বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ, স্বাভাবিক হচ্ছে কারখানা

বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ, স্বাভাবিক হচ্ছে কারখানা

ফন্ট সাইজ:

একটানা তীব্র গ্যাস সংকটের পর অবশেষে দেশের শিল্পাঞ্চলে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। মহেশখালীর সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দু’টি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়া শিল্পকারখানাগুলো আবার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরছে। এতে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, 
ওষুধ ও গ্লাস শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও গ্যাসের সংকটের অচলাবস্থা অনেকটাই কেটেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বৃদ্ধি এবং জাতীয় গ্রিডে স্থানীয় কূপ থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় এই অবস্থার উন্নতি হয়েছে। অর্থাৎ এলএনজি সরবরাহের দু’টি ভাসমান টার্মিনালের মধ্যে সামিট পুরোদমে এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আংশিক চালু হওয়ায় শনিবার ভোর থেকে গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। তবে সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েকদিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, শনিবার সামিট থেকে প্রায় ৪৬ কোটি ঘনফুট এবং এক্সিলারেট থেকে প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। দুই টার্মিনাল মিলে এলএনজি থেকে প্রায় ৭৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। ফলে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি এখনো যথেষ্ট।

জানা গেছে, বিগত কয়েক মাস ধরে চরম গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নরসিংদী ও সিলেট, চট্টগ্রাম এলাকার শত শত কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছিল। অনেক স্থানে বয়লার চালু রাখাই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, যার ফলে নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে তৈরি হয়েছিল ঘোর অনিশ্চয়তা।

কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ’র সূত্র জানায়, শিল্প এলাকাগুলোতে গ্যাসের চাপ (প্রেসার) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ মেলায় কারখানাগুলোতে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে।

এখনো অনিশ্চয়তা
তবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার ক্ষেত্রে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। এ সময় টার্মিনাল থেকে টানা ৭২ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখতে হবে। ফলে ওই পরীক্ষা শুরু হলে জাতীয় গ্রিডে আবার গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দু’টি বয়লার রয়েছে। প্রতিটির সক্ষমতা দিনে ৩০ কোটি ঘনফুট। একটি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটি চালু হলে এক্সিলারেটের সরবরাহ আরও বাড়বে। তখন জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ঘাটতিও কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে। তবে দুই টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান গণমাধ্যমে জানান, দু’টি টার্মিনাল থেকেই বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে। সামিটের টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক সক্ষমতায় গ্যাস দিচ্ছে। সরবরাহ বাড়ায় গ্রাহকরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখা জরুরি। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে পোশাকখাতসহ অন্যান্য রপ্তানি খাত সময়মতো আন্তর্জাতিক অর্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
হবিগঞ্জের ১৭১ শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক: টানা তিনদিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার পর হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ মোটামুটি ভালো রয়েছে বলে জানিয়েছেন জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের কর্মকর্তারা। এতে কয়েকদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্প-কারখানাগুলোতে আবারো উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন-দক্ষিণ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, হবিগঞ্জ লাইনে এখন গ্যাসের সরবরাহ মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। আশা করি, অব্যাহত থাকবে, যদি এলএনজি সরবরাহ ঠিক থাকে।’

জালালাবাদ গ্যাসের শাহজীবাজার ব্যবস্থাপক খালেদ গনি বলেন, শনিবার সকাল থেকেই হবিগঞ্জের শিল্প-কারখানাগুলোর লাইনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে। গ্যাসের সরবরাহ অব্যাহত থাকলে বন্ধ থাকা কারখানাগুলো পর্যায়ক্রমে উৎপাদনে ফিরতে পারবে।

সায়হাম স্পিনিং মিলসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা লিয়াকত হোসাইন জানান, সকাল থেকেই তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কয়েক দিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় ক্ষতি হয়েছে। তবে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।

এর আগে প্রায় ২০ দিন ধরে হবিগঞ্জে গ্যাস সংকট চলছিল। শুরুতে চাহিদার তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ করা হলেও কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুধবার (১২ই আগস্ট) থেকে শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি শিল্প-কারখানার প্রায় সবগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে। অবশ্য শনিবার থেকে আবার স্বাভাবিক হচ্ছে বলে জানান কারখানা সংশ্লিষ্টরা।
ওদিকে, গ্যাসের সংকটে শনিবারও সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ ছিল না। যে স্টেশনে গ্যাস ছিল, সেখানে ছিল দীর্ঘ গাড়ির সারি। সকাল থেকে দুপুর- ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেছেন সিএনজিচালিত গাড়ির চালকরা। গ্যাসের জন্য এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনেও ছুটেছেন তারা। চালকরা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় জ্বালানি সংগ্রহে কয়েক গুণ বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে। কোথাও গ্যাস না থাকায় এক স্টেশনে গিয়ে ফিরে আসতে হয়, আবার কোথাও গ্যাস থাকলেও কম চাপের কারণে সিলিন্ডারে স্বাভাবিক পরিমাণ গ্যাস ঢুকছে না। ফলে কিছু সময় গাড়ি চালিয়ে ফের গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে চালকদের।