গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত জনজীবন

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে নাজেহাল চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত জনজীবন

ফন্ট সাইজ:

চট্টগ্রামে একদিকে তীব্র গ্যাস সংকট, অন্যদিকে বাড়ছে বিদ্যুতের ভোগান্তি। বাসাবাড়িতে কখনো রান্নার চুলা জ্বলছে না। আবার কখনো জ্বলছে মিটমিট করে। বাসাবাড়ি-শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। গ্যাস সংগ্রহ করতে অনেক চালককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে সড়কে যানবাহনের সংখ্যাও তুলনামূলক কমছে।

বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা। চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন মোড়ে পেট্রোল পাম্পের সামনে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন চালক মোহাম্মদ হোসেন। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। জানালেন দুপুর দেড়টা থেকে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন। তবে পাম্পে গ্যাস না থাকায় অপেক্ষা করছেন। মোহাম্মদ হোসেনের মতো এভাবে অপেক্ষা করছেন কমপক্ষে দুই শতাধিক চালক। নগরের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনেও দেখা গেছে প্রায় একই রকম দৃশ্য। কোথাও গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সারি। আবার কোথাও বড় বড় হরফে ‘গ্যাস নেই’ লেখা। সিএনজি স্টেশন মালিকরা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্টেশন থেকে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। চাপ কিছুটা বাড়লে আবার সরবরাহ চালু করা হয়। ফলে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই স্টেশনগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়ছে-কমছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) বলছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বর্তমানে চাহিদার মাত্র ৫৪ দশমিক ২৯ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ চাহিদার ৪৫ দশমিক ৭১ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। কেজিডিসিএল সূত্রে জানা গেছে, সংস্থার আওতাধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে দৈনিক বরাদ্দ রয়েছে ২৪৬ এমএমসিএফডি। তবে বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে গড়ে ১৯০ এমএমসিএফডি। কখনো কখনো ২১০ থেকে ২২৪ এমএমসিএফডি পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে প্রদত্ত গ্যাসের মধ্যে সার কারখানায় ৯০ থেকে ১০০ এমএমসিএফডি, বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রায় ৪০ এমএমসিএফডি এবং সিএনজি স্টেশনে প্রায় ১৯ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন হয়।

অবশিষ্ট গ্যাস আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্পগ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। শিল্পগ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে ইস্পাত, কাঁচ, সিমেন্ট, জাহাজভাঙা, ঢেউটিন ও পোশাক কারখানা। নতুন করে গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় আগে থেকেই সক্ষমতার নিচে চলা এসব শিল্পকারখানার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (বিতরণ উত্তর) প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম। দৈনিক বরাদ্দ ২৪৬ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও পাওয়া যাচ্ছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। আমরা সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। জানা যায়, গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানার উৎপাদনে। রড উৎপাদন, পোশাক কারখানা, জাহাজভাঙা ইয়ার্ড, ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট ও স্টিল স্ট্রাকচার কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৪০ শতাংশের মতো নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক শিল্পকারখানার নিজস্ব ক্যাপ্টিভ পাওয়ার প্লান্টও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বুধবার গ্যাস না পাওয়ায় কোনো কোনো কারখানার উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন বন্ধ থাকার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারেও পড়বে। কারণ কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংক ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় থেমে থাকে না। বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম)-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর তপন সেনগুপ্ত বলেন, বুধবার থেকে কারখানা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গত এক মাস ধরে আমাদের ব্যবসায় মন্দাভাব চলছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ দিন ধরে আমরা কাক্সিক্ষত হারে গ্যাস পাচ্ছি না। আগে থেকেই চলা সংকটের কারণে দৈনিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ হচ্ছিল। এভাবে চলতে থাকলে বড় ধরনের লোকসানে পড়বো। গ্যাস ছাড়া কারখানা চালু রাখা একপ্রকার অসম্ভব। গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামের সার কারখানাগুলোতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে চারটি সারকারখানা রয়েছে।

এগুলো হলো-চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিএফসিএল) ও টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড। এর মধ্যে সিইউএফএল ও কাফকো ইউরিয়া, ডিএপিএফসিএল ডিএপি এবং টিএসপি কমপ্লেক্স টিএসপি সার উৎপাদন করে। আনোয়ারায় অবস্থিত সিইউএফএল গ্যাস সংকটের কারণে গত ৪ঠা মার্চ থেকে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এর আগেও গ্যাস সরবরাহে অনিয়ম ও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে দীর্ঘ সময় কারখানাটির উৎপাদন বন্ধ ছিল। অন্যদিকে কাঁচামাল সংকটে ডিএপিএফসিএলের উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সংকটের কারণে কাফকোতে উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে। ফলে সামনে আমন মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জানা যায়, চট্টগ্রামের ২২৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ৩৭ এমএমসিএফডি গ্যাস প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৮ এমএমসিএফডি। গ্যাস সংকটের কারণে রাউজান, আনোয়ারাসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিটও বন্ধ রয়েছে। ফলে তীব্র হয়েছে লোডশেডিং।