১৫ই আগস্ট ঘিরে হাই অ্যালার্টে প্রশাসন ধানমণ্ডিতে উত্তেজনা

১৫ই আগস্ট ঘিরে হাই অ্যালার্টে প্রশাসন ধানমণ্ডিতে উত্তেজনা

ফন্ট সাইজ:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে রাজধানীসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশি টহলসহ নেয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। বসানো হয়েছে তল্লাশি চৌকি। সাদা পোশাকেও নজর রাখছেন র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি, সিআইডিসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা। রাখা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিমও। বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে। ফুল দিতে গিয়ে আটকও হয়েছেন একজন। আর ভিডিও করার অপরাধে মারধর করে পুলিশে দেয়া হয়েছে ৫ জনকে। গণপিটুনি খেয়ে দৌড়ে পালিয়েছেন আরও দুই যুবক।

সরজমিন গতকাল দেখা গেছে, ধানমণ্ডি-৩২ নম্বর রাস্তার মূল প্রবেশপথে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নিয়ে আছে বেশ সংখ্যক পুলিশ সদস্যরা। যানবাহন তো দূরের কথা কোনো সাধারণ পথচারী ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করতে পারছেন না। ছিল সশস্ত্র র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও এপিবিএন সদস্যরাও। ব্যারিকেডের ঠিক পেছনেই প্রস্তুত রাখা হয়েছে হলুদ রংয়ের একটি জলকামান। তার পেছনেই সাঁজোয়া যান। ৩২ নম্বর দিয়ে লেকে ঢোকার রাস্তাও বন্ধ করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে, লেকের পাশে এমনকি পেছনের দিকের রাস্তাতেও অবস্থান নিয়ে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। শেখ মুজিবের পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির ছবি পর্যন্ত তোলার অনুমতি দিচ্ছিলেন না তারা। এরইমধ্যে গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাঙা বাড়ির সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসা অর্ণব দাস নামে একজনকে আটক করে পুলিশ। তার মোবাইলে যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়ায় পরে তাকে ধানমণ্ডি থানায় পাঠানো হয়।

এরপর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করার সময়ে আলমাস নামে এক রিকশাচালককে বেধড়ক মারধর করে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দেয়া একদল তরুণ। ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ (এসডিএফ) নামে একটি সংগঠনের সদস্য সচিব বলে পরিচয় দেয়া আ ন ম আয়াস নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ওই রিকশাচালককে মারধর করে তারা। ওই সময় নিজেকে জুলাইযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে আয়াস রিকশাচালকের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নিয়ে তল্লাশি করে। এরপর তিনি দাবি করেন- ওই রিকশাচালক ৩২ নম্বরের ভিডিও করে যুবলীগের একজনকে পাঠিয়েছেন। পরে তারা মারধর করে ওই রিকশাচালককে পুলিশে সোপর্দ করেন।

পুলিশ ওই রিকশাচালককেও ধানমণ্ডি থানায় নিয়ে যায়। রিকশাচালককে মারধরের সময়ই সেখানে থাকা আরেক ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। পরে তাকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে দৌড়ে পালিয়ে যান ওই ব্যক্তি। দুপুর ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শিঙাড়া বিলি করছেন এমন অভিযোগ এনে আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে আয়াস ও তার সঙ্গীরা। মারধরের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিও দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যান। ওই একই সময়ে নিজেকে সংবাদকর্মী দাবি করে পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করা আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে পুলিশে দেয় আয়াস। তাকেও পাঠানো হয় ধানমণ্ডি থানায়। সন্ধ্যায় দুই নারীসহ আরও তিনজনকে পুলিশে দেয়া হয়। এ ছাড়াও আরেক রিকশাচালকসহ আরও বেশ কয়েকজনকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী সন্দেহ হওয়ায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর থেকে তাড়িয়ে দেয় আয়াস ও তার সঙ্গীরা।

পুলিশের সামনেই শুধুমাত্র সন্দেহের বসে মানুষকে মারধরের বিষয়ে আ ন ম আয়াস বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যাতে কোনো অপতৎপরতা করতে না পারে, সে জন্য আমরা অবস্থান নিয়ে আছি। ধানমণ্ডি-৩২ নম্বর, শাহবাগ, মহাখালী বাসস্ট্যান্ডসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আমাদের লোক আছে। আওয়ামী লীগের কাউকে পেলেই আমরা পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছি। আমরা পুলিশকে সহায়তা করছি। ‘মব সৃষ্টি করে কাউকে মারধর করতে পারেন কিনা’- এমন প্রশ্নের জবাবে আয়াস বলেন, আমরা মব সৃষ্টি করছি না। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ পেলে ধরে শুধু পুলিশের কাছে সোপর্দ করছি।
এদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র ধানমণ্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম বলেছেন, শনিবার সকালে ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে ফুল দিতে আসা অর্ণব দাস নামে এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে। প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া এক রিকশাচালকসহ আরও ৫ জনকে আমাদের পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছে। তাদের সকলকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:
নাটকীয় মোড়

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র রমনা বিভাগের ধানমণ্ডি জোনের সহকারী কমিশনার সাদ্দাম হোসেন বলেন, যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও তাৎক্ষণিকভাবে মোকাবিলা, প্রতিহত করার জন্য ধানমণ্ডি-৩২ নম্বরে পুলিশে উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে জলকামানও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি আমাদের কন্ট্রোলে আছে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এ পর্যন্ত ঘটেনি।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন, উগ্রবাদী গোষ্ঠী বা দুষ্কৃতকারী যাতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে এই জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টার, র‌্যাব হেডকোয়ার্টের পক্ষ থেকে প্রতিটি ইউনিটকে বিশেষ বার্তা দেয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঠে থেকে নিজ নিজ এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকির নির্দেশ দিয়েছে ডিএমপি সদর দপ্তরও।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নিয়াজ মেহেদী বলেছেন, ১৫ই আগস্টকে কেন্দ্র করে শুক্রবার থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পিকেট ও চেকপোস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। নগরীর প্রবেশপথগুলোতেও চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সদস্যরা অপারেশনাল কার্যক্রমে মোতায়েন রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও জনসমাগমস্থলে সোয়াত, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এবং কে-নাইন ইউনিটের সদস্যরা সুইপিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়েছে। এসব এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। সিটিএসবি ও আইএডি’র সদস্যরা সাদা পোশাকে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা ও তথ্য সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় পর্যাপ্ত কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) প্রস্তুত ও মোতায়েন রাখা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত র‍্যাব ও সিআইডি’র টিমও মোতায়েন রয়েছে বলেও জানিয়েছেন ডিএমপি এই মুখপাত্র।