তাইওয়ানে চীনের সামরিক আগ্রাসন দেশটির জন্য একটি ‘অস্তিত্বের ঝুঁকি’ হয়ে উঠতে পারে এবং ইতিহাসে বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইওয়ানের দৃঢ় সামরিক প্রতিরোধ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য হামলার আগাম লক্ষণ- সব মিলিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করলে তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। শি জিনপিং ব্যর্থতার আশঙ্কায় তাইওয়ানে হামলা চালাতে ভয় পান- এমন অভিযোগও রয়েছে। কারণ, অভিযান ব্যর্থ হলে তার দীর্ঘদিনের শাসনও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
চীনে দীর্ঘদিন কাজ করা সাবেক বৃটিশ কূটনীতিক ওবিই সম্মাননাপ্রাপ্ত চার্লি পার্টন দ্য সান’কে বলেন, তাইওয়ানে হামলা হবে ‘অস্তিত্বের জন্য বড় ধরনের জুয়া’।
শি ব্যর্থ হলে চীনের অভ্যন্তর থেকেই ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, যুদ্ধের কারণে চীনের অর্থনীতি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। বিপুলসংখ্যক তরুণ যুদ্ধে প্রাণ হারালে জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ফলে বেকারত্ব বাড়বে এবং সুশাসনের জন্য শির যে ভাবমূর্তি রয়েছে, সেটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চার্লি পার্টন লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) সহযোগী ফেলো। তার মতে, তাইওয়ানে সফলভাবে আক্রমণ চালানো চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
১০০ মাইল সমুদ্র পাড়ি দিয়েই বড় বাধা
তাইওয়ানে উচ্চঝুঁকির উভচর সামরিক অভিযান চালাতে হলে চীনকে প্রায় ১০০ মাইল উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সুরক্ষিত দ্বীপটিতে পৌঁছাতে হবে। সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতি অতিক্রম করে চীনা বাহিনী উপকূলে পৌঁছাতে পারলেও তাদের সরাসরি যুদ্ধের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশ করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা বাহিনী বাস্তবে অবতরণ করতে পারবে- এমন উপযোগী সৈকতের সংখ্যা খুবই সীমিত। সেখানে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর তাইওয়ানের বাহিনীর হামলা শুরু হতে পারে।
চার্লি বলেন, তাইওয়ানে অবতরণের মতো মাত্র প্রায় ১৩টি সৈকত রয়েছে। চীন আকাশপথে সেনা নামানোর চেষ্টা করলেও ড্রোন প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে সেসব সেনা আকাশেই গুলির শিকার হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকবে।
তার মতে, তাইওয়ান যদি যথাযথভাবে প্রস্তুতি নিয়ে রাখে, তাহলে দেশটিতে আক্রমণ চালানো অত্যন্ত কঠিন হবে এবং চীনের সফল হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে।
হামলার প্রস্তুতিই হয়ে উঠতে পারে চীনের দুর্বলতা
তাইওয়ান দখলের চীনা পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি খুব সহজেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠা। বছরের পর বছর ধরে বেইজিং তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে এবং তাইপের কাছাকাছি এলাকায় সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
এই শক্তি প্রদর্শন ভয় তৈরি করলেও এর আরেকটি দিক হলো, তাইওয়ান সম্ভাব্য হামলার জন্য সবসময় উচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে পারছে এবং চীনা সামরিক তৎপরতার ওপর নিবিড় নজর রাখতে পারছে।
চার্লির মতে, ইতিহাসের সঙ্গে তুলনা করলে তাইওয়ানে সামরিক অভিযান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডি-ডে অবতরণের মতোই জটিল হতে পারে। ডি-ডে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমুদ্রপথে সামরিক অবতরণ। তবে মিত্রবাহিনী ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে নরম্যান্ডিতে যে দূরত্ব অতিক্রম করেছিল, তাইওয়ান প্রণালি পাড়ি দেয়ার দূরত্ব তার চেয়েও বেশি।
তাইওয়ানে হামলা চালাতে শি’কে বিপুলসংখ্যক সেনা, সামরিক সরঞ্জাম এবং আকাশ সহায়তা প্রস্তুত করতে হবে। এই বিশাল প্রস্তুতিই সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ‘স্পষ্ট সতর্কবার্তা’ হয়ে উঠবে।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ তাইওয়ানে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা পাঠানোর সময় পেয়ে যাবে এবং চীনের জন্য অভিযান আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
তাইওয়ান অবরোধ করলেও বিপদ
তাইওয়ানের চারপাশে অবরোধ আরোপের চেষ্টা করলেও চীন বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ, এর মাধ্যমে তাইওয়ান প্রণালির একটি বড় অংশ কার্যত বন্ধ করে দিতে হবে।
এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ এশিয়ার বাণিজ্যের একটি বিশাল অংশ বহন করে। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। তাইওয়ান প্রণালি পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেরও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করেছে।
বেইজিং যদি এই বাণিজ্যপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে পুরো অঞ্চলে অর্থের প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। এর প্রভাব চীনের অর্থনীতিতেও পড়বে।
চার্লির মতে, এর ফলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। চীনের মূল ভূখণ্ডও এই বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হওয়ায় সেখানেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে।
এর পরিণতিতে চীনে ব্যাপক বেকারত্ব ও অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তা ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির জন্যই অস্তিত্বের হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তাইওয়ান দখলের পরও শান্তি আসবে না
চীন কোনোভাবে তাইওয়ান দখল করতে সক্ষম হলেও দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে রাখা আরও কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাইওয়ানের প্রশিক্ষিত সেনাদের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে চীনা বাহিনী। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর গেরিলা যুদ্ধ চললে চীনের জনগণের কাছেও সেটি রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠবে।
চার্লির মতে, শি জিনপিং এমন পরিস্থিতিতে ভাবতে পারেন- যদি কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে গেরিলা প্রতিরোধ মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে সেটি চীনা জনগণের কাছে ভালো দেখাবে না।
শি’র ক্ষমতার প্রতি প্রবল আকাঙ্ক্ষাও তাকে তাইওয়ানে হামলা থেকে বিরত রাখতে পারে বলে মনে করেন এশিয়াবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ।
২০১৮ সালে চীনের প্রেসিডেন্টের মেয়াদসীমা তুলে দেয়ার মাধ্যমে শি নিজের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছেন। তিনি এখন একটানা ১৩ বছর ধরে চীনের শীর্ষ নেতা এবং কার্যত তার ক্ষমতার ওপর কোনো বড় রাজনৈতিক বাধা নেই।
চার্লির সতর্কতা, ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি শি কোনোভাবেই নিতে চাইবেন না। কারণ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৃটেনের মতো নয়, যেখানে নির্বাচনে হেরে গেলেও কয়েক বছর পর আবার ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ থাকে। চীনে ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়লে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
তাই তার মতে, তাইওয়ানে সামরিক হামলার পরিবর্তে চীন আরও দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এর মাধ্যমে তাইওয়ানের জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হতে পারে যে চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়া অনিবার্য।
কোন পরিস্থিতিতে হামলা চালাতে পারেন শি?
চার্লি পার্টনের মতে, শি জিনপিংয়ের মতো হিসাবি নেতা তখনই তাইওয়ানে হামলার সিদ্ধান্ত নেবেন, যখন ব্যর্থতার আশঙ্কা প্রায় পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে।
প্রথম শর্ত হবে, পিএলএ এতটাই শক্তিশালী ও কার্যকর হয়েছে বলে শি’র বিশ্বাস করতে হবে যে তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে যুদ্ধে জয়ী হতে পারবে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আটকে পড়বে না।
দ্বিতীয়ত, শি’কে বিশ্বাস করতে হবে যে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও দ্রুত তাইওয়ানের সহায়তায় পৌঁছাতে পারবে না। এ ছাড়া চীনকে সম্ভাব্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে যুদ্ধে না জড়ালেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে।
চার্লির মতে, চীনের শক্তিশালী অর্থনীতি থাকলেও পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর সম্পদ, সরবরাহ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্ভরতা কমিয়ে পর্যাপ্ত আত্মনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।
চীনের অর্থনীতি যদি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর মতো যথেষ্ট স্বনির্ভর না হয়, তাহলে যুদ্ধের পর দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পতন অনিবার্য হতে পারে।
তাই এসব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাইওয়ান দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা চীনের কাছে আপাতত ‘পেছনের সারিতে’ রাখাই স্বাভাবিক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
