সিলেটে ট্রিপল মার্ডার নিয়ে রহস্য কাটছে না। এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে ‘ঘাতক’ বাবুল মিয়া। স্বীকারও করেছে ঘটনার। একাই তিনজনকে খুন করেছে বলে জানিয়েছে। গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কারণে এই খুন বলে বাবুল
জানিয়েছে। তবুও কোথায় যেনো ঘাটতি। এই ভাষ্য পুরোপুরি মানতে নারাজ এলাকার মানুষ। লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত এ ঘটনায় তারা ক্ষুব্ধ।
গতকাল এ নিয়ে তারা মানববন্ধন করেছেন সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে। আর সেখানে তারা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছেন। পেছনে রহস্য খুঁজে বের করতে তারা অধিকতর তদন্ত করতে পুলিশের কাছে দাবি জানিয়েছেন। সিলেটের ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার। চেম্বারের সাবেক পরিচালক। পরিচিত মুখ। নগরের রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার বাসিন্দা তিনি। বুধবার সকালে নিজ বাসাতে স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও কাজের মেয়ে তাহমিনা সহ খুন হন তিনি। তিনজনেরই গলাকাটা। শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। ঘটনায় আলোড়ন দেখা দেয় সিলেটে। এ ঘটনায় প্রথমেই উঠে আসে ডাকাতি কিংবা পূর্ব শত্রুতার জেরের বিষয়টি। পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মোর্শেদও প্রথমে এ ধারণা করেন। কিন্তু বিকালেই মোড় নেয় অন্য ঘটনা। ধরা হয় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে। সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি মিলে। এরপর বিকালে ওই এলাকা থেকে বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর বাবুল নিজেও স্বীকার করে খুনের ঘটনা। জানায়, একাই সে তিনজনকে খুন করেছে। কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে ঘরের ভেতরে ঢুকে সে প্রথমে তাহমিনা, পরে সুরাইয়া বেগম ও শেষে আব্দুস সাত্তারকে খুন করে। এরপর সে বেলকনি দিয়ে পালায়। যাওয়ার সময় খুনে ব্যবহৃত ছুরিটি সে পাশের একটি খালি ফ্ল্যাটের ঝোপের মধ্যে ফেলে যায়।
তার ভাষ্য মতে পুলিশ বুধবার সন্ধ্যায় ওই ঝোপের ভেতরে আলামত হিসেবে ছোরাটি উদ্ধারে অভিযান চালায়। সঙ্গে নেয় বাবুল মিয়াকে। কিন্তু কোথায় ফেলেছে বাবুল মিয়া নির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি। সকাল থেকে কর্মচারী নিয়োগ করে পুলিশ ওই ঝোপে তল্লাশি চালায়। সকাল সাড়ে ৯টায় মিলে ছুরিটি। সেটি রক্তাক্ত নয়, পরিষ্কার। এ নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে এলাকার মানুষের। ছুরি উদ্ধারের সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, খুনের ঘটনার পর পর বাবুল মিয়া ছুরিটি রায়নগর এলাকার একটি খালি প্লটে ফেলে দেয়। বুধবার সন্ধ্যায় ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও সেটি পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে পুনরায় সেখানে তল্লাশি শুরু করা হয়। এক পর্যায়ে ছুরিটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। ছুরিতে থাকা রক্তের সঙ্গে ঘটনাস্থলে পাওয়া রক্তের নমুনা মিলিয়ে দেখা হবে। এর মাধ্যমে ছোরায় থাকা রক্ত কার, সেটিও নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঘটনার পর বাবুল ছুরিসহ হাত-মুখ ধুয়ে ফেলে বলে পুলিশকে জানিয়েছে। এদিকে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দুপুরে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছেন এলাকার মানুষ। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচিতে বক্তারা কেবলমাত্র বাবুলের ভাষ্যকে বিশ্বাস না করে আরও অধিকতর তদন্ত চালানোর জন্য পুলিশ কমিশনারকে অনুরোধ জানিয়েছেন। মিতালী আবাসিক এলাকার সমাজকল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক নাজু জানিয়েছেন- আলোচিত এ ঘটনার আসামি বাবুল গ্রেপ্তার হলেও রহস্য কাটছে না। সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে।
এ ঘটনার পেছনে অন্য কেউ জড়িত রয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে তিনি পুলিশকে অনুরোধ করেন। ওই এলাকার বাসিন্দা মওদুদ আহমদ জানিয়েছেন- ঘটনার পর ওয়ারড্রবের বাইরে ফ্লোরের মধ্যে দলিলপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। নিহত সাত্তার মিয়ার সঙ্গে জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এ কারণে কেবলমাত্র প্রেমের ঘটনায় তিন খুন হয়েছে সেটি কেউ বিশ্বাস করছে না। বাবুলকে কেউ ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা করেন তিনি। এ জন্য পুলিশকে আরও মনোযোগ দিয়ে এ বিষয়টি তদন্ত করার আহ্বান জানান তিনি। মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী। সমাবেশের পর তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত হওয়া কয়েকটি ঘটনার দ্রুত বিচার করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনারও দ্রুত বিচার দাবি করেন। সকালে ছুরি উদ্ধারের সময় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন- ঘটনাস্থল থেকে তিন পাতার একটি দলিলসদৃশ কাগজ পাওয়া গেছে। সেটি মূল দলিল নয়, সম্ভবত ফটোকপি বা অনুলিপি।
এর সঙ্গে কোনো মামলা বা সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কিনাÑ তা এখনো নিশ্চিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম মানবজমিনকে জানিয়েছেন, মিতালী আবাসিক এলাকার ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের হয়নি। ফলে গ্রেপ্তারকৃত আসামি পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। তিনি বলেনÑ মামলা দায়ের করা হলে আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলে সেটিরও ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। এদিকে রিকাবীবাজারে একটি মার্কেটের মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। এ মামলায় তার প্রতিপক্ষ সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। এ মামলার শুনানির দিন গত ২০২৫ সালের ১৮ই মে আদালত প্রাঙ্গণে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। তিনি সহ তৌহিদুল হক নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় আদালতে সিরাজুল ইসলামকে আসামি করে মামলা করেছিলেন তৌহিদুল হক। তিনি জানিয়েছেনÑ বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তে থাকা ওই মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহের চেষ্টা করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে আব্দুস সাত্তারকে এ মামলা নিয়ে হুমকি দেয়া হয় বলে জানান তিনি।
