বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা ঘিরে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিপক্ষে অবস্থানকারী দল ক্রমেই ভারী হচ্ছে। তালিকার সবশেষ নাম নিউজিল্যান্ড। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন তার পুনর্নির্বাচনের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একইসঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া ওই পরিকল্পনা নিয়ে স্বাধীন তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল এক বিবৃতিতে নিউজিল্যান্ড ফুটবল জানিয়েছে, ‘ফিফার কিছু সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আস্থার সংকট ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আস্থা ও বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা প্রয়োজন।’ তাদের ভাষায়, ‘আন্তর্জাতিক ফুটবলের প্রশাসনের ওপর আস্থা বজায় রাখতে সুশাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপে খেলা ওশেনিয়া অঞ্চলের একমাত্র প্রতিনিধি ছিল নিউজিল্যান্ড। দেশটির ফুটবল সংস্থার প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু প্র্যাগনেল রয়টার্সকে বলেছেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্টভাবে একটি স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছি, কারণ আমরা চাই না এটি নিয়ে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ ধামাচাপা দেয়া হোক। অন্য কনফেডারেশনগুলোও যে স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি তুলেছে, সেটাও আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।’ তবে নিউজিল্যান্ডের মতো ওশেনিয়া ফুটবল কনফেডারেশন (ওএফসি) কঠোর অবস্থানে যায়নি। আঞ্চলিক এই সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ফিফা তাদের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়ায় তারা সন্তুষ্ট। ফিফার বর্তমান নেতৃত্বে ওশেনিয়া অঞ্চলে ফুটবলের যে অগ্রগতি হয়েছে, সেটির প্রশংসা করে ওএফসি বলেছে, ‘সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান ফুটবলের কার্যকর প্রশাসন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য মৌলিক বিষয়।’ বিতর্কের শুরু বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের ২০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার তোলার পরিকল্পনা নিয়ে।
সমালোচনার মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো। এর আগে চলতি সপ্তাহে উয়েফা (ইউরোপ), এএফসি (এশিয়া) ও কনকাকাফ (উত্তর-মধ্য আমেরিকা)- এই তিন শক্তিশালী কনফেডারেশন যৌথ খোলাচিঠিতে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ আস্থাভঙ্গের অভিযোগ তোলে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী মার্চে পুনর্নির্বাচনের সুযোগ পাওয়ার আগে তারা তার পদত্যাগ চায়। নিউজিল্যান্ডের আগে একই দাবি জানায় নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশন। নিউজিল্যান্ড ফুটবল প্রধান প্র্যাগনেল বলেন, তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার এই বিতর্কিত পরিকল্পনার পেছনে আসলে কারা ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’ কীভাবে এই উদ্যোগে বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ পেলো, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত। এশিয়ার শক্তিশালী দেশ অস্ট্রেলিয়াও এএফসি’র সঙ্গে সুর মিলিয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি তুলেছে, যদিও ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে সরাসরি অবস্থান জানায়নি তারা। এ প্রসঙ্গে প্র্যাগনেল বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানের সঙ্গে আমরা জোরালোভাবে একাত্ম।’ সব মহল থেকে যে বিরোধিতার মুখে পড়েছেন, তা নয় ইনফান্তিনো। গত সপ্তাহে মরক্কোয় এক জরুরি বৈঠকের পর ২১১টি সদস্য এসোসিয়েশনের কাছে এই প্রস্তাবের জন্য ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চায় ফিফা। যেখানে সদস্যরা জানায় ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের ‘পূর্ণ সমর্থন’ রয়েছে।
কাতার ও ২০৩০ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মরক্কোসহ ছয়টি আরব দেশের ফুটবল সংস্থার প্রধানরা তাকে জোরালো সমর্থন জানিয়ে বলেন, বিশ্ব ফুটবলে তার ‘নিরলস প্রচেষ্টা’র প্রশংসা করেন তারা। এ ছাড়া মিশর, মৌরিতানিয়া, লেবানন ও সুদানও একই সমর্থন জানিয়েছে। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিএএফ) নির্বাহী কমিটিও সর্বসম্মতভাবে ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। যদিও ৫৪ সদস্যের সবাই সমর্থন জানায়নি। আগামী বছরের মার্চে ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদের জন্য পুনর্নির্বাচনে লড়বেন ইনফান্তিনো। সেই নির্বাচনে ভোট দেবে ২১১টি সদস্য দেশ। যার মধ্যে বিরোধিতাকারী তিন কনফেডারেশনের প্রতিনিধিত্ব করে ১৩৬টি দেশ। তবে আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অঞ্চলের সমর্থন এখনো তার পক্ষে থাকায় অস্বস্তি কিছুটা কম ইনফান্তিনোর।
