত ১২ই জুন ঢাকায় আসেন। ঢাকায় পা রাখার ৫৯ দিন পর গত ১০ই আগস্ট প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎ পান ত্রিবেদী। সাক্ষাতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে সে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। ঢাকার তরফে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন ভারতীয় হাইকমিশনার।
এমন এক সময় ত্রিবেদীকে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়, যার পাঁচদিন আগে নয়াদিল্লির এক অনুষ্ঠানে কথা বলেন শেখ হাসিনা। এই ইস্যু দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় আঘাত হানে। শেখ হাসিনা গত ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাব-এর অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে কথা বলেন। এই ঘটনার দুইদিন আগে ত্রিবেদীকে ডেকে ঢাকার তরফে সতর্ক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যদি হাসিনা ভারতে বসে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ পান তাহলে তা দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু হাসিনাকে অনুষ্ঠানে যোগদান থেকে বিরত রাখতে ভারত সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ঢাকার সতর্কবার্তার পরেও হাসিনা কথা বলেন এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নিয়ে তীব্রভাবে বিষোদ্গার করেন।
ওই ঘটনার কড়া প্রতিক্রিয়া দেয় ঢাকা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াটি ছিল নজিরবিহীন। পরে অবশ্য নয়াদিল্লিও দায়সারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে নিয়ে হাসিনার কোনো বক্তব্যে তাদের সমর্থন নেই।
এমন বৈরী আবহে গত ৯ই আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার। সাক্ষাতে হাসিনা ইস্যুতে ঢাকার ক্ষোভের বিষয়টি সামনা সামনি জানিয়ে দেয়া হয়। ড. খলিল বলেন, সরকার আশা করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ঢাকার বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরের দিন ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পান। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তাকে সাক্ষাৎ দেন। এসব সাক্ষাতে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে অনূকুল পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়ে ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঢাকা। পাশাপাশি হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু ত্বরান্বিত করার বিষয়েও তাগাদা দেয়া হয়। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে প্রথমে দুই দেশের সরকার প্রধানের একসঙ্গে বসতে হবে বলে মনে করে ভারত। বিষয়টি ইঙ্গিত দিয়ে সাংবাদিকদের ভারতীয় দূত বলেন, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
সরকার গঠনের পর প্রথমেই তারেক রহমানকে সফরে নেয়ার আগ্রহের কথা জানায় বাংলাদেশের সঙ্গে চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেয়া প্রতিবেশী ভারত। ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নয়াদিল্লির সেই আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন দেশটির স্পিকার ওম বিড়লা। তবে এতে সরকারের তরফে সায় ছিল না। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফরে যান মালয়েশিয়ায়। সেখান থেকে দ্বিতীয় সফরে চীন যান ঢাকার জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রধান। তার বেইজিং সফরের ওপর ভারত বিশেষ নজর রেখেছে। তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্টের কাছে নিজের পরিচয়পত্র (লেটার অব ক্রেডেন্সিয়াল) জমা দেন ত্রিবেদী। এর পরের দিন প্রায় ১৮ মাস বন্ধ রাখা ভারতীয় ভিসা সেন্টার খোলার ঘোষণা দেয়া হয়।
গত ২৩শে জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর তরফে সেপ্টেম্বরে আসন্ন ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু আমন্ত্রণপত্রটি যথাযথ ছিল না বলে মনে করে ঢাকা। সেখানে তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে দাওয়াত দেয়া হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ব্রিকসে প্রধানমন্ত্রীকে দাওয়াত দেয়া হয়নি। দাওয়াত দেয়া হয়েছে বিমসটেক-এর চেয়ারম্যানকে। এর পার্থক্য বুঝতে হবে। এই জটিলতা থেকেই প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলন যাওয়া প্রায় অনিশ্চিত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর প্রথম সাক্ষাৎ হয় ৩০শে জুলাই। ঢাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর ঢাকায় আসার ঠিক একদিন আগে। সেদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদী জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ভারত। মূলত এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আলোচনা জোরদার হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহেই এ সফর হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, এখনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি। সূত্রের খবর, ঢাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নয়াদিল্লির ফিরতি বার্তার উপরই প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়টি নির্ভর করছে।
