সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার খবর ‘চট্টগ্রাম-নারায়ণগঞ্জে হাজার কারখানা নীরব’। প্রতিবেদনে বলা হয়, রডের মধ্যবর্তী কাঁচামাল উৎপাদন করে চট্টগ্রামভিত্তিক ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপ। চলমান গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটি কাঁচামাল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রায় একই ধরনের প্রভাব পড়েছে ইস্পাত, কাচ, ভোজ্যতেল, অক্সিজেন প্লান্টসহ গ্যাসনির্ভর আরও অন্তত ১০০ ভারী শিল্পকারখানায়।
নারায়ণগঞ্জ ও হবিগঞ্জে গ্যাস সংকটের কারণে ভারী শিল্পের পাশাপাশি প্রায় এক হাজার তৈরি পোশাক কারখানায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে কাচ, ইস্পাত উৎপাদনে অচলাবস্থা
বিএসআরএম গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন গড়ে আট হাজার টন পণ্য উৎপাদন হয়। কিন্তু গ্যাস সংকটে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বন্ধ আছে। তবে এইচএম স্টিল দিনের দুটি শিফট বন্ধ রেখে শুধু রাতে একটি শিফট চালু রেখেছে। শুধু বিএসআরএম বা এইচএম স্টিল নয়; চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় গ্যাসনির্ভর আরও অন্তত ১০০ ভারী শিল্পকারখানায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতি পোষাতে অনেকে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রাখছেন।
বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেন, ‘গ্যাসের চাপ কম থাকলে কারখানা চালু রাখতে বেগ পেতে হয় আমাদের। অনেক মেশিনারিজ নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য কারখানা বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে।’
এইচএম স্টিলের পরিচালক সারওয়ার আলম বলেন, ‘আমাদের গোল্ডেন ইস্পাত কারখানা বন্ধ রয়েছে। এইচএম স্টিলে দুটি ইউনিট থাকলেও তাতে দিনের বেলার দুই শিফট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। রাতে গ্যাসের চাপ একটু বাড়লে এক শিফটে কারখানা চালু রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।’
টি কে গ্রুপের পরিচালক তারিক আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কর্ণফুলী স্টিলের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১৮ হাজার টন। বুধবার অল্প কিছু উৎপাদন করা গেলেও গত দুই দিন কোনো উৎপাদনই হয়নি। এ পরিস্থিতি কতদিন চলবে, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু এটা আমাদের জানাটা খুবই জরুরি। বিকল্প জরুরি ভিত্তিতে ঠিক করতে হবে সরকারকে।’
গ্যাস সংকটে কিছু কারখানা বন্ধ রাখার সুযোগ থাকলেও কাচ উৎপাদনের কারখানার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ নেই। এর চুল্লি গ্যাসনির্ভর। একবার চুল্লি চালু হলে তা টানা প্রায় এক যুগ সচল রাখতে হয়। গ্যাসের অভাবে কোনো কারণে চুল্লি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি পুনরায় চালুর সুযোগ থাকে না। তখন পুরোনো চুল্লি ভেঙে নতুন চুল্লি স্থাপন করতে হয়, যাতে নতুন করে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।
পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্যাস পর্যাপ্ত না থাকায় পিডিবি থেকে সামান্য যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছি, তা দিয়ে কোনো রকমে শুধু বার্নারগুলো জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ, চুল্লি একবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি আবার চালু করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে। নতুন করে কয়েকশ কোটি টাকা আবার বিনিয়োগ করতে হবে।’
জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, ‘কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ অনেক দিন ধরেই কম। তারপরও উৎপাদন কমিয়ে কোনোভাবে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু এখন আর সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে করে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। বেড়ে যাচ্ছে পণ্য উৎপাদনের ব্যয়ও।’
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহের সংকট শুধু স্থানীয় অর্থনীতির ক্ষতি করবে না, এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। এনার্জি সিস্টেম নিয়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
নারায়ণগঞ্জে পোশাক ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় এক হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফতুল্লা গার্মেন্টসের পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, ‘গ্যাস সংকটে গত ২৩ জুলাই থেকে আমাদের ডাইং বন্ধ। এ কয়দিন জমানো থান কাপড় দিয়ে চললেও গতকাল থেকে আমাদের আর জমানো থান নেই। ফলে গার্মেন্টসের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ।’
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে আমাদের প্রায় পাঁচশ গার্মেন্টস রয়েছে। এগুলোর সঙ্গে রয়েছে সাব-কন্ট্রাক্টের গার্মেন্টস, ডাইং ও অন্যান্য শিল্প। আমাদের গার্মেন্টগুলো দুই দিন ধরে বন্ধ। যেগুলো গ্যাসনির্ভর লিংকেজ শিল্প, সেগুলোও বন্ধ। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে গার্মেন্টস শিল্পে ধস নামবে।’
বাংলাদেশ নিট ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় আমাদের দেড়শ কারখানার প্রায় সবই এখন বন্ধ।’
বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা জানান, নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে এখন সাতটি লবণ ফ্যাক্টরি রয়েছে। গ্যাসের অভাবে এগুলোর উৎপাদন দুই দিন ধরে বন্ধ।
সারাদেশে ৪০টি আধুনিক ও ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে। এর একটা বড় অংশই নারায়ণগঞ্জে। এসব মিলে গ্যাসের অভাবে উৎপাদন হচ্ছে না। বাংলাদেশ রি-রোলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ জুয়েল বলেন, ‘অধিকাংশ মিলই আমার জানামতে দুই-তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে।’
গার্মেন্টস শিল্পের আরেকটি লিংকেজ শিল্প নিটিং কারখানা। এখানে সুতা থেকে গার্মেন্টসের থান কাপড় তৈরি হয়। এটি বিদ্যুতে চলে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। আর তাই এ শিল্পের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে জানান বাংলাদেশ নিটিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সেলিম সারোয়ার। তিনি বলেন, কেউ কেউ জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ চালানো সম্ভব নয়।
জেলার সোনারগায়ের কাঁচপুর ও মেঘনাঘাট শিল্পাঞ্চলে ৩৫টি শিল্পকারখানার উৎপদান গ্যাসের অভাবে বন্ধ রয়েছে। মেঘনাঘাট শিল্পাঞ্চলে আমান ইকোনমিক জোনের জিএম নাদিরুজ্জামান বলেন, গ্যাসের অভাবে তিন দিন ধরে তাদের সিমেন্ট কারখানা আট থেকে ১০ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। এতে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে।
ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ খুবই কম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি পাউন্ড সুতায় তাদের ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও পিক আওয়ারে তা নেমে যাচ্ছে প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ পিএসআইয়ে। কখনও কখনও লাইনে গ্যাস থাকেই না।
রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের প্রেশার এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না।
হবিগঞ্জে ভারী শিল্পের সঙ্গে রপ্তানি খাতও সংকটে
গতকাল সকালে হবিগঞ্জের মাধবপুর ও শাহজীবাজার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। এতে সায়হাম গ্রুপের ডেনিমস, কটন, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিলসহ একাধিক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। শুধু সায়হাম গ্রুপই নয়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসংলগ্ন ৩৯টি শিল্পকারখানা এবং ৪২টি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টও একই সংকটে পড়েছে।
এ অঞ্চলে প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার ডেনিমস, স্কয়ার টেক্সটাইল, সায়হাম গ্রুপ, যমুনা গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, স্টার সিরামিকস, আরএকে সিরামিকস, আকিজ, বেঙ্গল, ম্যাটাডোর, তাফরিদ কটন, ফার ইস্ট স্পিনিংসহ দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইউনিট রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাকের্র এক কর্মকর্তা বলেন, গ্যাসের অভাবে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। উৎপাদন দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে।
স্কয়ার ডেনিমসের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ বলেন, বুধবার বিকেল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ। তিন হাজার শ্রমিকের কারখানা এখন শাটডাউন অবস্থায় রয়েছে।
জেজিটিডিএসএলের শাহজীবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি বলেন, ‘উদ্যোক্তারা বারবার যোগাযোগ করছেন। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের সংকটের কারণে স্থানীয়ভাবে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম।’
ফারইস্ট স্পিনিং মিলের ম্যানেজার সুমন আহমেদ বলেন, গ্যাস না থাকায় তারা সোলার ও জাতীয় গ্রিডের সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো শিল্প খাত ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে।
গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী বলেন, আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
প্রথম আলো
‘প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর নিয়ে প্রস্তুতি, টানাপোড়েনও আছে’-এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আয়োজন নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কয়েক দিন ধরে যোগাযোগ চলছে। প্রাথমিকভাবে এ মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের এ সফর আয়োজন নিয়ে ভারতের দিক থেকে প্রস্তাব রয়েছে। তবে সফর চূড়ান্ত করার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ।
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের পর দিল্লিতে অবস্থানরত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই প্রতিবেশী দেশের মতপার্থক্য এখনো দূর হয়নি।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ এবার ‘সহায়ক পরিবেশ’ সৃষ্টির তাগিদ দিয়েছে। পাশাপাশি সংবেদনশীল ইস্যুগুলো সমাধানে জোর দিচ্ছে। সংবেদনশীল ইস্যুর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রসঙ্গটি। এর পাশাপাশি ভারতে বসে বিভিন্ন সময়ে যেসব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তিনি চালাচ্ছেন বা বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো বাংলাদেশকে অসন্তুষ্ট করে তুলেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার বিষয়গুলো সরাসরি যুক্ত। এসব বিষয়ে ভারতের কাছে জোরালো নিশ্চয়তা চায় বাংলাদেশ।
এদিকে ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে গতকাল দুপুরে ঢাকায় ফিরেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষ করে গত সোমবার বিকেলে দিল্লি গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে বাংলাদেশের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। আর দুই দেশের ‘জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক’ এগিয়ে নিতে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা নিয়ে ফিরেছেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে।
ঢাকার সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, দীনেশ ত্রিবেদী আজ শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে পারেন। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসহ দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, দ্য ট্রিবিউনসহ ভারতের বেশ কয়েকটি প্রথম সারির গণমাধ্যম কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ঢাকা এখন সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি চায়। অন্যদিকে দিল্লিও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনো এক হয়নি। দিল্লি শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত প্রত্যর্পণ করতে তৈরি বলে ঢাকাকে বার্তা পাঠিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সফরের প্রস্তুতি এগোলেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দুই দেশের আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। ইংরেজি দৈনিক দ্য ট্রিবিউন নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অগ্রগতি না হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হবে না—এমন বার্তা ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি রাজ্যসভায়ও উঠেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ভারত সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেস সদস্য রাজীব কুমারের করা প্রশ্নের জবাব দেননি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং। যদিও তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় ওই সদস্যের অন্য তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন সংবেদনশীল সময়ে প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়াও দিল্লির সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করে। গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরের বিষয়টি আসে।
প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানান, আগস্ট মাসেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর হতে পারে কি না—ব্রিফিংয়ে এ নিয়ে বারবার প্রশ্ন করা হয়। একজন জানতে চান, ব্রিকসের আগে না পরে, কখন তারেক রহমান আসবেন? আরেকজন সাংবাদিক জানতে চান তারেক রহমান ব্রিকসের আগেই দিল্লি আসছেন কি না। তিনি জানতে চান, দিল্লিতে কথা বলে দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকা ফিরে গেছেন। এরপর সেখান থেকে সফরসংক্রান্ত কোনো খবরাখবর এসেছে কি না। অন্য একজন জানতে চান, বাংলাদেশে এমন কোনো শর্ত রেখেছে কি, হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করলে তারেক রহমান ভারত সফরে আসবেন না? এই প্রচার সত্য না মিথ্যা?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সব প্রশ্নের জবাবে বলেন, তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে আসার আমন্ত্রণ আগেই জানানো হয়েছে। পরে জানানো হয়েছে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে। ব্রিকসের আসরে। এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি থাকলে তা জানানো হবে।
প্রসঙ্গত, ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা অনলাইনে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ওই অনুষ্ঠানের বিষয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা রাখা হয়নি। ফলে ওই দিন রাতেই কঠোর ভাষায় এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। সেখানে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বাংলাদেশ রাষ্ট্র এবং এর জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়িয়েছেন।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এ ঘটনার দুই দিন পর ৭ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ওই মঞ্চ (শেখ হাসিনার মতবিনিময়) থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত (ডিউলি কনস্টিটিউটেড) সরকারের বিরুদ্ধে, তা ভারত সরকার অনুমোদন করে না।’
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ঢাকা এখন সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নেও দৃশ্যমান অগ্রগতি চায়। অন্যদিকে দিল্লিও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান এখনো এক হয়নি। দিল্লি শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত প্রত্যর্পণ করতে তৈরি বলে ঢাকাকে বার্তা পাঠিয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার ইস্যুটির সুরাহা সম্ভাব্য সফরের সময় ও চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভারতের দৈনিক দ্য ট্রিবিউন বৃহস্পতিবার নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টায় নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে পত্রিকাটি বলেছে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাকে দিল্লি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘গডফাদারদের সম্পদ ক্রোক হচ্ছে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদক কারবারের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া ১১৬ জন গডফাদারের ১৮২ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি)। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে করা ৩৯টি মামলার অধীনে এই বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পর্যায়ক্রমে বাজেয়াপ্ত করা হবে। সিআইডি ইতোমধ্যে ২৪টি মামলার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দাখিল করেছে; বাকি ১৫টি মামলার তদন্তও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। অপরাধীদের মূলোৎপাটনে সারা দেশে আরও ৬৮টি পৃথক অনুসন্ধান চালিয়ে গডফাদারদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, মাদক কারবারিদের নিষ্ক্রিয় করতে অবৈধ আয়ে গড়া তাদের সম্পদ ক্রোক করে সরকারের অনুকূলে নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ২৪টি মামলায় আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছি। আরও ১৫ মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া সারা দেশে মাদক কারবারি এবং তাদের অবৈধ সম্পদ শনাক্তে পৃথক অনুসন্ধান চলছে।
জানা যায়, অবৈধ মাদক কারবারের মাধ্যমে ১১৬ অপরাধীর পাচার করা অর্থের পরিমাণ ১৮২ কোটি ৪২ লাখ টাকা; যার মধ্যে স্থাবর-অস্থাবর উভয় সম্পদ রয়েছে। এখন পর্যন্ত শনাক্ত হয়েছে ৩৫ একর জমি, ১২টি বাড়ি ও ১টি গাড়ি, যার বাজারমূল্য ৩৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। এছাড়া ১ কোটি ৯৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ফ্রিজ করা হয়েছে।
এদিকে ৩৯টি মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১১৬ জন, এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ৭০ জন। বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছে ১৪ জন। জামিনে আছেন ২০ জন। সিআইডির তদন্তাধীন মামলাগুলোর অধিকাংশ আসামি আত্মগোপনে থাকলেও তাদের সম্পদ ক্রোকে আইগত কোনো বাধা নেই। আদালতের অনুমতিক্রমেই এ সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সিআইডি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, মাঠপর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের গ্রেফতার করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। যারা পর্দার আড়ালে থেকে মূল পৃষ্ঠপোষকতা করছে বা গডফাদার হিসাবে কাজ করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা বেশি জরুরি। একই সঙ্গে মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, এই মাদক কারবারি অনেকেরই রাজনৈতিক পরিচয় থাকে অথবা তারা অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে থাকে। এমন প্রভাবে যাতে অভিযান ও আইনি ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান সরকারের নির্দেশে এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের নেপথ্য অপরাধীদের শনাক্তে কাজ করছে সিআইডি। সংস্থাটি অপরাধীদের আর্থিক লেনদেন, মাদক মামলা ও স্থানীয় সূত্রসহ বিভিন্ন উপায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। অনুসন্ধানে উঠে আসছে বিভিন্ন এলাকার কারবারি ও গডফাদারের কার্যক্রম এবং তাদের অবৈধ সম্পদের চমকপ্রদ তথ্য।
ঢাকা মহানগর: আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নজরে আসে একটি অস্বাভাবিক লেনদেন। যার নথি পর্যালোচনা করে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ। এতে ইয়াবা গডফাদার মো. কতুব উদ্দিনের সন্ধান মেলে। তদন্তে তার ৩৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা পাচারের প্রমাণ মেলে। অন্যদিকে প্রযোজক নজরুল ইসলাম ওরফে রাজের বিরুদ্ধেও মাদক কারবারে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পায় সিআইডি। তার আড়াই কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে আদাবরের দুই কারবারি মো. নুরুল ইসলাম ও রাজিয়া ইসলামের কার্যক্রম ও অবৈধ সম্পদ শনাক্ত হলেও হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন তারা। আদাবর থানার মামলার তদন্তে তাদের ১৩ কোটি টাকার বাড়ি, জমি ও স্বর্ণালংকার শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে গুলশান থানার মামলায় মো. আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ২ কোটি ৩৫ লাখের বেশি টাকা পাচারের তথ্য মিলেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর: ২০১৮ সালে কোস্ট গার্ডের ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনা কেন্দ্র করে অনুসন্ধানে নেমে ৬ গডফাদারের সন্ধান পায় সিআইডি। তাদের ১ কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযুক্তরা হলেন-গাজী মোহাম্মদ ছৈয়দুল হক, মো. মোজাহার মিয়া, মো. নবী হোসেন, আ. রশিদ মিয়া, মেহেদী হাসান শাকিল, মো. সেলিম, মো. ইদ্রিস ও মো. নুরুল আলম এবং তদন্তে প্রাপ্ত পারভেজুল। একই এলাকায় মো. হাছান ওরফে হাছান মাঝি ও মো. ছাবেরুল ইসলামের পাচার করা অর্থ ১ কোটি ৮ লাখ। আরেক মামলায় দেড় কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে মেলে। অভিযুক্তরা হলেন-মো. জসিম উদ্দিন মো. ফরিদুল আলম ওরফে মেহেদী হাসান, মো. রবিউল আলম, মো. সিদ্দিক আহমেদ, সৈয়দ আহমেদ ওরফে সৈয়দ হোসাইন, মো. আব্দুল মালেক ওরফে মালেক হোছাইন ও শফিকুল ইসলাম ওরফে সামসুল।
কালের কণ্ঠ
‘সম্পর্কে বরফ গলানোর চেষ্টা’-এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজনৈতিক দূরত্ব ও টানাপোড়েন কাটিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ও ভারত। এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর।
আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি যেতে পারেন—এমন আলোচনা চলছে। ভারতের গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রচার হলেও ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো সফরের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, আরো কয়েকটি দেশের মতো ভারতের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে সফরসূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে একাধিক সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে বলেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর প্রায় নিশ্চিত। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরের তারিখ আগামী ২২ কিংবা ২৩ আগস্ট হতে পারে। অর্থাৎ আজ শনিবার ভারতের স্বাধীনতা দিবসের প্রায় এক সপ্তাহ পর হতে পারে এই সফর। প্রধানমন্ত্রীর থাকার জন্য দিল্লিতে একাধিক হোটেলের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ভারতে গেলে তো দেখতেই পারবেন।’
২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের ঘনিষ্ঠতার পর ক্ষমতার পালাবদলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগে নতুন মাত্রা পায়।
তবে সীমান্ত, সংখ্যালঘু ইস্যু, বাণিজ্য, পানি এবং ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় সম্পর্কের বরফ পুরোপুরি গলেনি।
চলতি বছর বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা শুরু হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্র পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ে। এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের দিল্লি সফরকে সম্পর্ক পুনর্গঠনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হয়। এরপর গত ১০ আগস্ট ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পরদিনই দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্পর্কের বরফ গলানোর ক্ষেত্রে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সক্রিয়তা স্পষ্ট। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লিতে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আগামী মাসে দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী কোন সফরে যাবেন, সে বিষয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দ্বিপক্ষীয় সফরের ব্যাপারে জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সময় এখনো রয়েছে। আর ভারতীয় পক্ষের তৎপরতা থেকে বোঝা যাচ্ছে, নয়াদিল্লি দ্রুত সম্পর্ককে স্বাভাবিক ধারায় নিয়ে আসতে আগ্রহী। ভারতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর চলতি মাসের শেষ দিকে আয়োজনের চেষ্টা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তৈরি হওয়া দূরত্ব কমিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর এই উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন কাঠামো স্পষ্ট করা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্কের বার্তা থাকতে পারে। তবে সেই সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে হওয়া জরুরি। বাণিজ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, নিরাপত্তা, পানি, সীমান্তসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থের ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মুন্সি ফয়েজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক তা চান না এমন কিছু লোক দেশে আছেন। তাঁরা সমস্যা জিইয়ে রাখতে চান। তাঁরা চান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন ভারত সফরে না যান। তবে প্রধানমন্ত্রী তো কাঁচা নন। তিনি নিজেই বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভারত ও বাংলাদেশ একে অন্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ক খারাপ থাকলে বাংলাদেশের ক্ষতি বেশি হয়। কারণ তখন সারাক্ষণ ভারতের কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগে থাকতে হয়। তাই বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিষয় হওয়া উচিত ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর ও সুসম্পর্ক রাখা। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে না পারলে অন্য অংশীদার দেশগুলোর কাছেও বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।’
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলছে উল্লেখ করে মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া বন্ধ করা উচিত নয়। দুই দেশের যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়লে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যেতে পারে।’
ইত্তেফাক
‘স্ক্র্যাপ জাহাজের বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু’-এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে স্ক্র্যাপ জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরো অন্তত ১৫ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের আশপাশেও তীব্র গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক দেখা দেয়। ক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন একপর্যায়ে ইয়ার্ডে ঢুকে ভাঙচুর করলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহত ৯ শ্রমিকের মধ্যে এ পর্যন্ত চার জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন- সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭) এবং দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)। তাদের বাড়ি ভাটিয়ারী এলাকায়। অপর চার জনের পরিচয় তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিত্সক ইশতিয়াক রহমান জানান, ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ড থেকে দুই দফায় সাত জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে ছয় জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অন্যদিকে সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানিয়েছেন, সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৯ জন।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যে স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি আগে এলএনজি বহন করত। জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য বদ্ধ অংশ সম্পূর্ণ গ্যাসমুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, জাহাজটির কিছু ট্যাংকে বিপজ্জনক গ্যাস অবশিষ্ট থাকতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ট্যাংক যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ করায় দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং ইয়ার্ডে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল দুর্বল। তবে ঠিক কোন ধরনের গ্যাসে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার বিষয়টি সেফটি টিমের নজরে আসে। পরে গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে গেলে শ্রমিকরা বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন। ঘটনাটিকে কোথাও বিস্ফোরণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, একাধিক সূত্রে মূলত বিষাক্ত গ্যাসের বিষক্রিয়ায় শ্রমিকদের অসুস্থ হয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে।
ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, সেফটি টিম একটি ট্যাংক থেকে গ্যাস নির্গত হতে দেখে সেখানে পরীক্ষা করতে যায়। এ সময় দুর্ঘটনা ঘটে। কয়েক জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হয়। কারখানার মালিকের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন বলেন, ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের ভেতরে থাকা ছয় থেকে আট জন কর্মী অসতর্কতাবশত বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। তিনি পরে কারখানায় গিয়ে বিস্তারিত জানাবেন বলে জানান।
চারদিকে ছড়িয়েছে তীব্র গন্ধ : এদিকে, দুর্ঘটনার পর ইয়ার্ডের আশপাশে তীব্র গ্যাসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলেরা। স্থানীয় এক জেলে জানান, সাগর থেকে ইলিশ ধরে ফেরার সময় গ্যাসের তীব্র গন্ধের কারণে তারা ইয়ার্ডের পাশের খাল দিয়ে নৌকা নিয়ে ঢুকতে পারেননি। বাধ্য হয়ে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একজন জানান, সকালে হঠাত্ ইয়ার্ডের ভেতর থেকে চিত্কার-চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পান তারা। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে অসুস্থ শ্রমিকদের হাসপাতালে নিতে দেখেন। জাহাজের ভেতরে কয়েক জন শ্রমিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে কিছু লোক ইয়ার্ডে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
ইয়ার্ডগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন : সীতাকুণ্ডের উপকূলবর্তী এলাকায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে প্রায় ৪০টি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড রয়েছে। এগুলোতে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। পরিত্যক্ত জাহাজের ভেতরের বদ্ধ ট্যাংক, গ্যাস ও দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি শনাক্ত ও অপসারণ না করে কাটার কাজ শুরু করলে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের শিপইয়ার্ডগুলোতে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় অন্তত তিন শ্রমিক নিহত এবং ৩৮ জন আহত হন। তাই ফেরদৌস স্টিলের শুক্রবারের দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন শিল্পদুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্টরা।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার খবর ‘সাইবার গ্যাংয়ে বিপন্ন নারী’। প্রতিবেদনে বলা হয়, এক সময়ের পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাংগুলো এখন সংগঠিত হচ্ছে ফেসবুক গ্রুপ ও মেসেঞ্জার চ্যাটরুমে। বর্তমানে দেশে অন্তত ২৩৭টি ‘কিশোর গ্যাং’ সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ১২৭টিই রাজধানী ঢাকায়। এরা এখন অপরাধকে ‘কনটেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে। মারধর, ছিনতাই বা অস্ত্র প্রদর্শনের ভিডিও ধারণ করে তা টিকটক বা ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে আধিপত্য জাহির করছে। নারীদের টার্গেট করে দলবদ্ধভাবে কুৎসা রটানো বা ব্ল্যাকমেইল করার জন্য এরা ভুয়া আইডেন্টিটি বা ‘সোক-পাপেট’ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে।
বর্তমানে নারীদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে খুব সহজেই সাধারণ কোনো নারীর ছবি বা ভিডিওকে নিখুঁতভাবে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের সাথে জুড়ে দেয়া হচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য মতে, অনলাইনে থাকা ডিপফেক ভিডিওর ৯৮ শতাংশই পর্নোগ্রাফিক এবং এর লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিদের ৯৯ শতাংশই নারী। ব্যক্তিগত শত্রুতা বা প্রতিশোধ নিতে এই প্রযুক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।
সম্প্রতি নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে একদল কিশোর মিলে মারধর করে এবং সেই মারধরের ভিডিও ধারণ করে টিকটক ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। তদন্তে দেখা যায়, মূলত এলাকায় আধিপত্য জাহির করা এবং অপরাধকে ‘কন্টেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য হিসেবে নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তারা এই কাজ করেছে। পুলিশ ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর দ্রুত অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশরাতের (ছদ্মনাম) সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে সাধারণ ছবি অপরাধীরা সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের মাধ্যমে সেগুলোকে আপত্তিকর অশ্লীল ছবি ও ভিডিওতে রূপান্তর করে। এই ভুয়া কন্টেন্টগুলো ইশরাতের বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও মেসেঞ্জার চ্যাটরুমে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এর ফলে তিনি প্রচণ্ড মানসিক ট্রমা ও সামাজিক গ্লানির শিকার হন এবং দীর্ঘ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন। পুলিশে অভিযোগ করা হলেও ডিপফেক শনাক্ত করার কারিগরি দক্ষতার অভাবে অপরাধীকে ধরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ফেসবুক, টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর ‘অ্যালগরিদম’ মূলত ব্যবহারকারীর এনগেজমেন্ট বা ভিউ বাড়ানোর জন্য তৈরি। কোনো বিতর্কিত বা আপত্তিকর কনটেন্ট যখন শেয়ার করা হয়, অ্যালগরিদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটিকে হাজার হাজার মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে দেয়। সাইবার গ্যাংগুলো এই কারিগরি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত ট্রলিং বা চরিত্রহননের কনটেন্ট দ্রুত ভাইরাল করে দিচ্ছে। টিকটকের পেজ বা ফেসবুকের রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন অনেক সময় নেতিবাচক কনটেন্টকেও আরো বেশি দৃশ্যমান করে তোলে, যা ভুক্তভোগীর মানসিক ও সামাজিক ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউএনএফপিএর সাম্প্রতিক এক যৌথ গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের প্রায় ৮৯ শতাংশই অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডাব্লিউ) পরিসংখ্যান বলছে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি হচ্ছে তরুণী; যার মধ্যে ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীদের হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। অভিযোগের ধরণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪১ শতাংশ ক্ষেত্রেই নারীরা ‘ডক্সিং’ বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের শিকার হচ্ছেন। এ ছাড়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং ১৮ শতাংশ, ব্ল্যাকমেইলিং ১৭ শতাংশ, ভুয়া আইডেন্টিটি ৯ শতাংশ এবং সাইবার বুলিং ৮ শতাংশ নারীদের জন্য নিত্যদিনের আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সাথে সাথে সাইবার জগতের অন্ধকার দিকটিও সমান্তরালভাবে বিস্তার লাভ করেছে। বর্তমানে গতানুগতিক সাইবার বুলিংয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অপরাধ এখন ‘সাইবার গ্যাং কালচার’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির জটিল জালে আটকে পড়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য এই ডিজিটাল পরিসর হয়ে উঠেছে এক অনিরাপদ রণক্ষেত্র।
বণিক বার্তা
‘জাহাজ কাটায় সেই পুরনো পদ্ধতি, কমেনি দুর্ঘটনা ও মৃত্যু’-এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সনদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার শর্ত পূরণের লক্ষ্যে দেশের পুরনো জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলো একে একে রূপান্তর হচ্ছে ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’।
আধুনিক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নানা শর্ত পূরণের মাধ্যমে এসব ইয়ার্ডে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের কথা। তাতে দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পে দীর্ঘদিনের দুর্ঘটনা ও শ্রমিক হতাহতের ঘটনা কমে আসার প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অবকাঠামো ও সনদে পরিবর্তন এলেও জাহাজ কাটার অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা হচ্ছে পুরনো পদ্ধতি। ঝুঁকি শনাক্ত, গ্যাস মনিটরিং, শ্রমিক প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারে রয়েছে ঘাটতির অভিযোগ। ফলে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হওয়ার পরও থামছে না শ্রমিকের মৃত্যু।
এর সর্বশেষ উদাহরণ গতকাল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের বিষক্রিয়ায় নয় শ্রমিকের মৃত্যু। এর আগে ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এসএন করপোরেশন নামের একটি ইয়ার্ডে জাহাজ কাটার সময় গ্যাস বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন সাত শ্রমিক।
একের পর এক এমন ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তরের পরও কেন শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসছে না কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। একই সঙ্গে পুরনো জাহাজ ভাঙার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া ছাড়পত্র এবং জাহাজের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কার্যকারিতা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ডের ওই শিপইয়ার্ডের ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন মোহাম্মদ মনসুর (৫৫), মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন (৫১), মোহাম্মদ আব্দুল আলীম সুজন (৩৬), মোহাম্মদ রানা মিয়া (২৩), হাবিবুর রহমান (৫১), পলাশ দাশ (৩৫), সানি দাশ (২৩) ও মোহাম্মদ খোকন মিয়া (২৩)। এছাড়া বেসরকারি ন্যাশনাল হাসপাতালে শরীফ নামের আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চমেক পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আলা উদ্দিন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ইয়ার্ডটিতে জাহাজ কাটার কাজ ছিল না। কাটার জন্য রাখা জাহাজগুলোয় মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছিল। সকালে ইয়ার্ডের সেফটি অফিসার কয়েকজন শ্রমিককে নিয়ে জাহাজের অভ্যন্তরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম দেখতে যান। এ সময় সেখানে গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে তারা অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা অন্য শ্রমিকরা বিষয়টি দেখে কোনো ধরনের সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই তাদের উদ্ধারে জাহাজের অভ্যন্তরে ছুটে যান। তারাও বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজন জ্ঞান হারান।
ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের অভিযোগ, নিহত ও আহতদের কারো শরীরেই যথাযথ সুরক্ষা পোশাক ছিল না। ইয়ার্ডটিতে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও মেশিনারিজ ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হয় না। গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অনেক কাজ এখনো সনাতন পদ্ধতিতেই করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে আশপাশের এলাকায়ও অনেকের শ্বাসকষ্ট ও মাথা ঘোরার সমস্যা দেখা দেয়। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও এলাকায় গ্যাসের প্রভাব ছিল বলে দাবি করেছেন তারা।
এ দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়ার পরও একটি গ্রিন ইয়ার্ডে আনা স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কীভাবে এত প্রাণঘাতী মাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি থাকল? জাহাজ ভাঙা শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, পুরনো একটি জাহাজে গ্যাস ট্যাংক বা জ্বালানি ট্যাংক ছাড়াও বিপুলসংখ্যক পাইপলাইন, ছোট-বড় ট্যাংক, ব্যালাস্ট বা ব্যালান্স ওয়াটার ট্যাংক এবং বিভিন্ন আবদ্ধ স্থান থাকে। এসব স্থানে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পয়োবর্জ্য, পানি, জ্বালানি তেল, খাদ্যবর্জ্য ও অন্যান্য জৈব পদার্থ থেকে হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে মূলত গ্যাস ট্যাংক, জ্বালানি ট্যাংক ও ইঞ্জিন রুমসহ বিস্ফোরক ঝুঁকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশ পরিদর্শন করে ছাড়পত্র দেয়া হয়। অন্য পরিবেশগত বিষয়গুলো পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। তাদের দাবি, একটি জাহাজ ইয়ার্ডে আনার পর দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলে বিভিন্ন বর্জ্য ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নতুন করে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরবর্তী ঝুঁকি সবসময় প্রাথমিক ছাড়পত্রের আওতায় পড়ে না। ফলে জাহাজ ইয়ার্ডে পৌঁছার পর থেকে প্রতিটি কাজের আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন ও গ্যাস পরীক্ষা করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: লোডশেডিংয়ের ভিন্ন চিত্র বগুড়া সিরাজগঞ্জ যশোরে’। প্রতিবেদনে বলা হয়, লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষোভ, বিদ্যুৎ অফিসে হামলার চেষ্টাও হয়েছে। সে কারণে অনেক বিদ্যুৎ অফিস নিরাপত্তা চেয়ে থানা-পুলিশকে জানিয়েছে। তবে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও যশোরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। এই তিন জেলায় বিদ্যুৎ কম যাচ্ছে কিংবা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বগুড়ার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে জুন-জুলাই থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে বিদ্যুৎ সরবরাহ। কমতে থাকে লোডশেডিংও। আর গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলার বেশির ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। এতে স্বস্তি ফিরেছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, বিগত সরকারের সময়ে বগুড়া ছিল অবহেলিত। গরমের সময় ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৮ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যেত না। চলতি বছরের এপ্রিল-মে মাসেও লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। তবে জুনের পর থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে থাকায় লোডশেডিং কমতে থাকে।
বগুড়া জেলার ১৩টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে নর্দান ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) ও দুটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বৃহস্পতিবার থেকে নেসকোর আওতাধীন এলাকায় চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে।
নেসকো বগুড়া অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইমদাদ সেলিম বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে নেসকোর অধীনে কোনো লোডশেডিং নেই। ১১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পুরো ১১০ মেগাওয়াটই পাওয়া যাচ্ছে।
এ কারণে বৃহস্পতিবার থেকে লোডশেডিং করতে হচ্ছে না।’বগুড়া সদরের এরুলিয়া এলাকার বাসিন্দা গোলাম রব্বানী বলেন, কয়েক দিন বিদ্যুৎ-বিভ্রাট ছিল। তবে বৃহস্পতিবার থেকে তা স্বাভাবিক আছে।
শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজনী গ্রামের ফজলুল হক বলেন, ‘কিছুদিন আগেও লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। এখন ভ্যাপসা গরমের মধ্যেও বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকায় রাতে ঘুমাতে সমস্যা হচ্ছে না।’
বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সহকারী মহাব্যবস্থাপক শামিমুর রহমান বলেন, তাঁদের অধীনে থাকা সাতটি উপজেলায় বৃহস্পতিবার থেকে কোনো লোডশেডিং করা হয়নি। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৮৫ মেগাওয়াট। সরবরাহও করা হয়েছে ৮৫ মেগাওয়াট।
তবে বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর এলাকায় বৃহস্পতিবার দিনে কিছুটা ঘাটতি ছিল। সমিতির সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁদের গড় চাহিদা ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট। বৃহস্পতিবার দিনে ১১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যায় ৯৯ মেগাওয়াট। এতে অল্প সময় লোডশেডিং হলেও রাত ১২টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।
মোজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় চাহিদা ছিল ৮৫ মেগাওয়াট। সরবরাহও ছিল ৮৫ মেগাওয়াট। ফলে তখন থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।’
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। বগুড়া শহরের হোটেলপট্টি এলাকার কাফেলা হোটেলের স্বত্বাধিকারী রাজু আহমেদ বলেন, ‘এক ঘণ্টা লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালাতে প্রায় ২০০ টাকার পেট্রল খরচ হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার থেকে একবারও জেনারেটর চালাতে হয়নি।’
দেশ রূপান্তর
‘বেতন সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা ওভারটাইমও ৩৬ লাখ’-এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, গত মে মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে হয়েছে সাড়ে ৩৬ লাখ টাকা। ওভারটাইমও দিতে হয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। বেতন আর ওভারটাইম প্রায় সমানই। কেউ কেউ এক মাসে ২১৫ ঘণ্টাও ওভারটাইম পেয়েছেন। এ ঘটনা জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীন পেট্রোবাংলার তেল, গ্যাস উৎপাদন কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে। এ কোম্পানিতে ওভারটাইমের নামে চলছে দুর্নীতির মহোৎসব।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর দুদক সিলেট অফিসের একটি বিশেষ টিম অভিযান চালায়। তখন কোম্পানির কর্মচারীদের দৈনিক কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত কর্মকাল তথা ওভারটাইমের নামে দুর্নীতির সত্যতা পায় দুদক। এরপরও ওভারটাইমের নামে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের এ দুর্নীতি থেমে নেই।
কোম্পানিটির গত মে মাসের বেতন শিট দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, কোনো কোনো কর্মচারীর নামে ১৫০-২০০ ঘণ্টা পর্যন্ত ওভারটাইম দেখিয়ে ৩৫-৫০ হাজার টাকা, অর্থাৎ মূল বেতনের চেয়েও দেড়-দুই গুণ অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনের পে-সিøপ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হরিপুর ফিল্ডে কর্মরত (ফোরম্যান) ফয়জুল করিমের মূল বেতন ২৬,১০০ টাকা। তিনি ২১৫ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৫৩,৯৫৭ টাকাসহ সব মিলিয়ে বেতন তুলেছেন ৯৮,২০২ টাকা।
রশিদপুর সিআরইউ প্ল্যান্টে কর্মরত সাদেক আলীর মূল বেতন ২৫,৩২০ টাকা। তিনি ১৭৬ ঘণ্টা ওভারটাইম বাবদ ৪২,৮৫০ টাকাসহ মোট ৮৭,৯২৬ টাকা বেতন তুলেছেন। কৈলাশটিলা ফিল্ডের লোকমান উদ্দিনের মূল বেতন ২০,৩৯০ টাকা। তিনি ২১২ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,৫৬৫ টাকাসহ মোট ৭৭,৭৯৫ টাকা পেয়েছেন। প্রধান কার্যালয়ের ২৮,৭৯০ টাকা মূল বেতনের কর্মচারী নূর উদ্দিন ১৫০ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,৫২৫ টাকাসহ মোট ৮৯,৪৪০ টাকা পেয়েছেন। রশিদপুর গ্যাস ফিল্ডের ২৬,০০০ টাকা মূল বেতনের কর্মচারী মো. আবদুল ওয়াদুদ ১৬৫ ঘণ্টা ওভারটাইমের ৪১,২৫০ টাকাসহ ৮৫,৮৫৫ টাকা উত্তোলন করেছেন।
মে মাসের বেতন সামারি অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ওভারটাইমপ্রাপ্ত কর্মচারীরা এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত কর্মকর্তা এমনকি ৫ম গ্রেডের অনেক কর্মকর্তার চেয়েও অধিক বেতন উত্তোলন করেছেন। উপব্যবস্থাপক (ষষ্ঠ গ্রেড) এমরানুল হক চৌধুরী সর্বসাকল্যে ৫৯,১৮৮ টাকা, সহকারী ব্যবস্থাপক (৯ম গ্রেড) মো. আনসারুল আলম সর্বসাকল্যে ৪০,০৩০ টাকা। কর্মচারী পর্যায়ের লোকজন কর্মকর্তাদের থেকেও অধিক আয়ের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলাও চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আদেশের কোনোরূপ তোয়াক্কা করে না।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসে মে মাসের বেতন ছিল ৩৬ লাখ ৫১ হাজার ৭০৫ টাকা। ওভার ওভারটাইম খাতে কোম্পানির ব্যয় হয়েছে ৩৫ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৬ টাকা, যা বছরে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অথচ এই টাকায় ১৪তম গ্রেডের ১৭০ জন নতুন কর্মচারীর বেতন দেওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু সিবিএ নেতা ও স্থানীয় কর্মচারীদের বাধায় কর্মচারী পদে ৩০ বছর ধরে এই কোম্পানিতে নিয়োগ বন্ধ। তাদের শঙ্কা নতুন কর্মচারী নিয়োগ দিলে তাদের চলমান ওভারটাইম বন্ধ হয়ে যাবে।
জানা যায়, এ ওভারটাইম প্রদানের জন্য দৈনিক কোনো রেকর্ড রাখা হয় না। দুদকের অভিযানের পর রেজিস্ট্রার মেইনটেন করলেও তা নামমাত্র। মাসের শেষ দিন কর্মচারীরা ইচ্ছামতো একসঙ্গে ওভারটাইম দাখিল করেই টাকা তুলে নিচ্ছে। অথচ নিয়ম হচ্ছে, প্রতিদিনের ওভারটাইম আগের দিন অনুমোদন নিতে হয় এবং দিনশেষে প্রকৃত ওভারটাইম প্রত্যয়ন করতে হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অসাধু কিছু কর্মকর্তাও এ দুর্নীতির সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত। তারা ভুয়া ওভারটাইম দেখিয়ে অধীনস্থ কর্মচারীকে বেতনের সঙ্গে ৪০-৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত উত্তোলনের সুযোগ করে দেয়। আর সেখান থেকে একটা অংশ তিনিও পান। উল্লেখ্য, কর্মকর্তাদের নামে ওভারটাইম দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের সুযোগ না থাকায় তাদের একাংশও এ দুর্নীতিতে জড়িত।
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের পর এই কোম্পানিতে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে কর্মচারী পর্যায়ে কোনো নিয়োগ হয়নি। ২০০৬ সালে বিশেষ কৌশলে কোম্পানির বোর্ড অনুমোদনের মাধ্যমে এবং ২০১৭ সালে শুধু হাইকোর্টের রায়ের ওপর ভিত্তি করে কিছু ক্যাজুয়াল শ্রমিক কর্মচারী হিসেবে স্থায়ী হয়। ২০১১ ও ২০২১ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিলেও এসব দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের বাধায় তা আলোর মুখ দেখেনি। তা ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ নেই, মজুরি নেই ভিত্তিতে অস্থায়ী নিয়োজিত রয়েছে। এরা সবাই আগের সরকারের সময়ের রাজনৈতিক নিয়োগ।
বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায় যে, এসব নৈমিত্তিক শ্রমিকদের নিয়োগের সময় ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। পরে তাদের কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের ক্যান্টিন ঠিকাদারের কাগজপত্রে নিয়োগ দেখিয়ে বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী, এসব নৈমিত্তিক শ্রমিকের নিয়োগকর্তা ঠিকাদার, কোম্পানি নয়। এদের বেশিরভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী ও স্থানীয় নেতাদের আত্মীয়স্বজন। এদিকে জনবল সংকটেও সিবিএ নেতা ও এই স্থানীয় শ্রমিকদের বাধার কারণে কর্মচারী নিয়োগ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এসব নৈমিত্তিক শ্রমিক চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে কোম্পানির কয়েকজন জিএমকে প্রধান কার্যালয়ের একটি রুমে আটকে রাখে। প্রায় ৪ ঘণ্টা পর পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করলেও দুষ্কৃতকারী শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
