জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ সিপিডি’র

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের সুপারিশ সিপিডি’র

ফন্ট সাইজ:

দেশে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি বলছে, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।

গতকাল রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলা: তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথরেখা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডি’র জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফকরুদ্দিন আল কবির। প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সভায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ঝুঁকি কমাতে এলএনজি সংগ্রহ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, জ্বালানি সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মূল্য পদ্ধতি চালু ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করেছে সিপিডি।

মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এলএনজি টার্মিনাল ও সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা শক্তিশালী করা, জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণে সময়সীমা-ভিত্তিক নীতি গ্রহণ এবং কার্যকর নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

আলোচনা সভায় উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট শুধু তাৎক্ষণিক নয়, এটি একটি কাঠামোগত সংকটও। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আমদানি-নির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিকল্প নেই।
সিপিডি বলছে, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৮৪ শতাংশের বেশি এখনো প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবিদ্যুতের অবদান এখনো খুবই সীমিত।

উপস্থাপিত প্রবন্ধে সতর্ক করে বলা হয়, বর্তমান হারে গ্যাস ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট গ্যাসের মজুত প্রায় শেষ হয়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। বর্তমান গ্যাস সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে অনুসন্ধানে ব্যর্থতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, চাহিদা ও সরবরাহের ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যহীনতা এবং আমদানি করা এলএনজি’র ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সিপিডি’র মতে, গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব ইতিমধ্যে শিল্প উৎপাদন, গৃহস্থালি পর্যায়ে জ্বালানি ব্যয় এবং পরিবহন খাতে পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সার কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

আলোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য ও সেবা, যা ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। জ্বালানি ছাড়া শিল্পকারখানা, অফিস-আদালত এমনকি মানুষের ঘরবাড়িও স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। বাস্তবতা হলো, আমরা এখন এই সংকটের মধ্যেই রয়েছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অভিঘাত বহুমাত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে আমরা মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার কথা বলতাম। কিন্তু এখন তাৎক্ষণিকভাবে কী করতে হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডি’র বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর শিল্পে জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের স্পষ্ট অগ্রাধিকারের দাবি জানান। তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটে দেশের শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আমাদের মানসম্মত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ জরুরি। তিনি লোডশেডিংয়ের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ ও সিস্টেম লস কমানোর তাগিদ দেন। এ ছাড়া সোলার স্টোরেজে করছাড় এবং শিল্প খাতকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার দেয়ার তাগিদ দেন।